‘‘চার বছরের মেয়ে এখনই রাশিয়া নামটা বেশ বুঝে গিয়েছে। বাড়িতে, পথে-ঘাটে, দোকানে চেনা মানুষের সঙ্গে দেখা হলেই বলছে— ‘আমরা রাশিয়া যাচ্ছি’।’’

ছোট্ট এক সাক্ষাৎকারে মেয়ে দিয়াসিনি সম্পর্কে এমনটাই জানালেন বছর পঁয়ত্রিশের দেবাঞ্জলি রায়। পাশে তখন বসে রয়েছেন স্বামী কৌশিক রায়। 

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

পেশায় চিকিৎসক দেবাঞ্জলি রায় ‘পেন ম্যানেজমেন্ট’ নিয়েই কাজ করছেন বেশ কয়েক ধরে। কিন্তু সম্প্রতি তিনি কাজে ইস্তফা দিয়েছেন। কারণ, তিনি বিশ্বভ্রমণে বেরোবেন। তাও আবার গাড়ি চালিয়ে। সঙ্গে থাকবেন কৌশিক ও ছোট্ট দিয়াসিনিও। 

ছোটবেলা থেকে বাবার সঙ্গে বেশ কয়েকবার ট্রেকিং-হাইকিং করেছেন দেবাঞ্জলি। তার পর এক সময়ে গাড়ি চালানোও শিখে নেন। কিন্তু, সে ভাবে চালানোর সুযোগ হয়নি। বিয়ের পরে সেই সাধ পূরণ হয় স্বামীর ‘আশকারা’-য়।

কৌশিক রায় পেশায় ব্যবসায়ী। ছোট থেকেই গাড়ি চালানোর শখ। কারণ, পারিবারিক ছোট-বড় যে কোনও ভ্রমণেই তাঁরা ব্যবহার করতেন সড়কপথ। রাজস্থানে এক আত্মীয়ের বাড়ি গেলেও গাড়িতেই যেতেন তাঁরা, জানালেন কৌশিক। বড় হয়ে বেশ কয়েক বার অংশ নিয়েছেন বিভিন্ন র‌্যালিতে। 

এ হেন গাড়ি-পাগল ‘কাপ্‌ল’ যে গাড়ি চালিয়ে বিশ্বজয় করার পরিকল্পনা করবেন, তাতে আর সন্দেহ কী!

ইচ্ছেটা অনেক বছরের। পরিকল্পনা শুরু কয়েক মাস আগে। এবার শুধুই অপেক্ষা। সময় একেবারেই নেই। অগস্টের ১৭ তারিখ ‘ফ্ল্যাগ-অফ’। তারপরেই শহর-গ্রাম, নদী-পাহাড় ডিঙিয়ে শুধুই পথ চলা। 

মোট ২৮টি দেশ, ৪০ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি পথ— সব কিছু ঠিক থাকলে সময় লাগবে ৪ মাস মতো। এমনটাই মনে করছেন দেবাঞ্জলি ও কৌশিক। কিন্তু, রাস্তা-ঘাটের কথা তো আর বলা যায় না! তা ছাড়া, এতগুলো দেশ। এক এক জায়গার ভিন্ন ভিন্ন প্রশাসনিক ব্যবস্থা। সবার উপরে প্রকৃতি। 

এবেলা.ইন-এর দফতরে দেবাঞ্জলি রায় ও কৌশিক রায়

 

‘‘নেট ঘেঁটে রাস্তাঘাটের খবর নেওয়ার দায়িত্ব কৌশিকের। আর আমি যোগাযোগ করছি বিভিন্ন দেশের স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সঙ্গে। কথা বলছি স্পনরশিপের জন্য’’, বললেন দেবাঞ্জলি।

প্রাথমিকভাবে নিজেদের গ্যাঁটের টাকা খরচ করেই রায় দম্পতি শুরু করেছিলেন অ্যাডভেঞ্চার প্ল্যান করা। কিন্তু, যতই সময় এগিয়েছে তাঁরা বুঝতে পারেন যে খরচ বাড়বে বই কমবে না। তাই প্রয়োজন হয়ে পড়েছে স্পনসরশিপের। বন্ধু-বান্ধবরা এগিয়ে এসেছেন অনেকেই। কিন্তু, প্রয়োজন রয়েছে আরও। 

দেবাঞ্জলি ও কৌশিকের এই অভিযান শুধুই দেশভ্রমণের জন্য নয়। তাঁরা দু’টি গ্লোবাল মেসেজ নিয়ে ঘুরে বেড়াবেন দেশে-দেশান্তরে। তাঁদের এই অভিযানের নাম ‘দ্য ওডিসি’। যার অর্থ, ‘প্রত্যাবর্তন যাত্রা’। আর এই অভিযানের ক্যাচলাইন— ‘সেফ ড্রাইভ টু আ পেন-ফ্রি লাইফ’। অর্থাৎ, গাড়ি চালান সাবধানে আর ব্যথা-মুক্ত জীবন যাপন করুন। 

রায় দম্পতির এই অভিযানের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ‘অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন অফ ইস্টার্ন ইন্ডিয়া’। গাড়ি চালানোর সঙ্গে কী কী ব্যাপার মাথায় রাখা উচিত সে বার্তাও বহন করবেন দেবাঞ্জলি ও কৌশিক। 

নানা দেশে বেশ কয়েকটি মেডিকাল ক্যাম্প করবেন দেবাঞ্জলি রায়। শিশুদের শরীরে ব্যথা কমানোর উপায়, মহিলাদের লো-ব্যাক পেন নিয়ে আলোচনা ও সমাধান জানাবেন তিনি। যে কারণে এই অভিযানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য স্টাডি অফ পেন’ ও ‘ইন্ডিয়ান সোসাইটি অফ অ্যানাস্থেশিওলজিস্ট’। 

ইচ্ছে ছিল এক সময়ের ফরাসি উপনিবেশ চনন্দননগর থেকে শুরু করে একটা লম্বা সফর শেষ করবেন ফ্রান্সে গিয়ে। কিন্তু, প্ল্যানে সামান্য রদবদল ঘটিয়ে ঠিক হয় ওডিসি-র যাত্রা শুরু হবে কলকাতা থেকেই।

যাত্রা শুভ হোক দেবাঞ্জলি ও কৌশিকের।