‘যাচ্ছিস যা, তবে চেরাপুঞ্জি এখন আর আগের মতো নেই। একেবারে ড্রাই।’ বন্ধুদের মুখে ‘ড্রাই’ শব্দটা শুনে বেশ আমোদিত হয়েছিলাম। তারাপীঠ অঞ্চলের বাসিন্দা আমি। আমার কাছে এ শব্দের অর্থ ‘মদহীন’।

খুব স্বস্তি পেয়েছিলাম এই ভেবে, চেরাপুঞ্জি মদ না পাওয়া গেলে হপ্তান্তে বারমুডা-বাহিনী অন্তত সেখানে হানা দেবে না। কিন্তু, ভ্রম ভাঙল যখন বন্ধুটি বলল, ব্যাপার তা নয়। ড্রাই বলতে, বর্তমানে চেরাপুঞ্জিতে আর সে ভাবে বৃষ্টিপাত হয় না।

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

না হোক! সে না হয় গিয়েই দেখব। তাই সপিরবারে সেঁধিয়ে গেলাম সরাইঘাট এক্সপ্রেসের পেটে।

শিলং শহরই বেস। সকাল সকাল সেখান থেকে বেরিয়ে পড়লাম চেরাপুঞ্জির উদ্দেশ্যে। ব্রিটিশ রীতিতে সাজানো গোছানো শিলং ছাড়াতেই একটু একটু করে পর্দা সরতে শুরু হলো সবুজে মোড়া পাহাড়ের থেকে।


মেঘ পিওনের হাতছানি।

পাহাড় কেটেই তৈরি হয়েছে দু’লেনের চওড়া রাস্তা। হুশ হাশ করে গাড়ি চলে যাচ্ছে উলটো দিক দিয়ে। প্রায় এক ঘণ্টার মাথায়, একটি লোহার সেতু পেরিয়ে গাড়ি থামাল চালক রাজদীপ। দুয়ানসিং সিয়েম ভি‌উ পয়েন্টে। বন্ধুদের কথা ভুল প্রমাণ করে তখন অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে। সবুজে মোড়া অতুচ্চ পাহাড় আর তার অতল ছোঁয়া খাদের সঙ্গে তখন জমজমাট খেলা চলছে সাদা-কালো মেঘ-বৃষ্টির। 

ভি‌উ পয়েন্টের সুদৃশ্য তোরণ পেরিয়ে নেমে গেলাম অনেকগুলো সিঁড়ি। পাশে পাহাড়ের গায়ে লম্বা লম্বা গাছের সারি। এক সময়ে দেখলাম, মেঘ আর বৃষ্টির মাঝে শুধুই আমরা। আর অনেক দূরে অনুপম দৃশ্য নিয়ে বিস্তৃত মাওডক ভ্যালি।

সিঁড়ি ভেঙে উঠে এসে বেশ খিদেই পেয়ে গিয়েছিল। ডিম-টোস্ট-চা দিয়ে ভরপেট টিফিন করে আবারও গাড়ি ছুটল। 


রামকৃষ্ণ আশ্রমের মন্দির

চেরাপুঞ্জির স্থানীয় নাম সোহরা। একটা পাহাড়ি বাঁকের পরে দূরে দেখা গেল চেরাপুঞ্জির রামকৃষ্ণ আশ্রমের মন্দির চূড়া। ভাবলে অবাক লাগে, পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলে জনজাতির জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে তাঁদের কী বিশাল কর্মকাণ্ড! সর্বত্যাগী সন্ন্যাসীদের উদ্দেশ্যে বিনম্র প্রণাম জানিয়ে এগিয়ে চললাম। 

গাড়ি দাঁড়াল দ্বিতীয় বার। এশিয়ার দ্বিতীয় উচ্চতম জলপ্রপাত ‘নোহকালিকায়’-এর সামনে। উচ্চতায় প্রায় ১১১৫ ফুট। বিপুল জলরাশি সবেগে আছড়ে পড়ে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জলকণায় পরিণত হয়ে সৃষ্টি করছিল মোহময় ইন্দ্রজাল। 

সময়ের আটকে যাওয়া কাঁটা সচল করতে, রাজদীপের আলতো চাপে গাড়ির ভেঁপু বেজে উঠল। প্রসঙ্গত, এখানে কেউ অকারণে গাড়ির হর্ন বাজায় না। ট্রাফিক আইন ভাঙলে অন্যান্য চালকরাই তার জন্য যথেষ্ট। 

