কী দামি মাল এসেছে বাজারে। কোথায় রাফাল, গোহত্যা, ছেলেধরা, বেকারত্ব, মঞ্চ ভাঙা, কৃষক প্রেম... সব হাপিস বাজার থেকে। এখন শুধু ৪০ লাখ। এই সংখ্যা নিয়েই যুদ্দু ভালই বেধেছে। 

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

অসম থেকে ইউ টার্ন নিয়ে গাড়ি এখন কলকাতার হাজরা মোড় পর্যন্ত চলে এসেছে। ৪০ লাখ বাজারে বিকোচ্ছে ভালই। ফেরিওয়ালারা ঠেলা নিয়ে কেউ প্লেনে চড়ে অসম যাচ্ছেন, কেউ কলকাতার রাস্তার হাঁটছেন, কেউ বা দিল্লির কুতুব মিনার থেকে হাঁক পাড়ছেন।

ব্যাপারটা কী ভাই? অসমের ভূমিপুত্র ও বহিরাগতদের ঝামেলা থামাতে একটি চুক্তি হয়েছিল। সেটা ফলো করে সু্প্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে একটা তালিকা বানানো হয়েছে। নথিপত্র দেখে যাঁদের নাম তোলা হয়েছে তালিকায়, তাঁরাই অসমের নাগরিক। যাঁদের নাম নেই, তাঁদের বলা হয়েছে আবার নথি জমা দাও, আমরা খতিয়ে দেখব. ফাইনাল তালিকা পরে বেরবে। 

ব্যাস, আর যায় কোথায়! অনুপ্রবেশ সমস্যা হয়ে গেল বাঙালি খেদাও অভিযান, জাতীয় নাগরিক পঞ্জি হয়ে গেল মোছলমান-হিঁদুর লড়াই। ব্যানার তৈরি হল অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরা হিন্দু হলে অসুবিধা নেই, মুসলমান হলে ভাগাও দেশ থেকে।

অসমের অনেকে হাসছে নিজের মনে। কারও বাবার নাম ও ছেলেমেয়েদের নাম উঠেছে তালিকায়, কিন্তু নিজের নাম নেই। মানে দাদু আর নাতি-নাতনি এদেশের নাগরিক। অথচ মাঝের প্রজন্মের ছেলে বাদ। দেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির পরিবারের অনেকের নামও তো বাদ গিয়েছে। 

মানে, তালিকায় প্রচুর ভুল রয়েছে। মন্ত্রী বলছেন, এখনই কারোকে ধরা হবে না। চূড়ান্ত তালিকা তৈরি হবে, তার পর দেখা যাবে। পিছনে বড় রাজনীতি থাকলেও, ব্যাপারটা এই মুহূর্তে একটা প্রশাসনিক সমস্যা।

কিন্তু না, ঘোলা জলে এখনই মাছ ধরতে হবে। যাঁরা ভয় পেয়েছেন, তাঁদের আরও ভয় দেখাতে হবে। আর যাঁরা এখনও ভয় পাননি, তাঁদের মনে ভয় ঢোকাতে হবে। আর বাকিরা গ্যালারিতে বসে মজা দেখুক ততক্ষণ।

সমস্যার সমাধান ঠিক কী ভাবে হবে, তা কিন্তু কেউ মুখ ফুটে বলছে না। যাঁদের নাম তালিকায় থাকবে না, শেষ পর্যন্ত তাঁদের কোথায় পাঠানো হবে, হিটলারের মতো কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প বানানো হবে, নাকি সমুদ্রে ভেলায় চাপিয়ে ভাসিয়ে দেওয়া হবে— কেউ জানে না। কিন্তু যুদ্দু চলছে।

এবার অনেকই ভাবছেন, তৃণমূল মুসলমানদের পক্ষে, আর বিজেপি হিন্দুদের পক্ষে। আসলে দু’জনেই সংখ্যালঘুদের পক্ষে। অনেকেরই জানা নেই, একটা বিল পার্লামেন্টে ঘুরপাক খাচ্ছে। কারা কী ভাবে ভারতের নাগরিক হতে পারবেন, তার পদ্ধতিতে একটা বদল আসছে।

প্রতিবেশী দেশগুলির মধ্যে যাঁরা সংখ্যালঘু, তাঁরা মনের আনন্দে ভারতে চলে আসতে পারেন। তাঁদের ভারতবাসী হওয়া পাকা। বাংলাদেশের হিন্দু রিফিউজি হিসেবে আসতে পারেন। মুসলমানরা এলে হবে না। আফগানিস্তান থেকে খ্রিস্টানরা আসতে পারেন, বৌদ্ধরা আসতে পারেন, কিন্তু মুসলমানরা নয়। 

একটা ধর্মনিরপেক্ষ দেশের যেখানে রিফিউজি আইন নেই, সেখানে ধর্মের ভিত্তিতে কেন রিফিউজিদের এদেশে জায়গা দেওয়া হবে, প্রশ্ন তো সেখানেই।

বিজেপি এই সংখ্যালঘু রিফিউজিদের গলা জড়িয়ে ধরতে তৈরি। আর তৃণমূল এদেশের সংখ্যালঘুদের ভরসা হতে চাইছে।

দেশের সংবিধান, নিরাপত্তা ও সবচেয়ে বড় কথা সাধারণ মানুষের মনের মধ্যে অবিশ্বাস ও ভয় চুলোয় যাক। দেশ ভাগের যন্ত্রণার কবর দেওয়া হোক। এই তো চলছে। 

আচ্ছা আপনিই বলুন, ভয় পাওয়া স্বাভাবিক নয় কী? আমার দাদুর নাম ১৯৫০ সালে ভোটার তালিকায় ছিল কি না, এটা প্রমাণ করতে হবে ভাবলেই অনেকের গায়ে জ্বর আসতে পারে। 

আর যাঁদের কোনও নথিই নেই, তাঁদের অবস্থা তো আরও খারাপ। এতদিন নিজেকে ভারতীয় হিসেবে জেনে এসে হট করে আমার কোনও দেশ নেই ভাবতে গায়ে কাঁটা দেবে।

সেখানে এই রাজনীতি আসলে পাবলিককে বোকা বানানো ছাড়া আর কিছুই নয়।