‘আইডিয়া’ মোবাইলের সাম্প্রতিকতম অ্যাড বাজারে দু’টি বিষয় ছেড়েছে। এক, ‘বেঝিঝক’ নামের এক টার্ম, আর দুই, উপরের ছবির এই তরুণী। অ্যাডকর্তাদের উদ্দেশ্যই ছিল ‘বেঝিঝক’-কে ধরে এগনো। ওই শব্দটাকেই আগে বাজারজাত করে। কিন্তু এই মুহূর্তে এই উদ্দেশ্যকে টপকে গিয়েছেন ‘আইডিয়া গার্ল’। তিনিই এখন ট্রেন্ডিং। নেটিজেন থেকে শুরু করে রাস্তাট হাঁ করে পোস্টার-ব্যানার দেখা হাবলারা পর্যন্ত কৌতূহলী হয়ে উঠেছেন এই কন্যেটিকে দেখে। কে ইনি? দেখে তো ‘পাশের বাড়ির মেয়ে’ বলে মনে হয়! কী এঁর প্রকৃত পরিচয়?

‘আইডিয়া’-র উদ্দেশ্য বিজ্ঞাপন। সেখানে নজরকাড়া মডেলকে উপস্থাপন করাটা জরুরিও। কিন্তু মডেল যদি প্রোডাক্টকে ছাপিয়ে য়ান, তখন বেসামাল অবস্থা!। এই বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রেও অনেকটা তা-ই বয়েছে, ‘বেঝিঝক’ জিংগলটির উদ্ভট কণ্ঠে লিপ দিতে গিয়ে মডেলের লুকস-এও একটা উদ্ভট টাচ আনা প্রয়োজন ছিল। সেটা করতে গিয়ে এই মডেলকে যে লুক ও ফিল-এ হাজির করা হয়, গণ্ডগোল পাকিয়েছে সেটাই। নয়তো এই মডেল কন্যেটি রীতিমতো পেশাদার। তিনি এর আগে মিন্ত্রা, ফাস্টট্র্যাক, ফ্যাব ইন্ডিয়া-র মতো সংস্থার বিজ্ঞাপন করেছেন। কিন্তু তখন এঁকে চোখে পড়েনি। ‘আইডিয়া’-ই সেই কামালটা করল।

প্রসঙ্গত, ‘আইডিয়া গার্ল’-এর নাম ভাবনা মাখিজা। তিনি বেড়ে উঠেছেন দিল্লিতে এবং আপাতত পেশাগত কারণে থাকেন মুম্বইয়ে। তাঁকে ঘিরে ইন্টেরনেটে যে হই হই, তা তাঁর পেশাগত ক্ষেত্রে সুবিধে দিতে পারে বটে, কিন্তু এই ‘ট্রেন্ডিং গার্ল’ হওয়াটা শেষ পর্যন্ত খুব সুবিধের নয়, সে প্রমাণ রেখেছেন আর আগেও বেশ কিছু মেয়ে। 


প্রিয়া প্রকাশ ভারিয়ার. ছবি: ইউটিউব

প্রিয়া প্রকাশ ভারিয়ারকে মনে আছে কি আপনাদের? এক মালয়ালি ছবির ক্লিপে চোখের এক বিশেষ ভঙ্গিমা করতে দেখা গিয়েছিল এঁকে। ‘জাতীয় ক্রাশ’ বলে ডাকাডাকিও শুরু হয়ে গিয়েছিল। আধবুড়ো বাঙালির মনে পড়ে গিয়েছিল নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতার লাইন—  ‘‘একদিন সমস্ত নারী চোখের ইঙ্গিতে বলবে, এসো’’। মনে হয়েছিল, দিন এসে গিয়েছে। যাবতীয় মিডলাইফ সঙ্কট ঝেড়ে ফেলে টান টান হয়ে আবার দাঁড়ানো যাবে বাসস্টপে। সে আসবেই। আসতে বাধ্য। কিন্তু গত ফেব্রুয়ারিতে ভাইরাল হওয়া প্রিয়া এই মুহূর্তে মনোলেকের গহীনতম অবচেতনেও নেই। থাকার কথাও নয়।

