রিং থেকে ছিটকে যাওয়া যাকে বলে, আক্ষরিক অর্থেই তাই হয়েছিল বিনেশ ফোগতের সঙ্গে| ২০১৬ রিও অলিম্পিক্সে হাঁটুতে চোট পেয়ে হুইল চেয়ারে করে কুস্তির ময়দান থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল বিনেশকে|

দু’বছর পরে সোনার প্রত্যাবর্তন বিনেশের| এশিয়ান গেমসে মেয়েদের কুস্তিতে ভারতীয় হিসেবে প্রথম সোনা জিতলেন বিনেশ| রিও-র চোখের জল যে তাঁকে কতটা শক্ত করেছে তাও শোনালেন তিনি|

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

তবে তাঁর সোনা জয়ের পিছনে বিনেশের বাবা-মা-কাকা এবং পরিবারের যে কতটা অবদান রয়েছে, সেই কাহিনি জানলে আপনার চোখেও জল চলে আসতে পারে|

পরিবার ও সমাজের চাপ এবং মায়ের ক্যানসার -এই সব প্রতিকূলতার মধ্যেই বিনেশ কুস্তির ময়দানে সাফল্যের কাহিনি তৈরি করেছেন|

গ্রামের মেয়ে কুস্তি শিখবে ও কুস্তির ময়দানে লড়াই করবে, এমনটা ভাবতেই পারত না হরিয়ানার বালালি গ্রাম| কিন্তু বিনেশের বাবা রাজপাল ফোগত চেয়েছিলেন, মেয়ে কুস্তিকেই কেরিয়ার হিসেবে বেছে নিক|

প্রতিরোধ শুধু গ্রামের লোকজনের থেকেই নয়, বিনেশের ঠাকুরদাদাও মেয়েদের কুস্তি শেখা নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন| সেই আপত্তি অগ্রাহ্য করেছিলেন রাজপাল|

কিন্তু বিনেশের বয়স যখন মাত্র আট বছর, তখনই তার বাবা রাজপাল মারা যান| তার কয়েক বছর পরে মা প্রেমলতার ক্যান্সার ধরা পড়ে| কিন্তু এই মারণরোগ যাতে মেয়ের কুস্তির ট্রেনিং-এ কোনও প্রভাব না ফেলে সেই চেষ্টাই করে গেছেন প্রেমলতা|

তিনি একাই বালালি গ্রাম থেকে রোহতকে কেমোথেরাপির জন্য যেতেন| মেয়েকে বিরক্ত করতেন না| প্রেমলতা চাইতেন মেয়েরা যেন খেলায় নাম করে| সোমবার সন্ধেবেলায় সেই স্বপ্নই পূরণ হয়েছে বিনেশের মায়ের|

তবে বাবা চলে যাওযার পর বিনেশ ও তাঁর বোন প্রিয়ঙ্কার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন কাকা মহাবীর সিংহ ফোগত| যিনি আরও দুই সোনা জয়ী (কমনওয়েলথ গেমসে) মেয়ে গীতা ও ববিতা ফোগতের বাবা|

মহাবীরই তাঁর প্রথম জীবনের কোচ ছিলেন| কুস্তিবীরদের পরিবারে থেকেই বিনেশের বড় হয়ে ওঠা| মহাবীরের মেয়ে গীতা, ববিতা, ঋতু, সঙ্গীতার সঙ্গেই বিনেশ ও প্রিয়ঙ্কার কুস্তিতে পাঠ নেওয়া শুরু|

২০০০ সিডনি অলিম্পিক্সের সময় হরিয়ানা সরকার কুস্তিতে মেডেল জিতলে বিরাট অঙ্কের আর্থিক পুরস্কারের ঘোষণা করেছিল| সেই বার কেউ পুরস্কার পায়নি|

তখনই মহাবীর শপথ নেন তিনি পরিবার থেকেই কুস্তিতে অলিম্পিক্স চ্যাম্পিয়ন বানাবেন| 

বিনেশের প্রথম আন্তর্জাতিক মেডেল ২০১৩ সালের এশিয়ান কুস্তি চ্যাম্পিয়নশিপে| সেখানে মেয়েদের ৫১ কেজি বিভাগে ব্রোঞ্জ জিতেছিলেন তিনি|  ২০১৪ সালে গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসেও তিনি মেয়েদের ফ্রিস্টাইল ৪৮ কেজি বিভাগে সোনা জিতেছিলেন|

এর আগে এশিয়ান গেমসে তিনি ৪৮ কেজি বিভাগে ব্রোঞ্জ জিতেছিলেন| ২০১৮ সালের গোল্ড ৫০ কেজি বিভাগের ফ্রিস্টাইল কুস্তিতে| 

যদিও গত বছর শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে তাঁকে কয়েক মাসের জন্য সাসপেন্ড করেছিল ভারতের কুস্তি ফেডারেশন| কিন্তু জাকার্তা এশিয়ান গেমসে তিনি যা পারফরম্যান্স করলেন, তাতে বিনেশের আত্মবিশ্বাস অবশ্যই বাড়বে| 

প্রসঙ্গত ২০১৬ সালে নির্মিত বলিউড ছবি ‘দঙ্গল’-এর কথা মনে করাচ্ছে বিনেশের এই সাফল্য। দঙ্গল তৈরিই হয়েছিল বিনেশের কাকা মহাবীর ফোগতের দুই মেয়েকে কুস্তিগীর বানিয়ে তোলার গল্পটিকে অবলম্বন করে। বিনেশের সাফল্যে সেই সিনেমার কথা মনে করছেন বলিউডপ্রেমী দেশবাসী।

২০২০ সালের টোকিও অলিম্পিক্সে সোনা জয়ের হাতছানি বিনেশের দিকে| আর তা সত্যি হলে স্বপ্ন সফল হবে বিনেশের কাকা মহাবীরেরও|