রাজদীপের কথায়, চেরাপুঞ্জিতে নিশিযাপন না করলে অধরা থেকে যায় প্রকৃতির আসল রূপ-রস। কিন্তু উপায় নেই। 


বৃষ্টিস্নাত।

পরের হল্ট ইকো পার্ক। প্রাকৃতিক সম্ভারকেই কাজে লাগিয়ে মেঘালয় পর্যটন দফতর তৈরি করেছে এক অনুপম কীর্তি। শুরু হলো ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি। সেলফি তোলার হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। 

চেরাপুঞ্জি থেকে বাংলাদেশের দূরত্ব মাত্র ২০ কিলোমিটার। আর এখানেরই একটি জলপ্রপাত বয়ে গিয়েছে প্রতিবেশী দেশের দিকে। ‘সেভেন সিস্টার্স ফলস’— পাহাড়ের উপর থেকে সাতটি ধারায় জল গিয়ে পড়ছে পাহাড়ের খাদে। তার পার তা বয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশে। প্রসঙ্গত, পাহাড়ি পথে পাক থেকে খেতে যেতে হলে, বাংলাদেশের দূরত্ব হয়ে যায় প্রায় ৬০ কিলোমিটার।

জলপ্রপাতের নীচের দিকে, পাহাড়ের খাঁজে খাঁজেই রয়েছে পাহাড়ি জনবসতি। খালি চোখে দেখা যায় না। তবে, পর্যটকদের জন্য ব্যবস্থা রয়েছে দূরবিনের। মাত্র ১০ টাকায় ভাড়া করা যায় এই বস্তু। চোখে লাগাতেই ‘খেলাঘর’গুলি বাস্তবে পরিণত হলো। এই গ্রামের নাম কাউকাউ।


পাহাড়ের মাঝে।

গ্রামীণ ছবি থেকে দূরবিন ঘুরাতেই ভেসে উঠল পাহাড়ের সঙ্গে সমতলের মিলনস্থন। সেখানেই তো রয়েছে ‘সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলা’ বাংলাদেশ।

ঘোরার নেশায় সবাই বিভোর। কিন্তু পেটে কিছু না দিলেই নয়। পাহাড়ের কোলেই পাওয়া গেল এক নিরামিষ খাবারের হোটেল। একটি টেবিলে ৫-৬ জনের দল। হিন্দিতে কথা বলছেন নিজেদের মধ্যে। বোঝাই গেল, তাঁরা বাঙালি। কারণ, বাঙালিই বোধ হয় একমাত্র জাতি যারা বাইরে বেরিয়ে নিজেদের মধ্যেও হিন্দি বা ইংরেজিতে কথা বলে। 

কানে এল, একজন বলছেন— টেগোর মুঝে পসন্দ আতা হ্যায়, লেকিন উনকা রাইটিং আচ্ছা নেহি হ্যায়। আর বসে থাকতে পারলাম না। তা ছাড়া, আরও অনেক কিছুই দেখা বাকি।

আকাশ অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে। তাই বেশ কিছু ছবি তুলে নেওয়া হল এই সুযোগে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমরা। পাশেই সুগভীর প্রশস্ত খাদ। সেখানেই খেলা করে বেড়াচ্ছে সাদা মেঘ। হঠাত করেই এক গাদা কালো মেঘ ঝপাং করে এসে পড়ল তাদের ঘাড়ে। ভিজিয়ে দিল আশপাশ। এরই নাম নাকি চেরাপুঞ্জি!


জলধারা।

মনে পড়ে গেল এক সিলেটি কবির লেখা দুটো লাইন—
আঞ্জা মেঘ পুঞ্জা পুঞ্জা চেরাপুঞ্জির পারো
কালা মেঘ ফালদি পড়ে সাদা মেঘের ঘাড়ো।

এ সব ভাবতে ভাবতেই পৌঁছে গিয়েছিলাম মওসমাই কেভ। কিন্তু সাহস করে ঢুকতে পারলাম না। সাংখারাং পার্ক ও নাংগিথিয়াং ফলস দেখে হোটেল ফিরে গেলাম। 

পর দিন যাব মৌসিনরামের দিকে।