আবার ‘মাও-জুজু’। এবার জাতীয় স্তরে। মাওবাদীদের সঙ্গে যোগ আছে সন্দেহে ন’ জন মানবাধিকার কর্মীর বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে পাঁচ জনকে মঙ্গলবার গ্রেফতার করা হয়েছে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে।

এই শহুরে মাওবাদীদের নিয়ে বিভক্ত দেশ। একদলের অভিযোগ, নরেন্দ্র মোদী সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলেছে বলেই এঁদের গ্রেফতার করা হল। অন্য দলের বক্তব্য, এঁরা মাওবাদীদের সাহায্য করছে, এমনকী তাঁরা প্রধানমন্ত্রীকে মারারও ছক কষেছিল।

শুধু মাও-জুজু নয়, এঁরা দেশদ্রোহী, দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ষড়যন্ত্র করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। সে যখন প্রমাণ হবে, তখন হবে। কিন্তু সত্যিই মাওবাদীদের ভয়ে এঁদেরকে গ্রেফতার করা হল ভাবলে ভুল ভাবা হবে।

মাওবাদীদের নয়, বিজেপি আসলে ভয় পাচ্ছে দলিতদের। আর সেই ভয় থেকেই গ্রেফতার করা হয়েছে এই সমাজকর্মীদের। 

এঁদের গ্রেফতার করেছে পুণে পুলিশ। গত বছর ভীমা-কোরেগাঁওতে দলিত বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে গন্ডগোল হয়েছিল। মূলত সেই ঘটনার রেশ ধরেই এই গ্রেফতার। তার পরে একটি চিঠিও উদ্ধার হয়। তাতে দেখা গিয়েছিল প্রধানমন্ত্রীকে মারতে চায় মাওবাদীরা।

আসলে যাঁরা গ্রেফতার হয়েছেন তাঁরা সবাই এই দলিতদের একজোট করার কাজ করছিলেন। ‌এখানেই বড় গোল বেঁধেছে।

 

২০১৪ সালে দলিতদের বিরাট অংশের সমর্থন পেয়েছিল বিজেপি। নরেন্দ্র মোদীর উপর ভরসা রেখেছিলেন শিক্ষিত দলিত যুবক-যুবতীরা। লোকনীতির প্রকাশ করা একটি প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে প্রায় সাড়ে ২৪ শতাংশ দলিতদের সমর্থন পেয়েছিল বিজেপি। 

যদিও নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহেরা সমাজের সবস্তরের মানুষদের নিয়ে একটি ‘রামধনু-সামাজিক জোটের’ ছবি আঁকতে চেয়েছিলেন, কিন্তু নির্বাচনের পরে তা মুখ থুবড়ে পড়ে। দলিতদের বিশ্বাসভঙ্গ হচ্ছে বলে অভিযোগ ওঠে।

একটির পর একটি ঘটনাও কাজ করেছে অনুঘটক হিসেবে। হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রোহিত ভেমুলার আত্মহত্যা, উনাতে গোরক্ষকদের হাতে ৭ জন দলিতের পিটিয়ে হত্যা, সাহারণপুরে উচ্চবর্গদের হাতে দলিতদের আক্রান্ত হওয়া, ভীম আর্মির নেতা চন্দ্রশেখরকে গ্রেফতার — এই সব ঘটনার পরে পরিস্থিতি সামলাতে ব্যর্থ হয় বিজেপি।

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

এর সঙ্গে যুক্ত হয় তফশীলি জাতি, উপজাতি আইনকে লঘু করা ও গত বছর পুণের ভীমা-কোড়েগাঁওতে৩ পেশওয়াদের বিরুদ্ধে বিজয় দিবসের ২০০ বছর উদযাপনের অনুষ্ঠানকে ঘিরে হিন্দু সংগঠনের সঙ্গে দলিতদের সংঘর্ষ।

পুণের এই ঘটনার পরেই দলিতদের আন্দোলন তীব্র মাত্রা নেয়। মহারাষ্ট্রের বাইরেও এই ঘটনার আঁচ ছড়িয়ে পড়ে। বিজেপির বিরুদ্ধে ক্ষোভকে কাজে লাগান দলিত সংগঠনের নেতারা। হিন্দু সংগঠনের সঙ্গেই যখন দলিতদের বিরোধ, তখন বিজেপিও দলিতদের পাশে সেভাবে দাঁড়াতে পারেনি। ২০১৪ সালের লোকসভায় বিজেপির মোট ভোটের প্রায় ৪৭ শতাংশই উচ্চবর্ণের হিন্দুদের থেকে এসেছিল।

দলিত নেতাদের প্রচারের মূল বক্তব্যই হল বিজেপি হিন্দুদের মধ্যে উচ্চবর্গের মানুষদের পার্টি।আম্বেদকরকে গুরুত্ব দিয়েও নরেন্দ্র মোদী এই প্রচারের মোকাবিলা করতে পারেননি ঠিক করে।

একথাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে যাঁরা গ্রেফতার হয়েছেন তাঁরা অনেকেই প্রকাশ্যে মাওবাদী তত্ত্বের বা কখনও কাজের সমর্থন করেছেন। এখন মাও-জুজু দেখিয়ে এই সমাজকর্মীদের জেলের ভিতর ঢুকিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার এক ঢিলে দুই পাখি মারতে পারল। দলিত আন্দোলনের শীর্ষ নেতৃ্ত্বে ও মাও সমর্থনকারীদের আঘাত হানা গেল। আবার সরকার-বিরোধী আওয়াজ যাঁরা তুলছেন তাঁদেরকেও খানিকটা ভয় দেখানো গেল।