কোস্টাল ট্রেক বললেই মানুষ কেমন নিরাসক্ত ভঙ্গিতে তাকান! আমি ভেবে দেখেছি, এর পিছনে মূলত তিনটি কারণ কাজ করে— 

১| সমুদ্রের পাড় ব্যাপারটা গ্ল্যামারে কিছুতেই বরফের মুকুট পরা পাহাড়ের সঙ্গে এঁটে উঠতে পারে না।

২| বিচ বলতে আমরা তো সেই আদ্যিকাল থেকে দীঘা, মন্দারমণি, পুরী, গোপালপুর, চাঁদিপুরকেই চিনি। ওখানে আবার ট্রেকের কি আছে? ও তো পাতি সপ্তাহান্তের বেড়ানোর জায়গা। সবাই যায়। ট্রেকের মত গুরুগম্ভীর ব্যাপারের জন্য ততটা ঠিক "আপ মার্কেট" নয়।

৩| সমতলের মানুষদের বুকের ভিতর যে চোরা টান পাহাড়ের জন্য থাকে, তা বোধহয় একমাত্র পরকীয়ার টানের সঙ্গেই তুলনা করা যেতে পারে।

৪। সর্বপরি, হাঁচোড় পাঁচোড় করে উঠে কোনও পাহাড়ি খাঁজে তোলা ছবি পোস্টিয়ে প্রাণের যে আরাম মেলে, দিগন্ত বিস্তৃত তটভূমির উপর দাঁড়িয়ে তোলা ছবিতে তেমনটা ঠিক মেলে না। 


চাঁদিপুর-ভূচুন্ডেশ্বর, হাঁটা ও নদীপথ মিলিয়ে প্রায় ৬০ কিলোমিটার।

তাও ঠিক হলো কোস্টাল ট্রেক-ই হবে। চাঁদিপুর থেকে ভূশণ্ডেশ্বর। তিন দিনের হাঁটাপথ, নদীপথ মিলিয়ে প্রায় ৬০ কিলোমিটার। সাঙ্গোপাঙ্গ সমেত, শীতের এক দুপুরে পৌঁছে গেলাম চাঁদিপুর। রাতটুকু ওটিডিসি-তে কাটিয়ে পরদিন ভোর থেকে শুরু হল হাঁটা।

প্রথম দিকটা তেমন একটা উল্লেখযোগ্য নয়। রাজ্যের আবর্জনা, প্লাস্টিক মাড়িয়ে চলার শুরু। মানব সভ্যতা বলে কথা! একমাত্র সভ্য মানুষ-ই দায়িত্ব এবং যত্ন নিয়ে নিজের বসবাসের স্থান দূষিত করতে পারে।


নদীর পাড়েই বিশ্রামরত নৌকো।

এক নদীর কাছাকাছি আসতে এক মজাদার দৃশ্য দেখা গেল। গুটিকয় রঙিন, বেশ বড় সাইজের নৌকো ডাঙায় দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে। ক্যামেরা বাগিয়ে ছবি তোলার দারুণ ধুম পড়ে গেল।

বোঝা গেল নৌকো সারানোর এবং তৈরি করার অঞ্চলে ঢুকেছি। বুড়িবালাম নদী কাছে পিঠেই হবে। সেই বুড়িবালাম, যার তীরে বাঘা যতীন ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন এবং ধরা পড়েন। ১৯১৫ সালে। নদী পেরনোর পর যোশীপুর। পুলিশের গুলিতে আহত বাঘা যতীন তো নদী সাঁতরে এপারেই এসেছিলেন। বাকিটা মর্মন্তুদ।


