গোটা দিন বাড়ি বাড়ি কয়লা দিয়ে বেড়ায়। তার মাঝেই প্র্যাক্টিস। সঙ্গে পড়াশুনো। তবু বক্সিংয়ের জুনিয়র বিভাগে একের পর এক পদক এনে চলেছে হরিশ মুখার্জি রোডের বিনোদ কুমার প্রসাদ। মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ির অনতিদূরেই এমনই এক প্রতিভা নিত্য জীবন সংগ্রামে জয়ী হয়ে বিশ্ব বক্সিংয়ে নিজেকে মেলে ধরতে বদ্ধপরিকর।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে খেলাধুলোর পৃষ্ঠপোষক। খেলোয়াড়, কোচদের উৎসাহ দিতে বিভিন্ন পুরস্কারও চালু করেছেন তিনি। তাঁর বাড়ি থেকে মিনিট দুয়েকের দূরত্বেই থাকে বিনোদ আর তার পরিবার। মুখ্যমন্ত্রীর অগোচরেই অনেক কষ্ট করে বক্সার হওয়ার স্বপ্নকে লালন করছে বিনোদ। মাধ্যমিকের ছাত্রটি কিছুদিন আগেই ‘খেলো ইন্ডিয়া’তে অংশ নিয়ে জুনিয়র বিভাগে বাংলাকে ব্রোঞ্জ এনে দিয়েছে। এর আগে জুনিয়র ন্যাশানলেও পদক পেয়েছে। এইমুহূর্তে বাংলায় বিনোদই একমাত্র বক্সার যে জাতীয় স্তরে পদক পাচ্ছে।

বুধবার নিজের স্বপ্নের কথা বলার সময় বারবারই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ছিল সে। ‘‘ছোট থেকেই বক্সিং আমাকে আকৃষ্ট করত। দুই দাদাও বক্সার। বাবা আসলে নিজে বক্সার হতে চেয়েছিল। কিন্তু পারিবারিক অবস্থার জন্য পারেনি। তাই বাবা নিজের স্বপ্ন আমাদের মধ্যে দিয়েই পূরণ করতে চায়,’’ কথাগুলো বলায় সময় বিনোদ যেন কিছুটা উদাস হয়ে পড়ল। দুই দাদার চেয়ে ছোট ভাইয়ের প্রতিভা বেশি। তাই দাদারাও চান, ভাইকে সব রকম সাহায্য করে নামী বক্সার তৈরি করতে।

কয়লার দোকানে বিনোদ। নিজস্ব চিত্র

সকাল ছ’টা থেকে ন’টা প্র্যাক্টিস। বাবার কয়লার দোকানে কাজ, পড়াশুনো এবং স্কুল সামলে দুপুরে সময় বার করে ফের বারোটা থেকে একটা পর্যন্ত প্র্যাক্টিস করে বিনোদ। বিকেল পাঁচটা থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত আবার তার প্র্যাক্টিসের সূচি। ১২ মার্চ থেকে মাধ্যমিক শুরু। এই বছর মাধ্যমিক দেওয়ার কথা বিনোদের। পরীক্ষা শেষ হওয়ার ঠিক পরই ইয়ুথ ন্যাশানল।

মাধ্যমিক আর ইয়ুথ ন্যাশানলের প্রস্তুতি কী ভাবে একসঙ্গে নিচ্ছে বিনোদ? তার কঠিন লড়াইয়ের গল্প বলতে গিয়ে গলাটা যেন ধরে আসছিল তার, ‘‘ছোট থেকে বক্সার হওয়ার স্বপ্ন। বিজেন্দ্র সিংহের মতো বড় বক্সার হতে চাই। কিন্তু বাবার কয়লার দোকান থেকে যে আয় হয় তাতে কোনওমতে সংসার চলে। তার উপর আবার আমার ডায়েট মেনে খাওয়ার বিষয় রয়েছে। সব সময় সেটা মেনে চলা সম্ভব হয় না। মাধ্যমিক পরীক্ষাটাও ভাল করে দিতে চাই। তবে আমার আসল লক্ষ্য কিন্তু ইয়ুথ ন্যাশানল।’’

এর সঙ্গেই বিনোদ যোগ করে, ‘‘ইয়ুথ ন্যাশানলে সোনা পেলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে টুর্নামেন্টগুলোতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাব। যত আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশ নেব, তত বেশি নিজেকে তৈরি করতে পারব।’’

আলি কামারের সাফল্যের পর বাংলার বক্সিংয়ে সেই অর্থে বড় প্রতিভা কোথায়? আলি কমনওয়েলথে সোনা জেতেন। তারপর জুনিয়র বিভাগে জাতীয় পর্যায়ে পদক আনছে বিনোদ। বিনোদ বলছিল, ‘‘আমি কমনওয়েলথে পদক জয়ের স্বপ্ন দেখি। স্বপ্ন দেখি অলিম্পিক্সে দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করার। মেডেল আনার।’’ 

কিন্তু বাড়ি বাড়ি কয়লা দিয়ে, প্রয়োজনীয় ডায়েট, সঠিক পুষ্টি, সর্বোপরি ভাল প্রশিক্ষণ না পেয়ে কতদূর এগোতে পারবে বিনোদ? নাকি বিকশিত হওয়ার আগেই আরও একটি প্রতিভা অকালে ঝরে পড়বে!