 
টুম্পা খান, ছবি: ইউটিউব

তা হলে মনে করুন টুম্পা খানকে। বাংলাদেশি ব্যান্ড ‘ছারপোকা’-র ‘অপরাধী মাইয়া’ গানটার ‘ফিমেল কভার’ গেয়ে ফেসবুকে ট্রেন্ডিং হওয়া সেই মেয়েটি। গত জুনে ভাইরাল হয় তার ভিডিও। তাকে ঘিরে হট্টগোল অবশ্য বেশিদিন চলেনি। প্রথমত সে বাংলাদেশি। তার গান বাংলায়। ফলে ভারতে সে ট্রেন্ডিং হলেও, তা ‘রিজিওনাল’। দ্বিতীয়ত, তার এই ভাইরাল-বৃ্ত্তি একান্তই অবাণিজ্যিক। তা না কোনও বিজ্ঞাপনা, না কোনও মুভি-প্রোমো। টুম্পার ট্রেন্ডিং হওন আরও সাময়িক। এই মুহূর্তে সে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ছাড়া আর কোথাওই নেই। থাকার কথাও নয়।

ভাবনা মাখিজার ব্যাপারটা অবশ্য আলাদা। এখানে কাজ করছে বৃহৎ পুঁজি। ‘আইডিয়া’-র অ্যাডটি বিবিধ ভাষায় লভ্য হওয়ায় ভাবনা এই মহূর্তে ন্যাশনাল লেভেলের খিলাড়ি। তাঁকে ‘ক্রাশ’ এখনই বলে যাচ্ছে না। কারণ, এই বিজ্ঞাপনের একটা বড় জায়গাই হল উদ্ভটত্ব। ফলে এখানে ভাবনার মেকআপ, তার অ্যাপিয়ারেন্স ইত্যাদি ক্রাশ-সুলভ নয়। এখানেই কামাল বিজ্ঞাপনকর্তাদের। খেলছেন একেবারেই অবচেতন দিয়ে। এই ছিপছিপে তরুণীর শরীরী আবেদনকে কমেডির মোড়কে তুলে নিয়ে এসেছেন। উৎকট গান আর সুর তাঁকে সেঁধিয়ে দিচ্ছে দর্শকের মগজের ধূসর কোষের ঝোপে-ঝাড়ে। এক বার দেখলে ভোলা মুশকিল হয়ে পড়ছে। প্রিয়া প্রকাশের ‘আবেদন’ না থাক, ভাবনা হয়ে উঠছেন পুরুষের ভাবনার বিষয়। ‘আইডিয়া গার্ল’ লিখে গুগল করলেই ঝাঁকে ঝাঁকে তথ্য। 


প্রকৃত চেহারায় ভাবনা মাখিজা। ছবি: ভাবনার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট

না, ভাবনাও ট্রেন্ডে থাকবেন না। থাকার কথাও নয়। তাঁর জায়গা কয়েক দিনের মধ্যেই নিয়ে নেবে অন্য কেউ। এটা সেই যুগ নয়, যে পারসিস খামবাট্টা বা কিটু গিদওয়ানির সারা জীবনকে ট্র্যাক করে যাবে কেউ কেউ। নাকি সেই কেউ কেউয়েরই অভাব এই যুগে! ভাবনার জন্য ভাবনা হয়। ভাবনার মতো মেয়েদের জন্য ভাবনা হয়। ক্ষণমাহাত্ম্যের নেট-দুনিয়ায় কয়েক দিনের ট্রেন্ডিং হয়ে থেকে উবে যাবেন তিনি। অভিধাটাই তো ‘ট্রেন্ডিং’। নতুন ট্রেন্ড এসে পুরনোকে সরাবেই। যদ্দিন না সরায়, তদ্দিনই... বেঝিঝক।