তিনি রয়েছেন লাগোসে। মন পড়ে কলকাতায়। বারেবারেই ফিরে যাচ্ছেন আট বছর আগের এক সন্ধেয়। তাঁর গোলেই যে ২০১০ সালে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল মোহনবাগান। সবুজ-মেরুন আবির উচ্ছ্বাসের রং হয়ে ঝড়ে পড়েছিল ময়দানে। বুধবার উৎসবের রাতেই চিডি এডে টাইমমেশিন ছাড়াই চলে গিয়েছিলেন সেই স্মরণীয় রাতে। নস্ট্যালজিয়ায় ভাসছেন। আবার ব্যথা অনুভব করছেন হৃদয়ে। পুরনো ক্ষত দগদগে হয়ে উঠছে। বোঝাই যাচ্ছিল সেই ক্ষত এখনও শুকোয়নি।

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

সেই বছর মোহনবাগানে একাধিক কোচ বদল হয়েছিল। বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য কোচ ছিলেন মোহনবাগানের। চিরাগ ইউনাইটেডের বিরুদ্ধে পেনাল্টি থেকে একমাত্র গোল করেছিলেন চিডি। সেই গোলেই গ্যালারিতে শুরু হয়েছিল লিগ জয়ের বর্ণাঢ্য উদযাপন। তবে সমর্থকদের আনন্দ, উচ্ছ্বাসের সবুজ-মেরুন বিস্ফোরণে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল তাঁর ব্যক্তিগত মানসিক যন্ত্রণা।

২০০৯-এ লিগ জয়ের নায়ক এখন আর সেই রঙিন দিন মনেই রাখতে চান না। অতীত ভুলে যেতে চান। কারণ, মোহনবাগান চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সময়েই যে নাইজেরীয় স্ট্রাইকার হারিয়েছিলেন তাঁর প্রথম সন্তানকে। ক্লাব যখন চ্যাম্পিয়নশিপের দোরগোড়ায়, তখনই তারকা ফুটবলারের স্ত্রী-র গর্ভপাত হয়ে যায়। প্রথম সন্তানকে হারানোর শোক বুকে চেপে চিডি নেমেছিলেন মাঠে। গোলও করেছিলেন।

কোচ বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য ও ব্যারেটোর সঙ্গে বাগান তাঁবুতে। — নিজস্ব চিত্র/ফাইল

বহু প্রতীক্ষার পরে মোহনবাগান কলকাতা চ্যাম্পিয়ন। আর পুরনো ক্লাবের গৌরবের মুহূর্তেই অতীত ক্ষত যেন টাটকা হয়ে উঠেছে। ‘‘ওই সময়ে আর ফিরে যেতে চাই না। ম্যাচে নামার আগেই খবর পেয়েছিলাম আমার স্ত্রী-র মিসক্যারেজ হয়ে গিয়েছে। মাথায় কিছু কাজ করছিল না। যে চলে যায়, তাকে তো আর ফিরিয়ে আনতে পারব না। তবে অসুস্থ স্ত্রীর মুখে হাসি ফোটাতেই মাঠে নামার সিদ্ধান্ত নি-ই। সেই ট্রফি জয় ছিল আমার স্ত্রীর জন্য।’’ পুরনো স্মৃতিতে লুকিয়ে থাকা আঘাত যেন ফুটে উঠে চিডির প্রতিটি শব্দে।

সেই ম্যাচের শেষ দিকে মাঠ থেকে বেরিয়ে যান। জার্সি পরিবর্তন করেই ছোটেন বিমানবন্দরে। ৮.৩০-এর ফ্লাইট ছিল। ক্ষত বিক্ষত স্মৃতির সরণিতে হেঁটে চিডি হোয়্যাটসঅ্যাপে লেখেন, ‘‘এয়ারপোর্টে যাওয়ার সময়ে গোটা রাস্তা কাঁদতে কাঁদতে গিয়েছিলাম। এখন অবশ্য নিজেকে মানিয়ে নিয়েছি, গুছিয়ে নিয়েছি।’’

পেশাদারি কাজের স্বার্থেই হোয়াটসঅ্যাপে অনুরোধ করা হয়, অতীত যন্ত্রণার অভিজ্ঞতা শেয়ার করার জন্য। ‘রক্তাক্ত’ চিডির তরফে ভেসে আসে উত্তর, ‘‘বন্ধু প্লিজ, আমি পারব না। সব মনে পড়ে গিয়েছে। বহুদিন পরে আজ আবার কাঁদলাম।’’ সময় সেই ক্ষতে প্রলেপ দিয়ে দিয়েছে। চিডি এখনও খেলতে ভালবাসেন। সবুজ মাঠের গালিচাতেই ভুলেছেন নিজের দুঃখ, কষ্ট, শোক!

সবুজ মেরুন উচ্ছ্বাসে চিডির সঙ্গী মুরিতালা। — নিজস্ব চিত্র/ফাইল

সেবার চিডির গোলে কলকাতা লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল মোহনবাগান। ডার্বিতে ইস্টবেঙ্গলের বিরুদ্ধে ৫-৩ জয়ের নায়কও যে তিনি। সেদিন যে প্রেসবক্সের উদ্দেশে মোহন-সমর্থকরা হাতের পাঞ্জা দেখাচ্ছিলেন। বোঝাতে চেয়েছিলেন, ‘‘পাঁচের বদলা পাঁচ।’’ হ্যাটট্রিক-সহ চার গোল করে একাই লাল-হলুদ গর্জন থামিয়ে দিয়েছিলেন ‘নাইজেরিয়ান গোলমেশিন’। 

বুধবার আবার সেই রাত। আনন্দের রাত। গঙ্গাপাড়ে উতলা হাওয়া ওঠার রাত। এই রাতেই বুকে পাথর চাপিয়ে চিডি শুধু বলে দেন, ‘‘মোহনবাগানকে অভিনন্দন। ওদের জন্য আমার শুভেচ্ছা রইল। ভালবাসা জানাবেন প্রত্যেক মোহনবাগানি সমর্থককে।’’