শাঁপলার উঁকি ঝুকি

যোশীপুরের পর ছোট্ট, মিষ্টি গ্রাম মাঝিচক। লাল শাঁপলা ফুল ভর্তি পুকুর, বালি বালি মেঠো পথ। কৌতূহলী চোখের সারি পেরিয়ে বুড়িয়ামারি নদীর তীর ধরে এগোতে হবে অনেকটা, যতক্ষণ না বুড়িয়ামারির সঙ্গে দেখা হয় বঙ্গোপসাগরের। সেখান থেকে আবার নৌকো। প্রায় আধ ঘণ্টা নৌকা ভ্রমণ অন্তে কষাফল গ্রাম। আমাদের দ্বিতীয় দিনের ডেরা। চাঁদিপুর থেকে কষাফলের আনুমানিক দূরত্ব ২০ কিমি।

পরদিন রুটি-সবজি এবং অসামান্য চা (বেশি দুধ, নামমাত্র জল) সহযোগে ব্রেকফাস্ট সেরে রাকস্যাক গুছিয়ে নিলাম। প্যাক করে নেওয়া হলো লাঞ্চ। আজ রাস্তায় খাবার জুটবে না। হাঁটতে হবে ২০ কিমি মতো।


বালির উপরেই যখন আলপনা কেটে যায় সাগরের জল।

সূর্যের হাত থেকে বাঁচার জন্য পাতলা গামছা, ওড়না ইত্যাদি দিয়ে মুখ, গলা, ঘাড় পেঁচানো প্রায় সকলেরই। নামেই জানুয়ারি! দু’দন্ড হাঁটতে না হাঁটতেই সে কী গরম রে বাবা! চামড়া পোড়ানো রোদ একেবারে। ঘাম তেমন হওয়ার সুযোগ পায় না। সাগরের কুলুকুলু হাওয়াটা সব সময়ই সঙ্গে থাকে।

হাঁটতে হাঁটতে জানতে পারলাম সমুদ্রের ঢেউ যখন তীর ছেড়ে ফিরে যায়, অদ্ভুত সুন্দর এক রিনরিনে আওয়াজ হয়। তীরে পড়ে থাকা ঝিনুকের ওপর দিয়ে জল বয়ে যাওয়ার আওয়াজ, যা দূর থেকে ভেসে আসা নূপুরধ্বনির মতো শোনায়। শুনলাম আমরাও।


বালিতেই খানিক গড়াগড়ি।

এবার একটু বিশ্রাম। আবার তো নদী পেরনো আছে, হেঁটে হেঁটে। ভাঁটা লেগে গেছে অনেক ক্ষণ। এটার অপেক্ষাতেই ছিলাম। তিরতিরে নদী। হাঁটু পর্যন্ত প্যান্ট গুটিয়ে নদীতে নেমে কী যে আরাম! এত স্বচ্ছ আর পরিষ্কার জল যে নীচের নুড়ি-পাথরগুলো পর্যন্ত দেখা যায়। 

জোয়ার থাকলে এ নদী পেরনো যায় না। নৌকারও বন্দোবস্ত নেই। থাকার কথাও নয়! কটা মানুষ আসে এই পাণ্ডব বর্জিত অঞ্চলে? আসে না বলেই প্রায় সারা রাস্তা আমাদের সঙ্গ দেয় হাজার হাজার লাল কাঁকড়ার সৈন্যবাহিনী। আশে পাশে ভয়হীন ভাবে ওড়াউড়ি করে পাখির দল। 


পাখিদের রোদ পাহানো।

তৃতীয় দিনের ডেরা ডোগরা। সেখান থেকে ব্রেকফাস্ট সেরেই বেরিয়ে পড়তে হবে। আজ অল্প হাঁটা। কিলোমিটার দশেক। আজ এক সময় সমুদ্রের ধার ছেড়ে, ঝাউ-এর জঙ্গলে ঢুকবো। তার পর গ্রামের ভিতরে। সরু মেঠো রাস্তা বাঁক খাবে চাপাকলের পাশ দিয়ে, মিশে যাবে কারোর উঠোনে। কারোর ধানের গোলার পাশ দিয়ে আমাদের নিয়ে যাবে সুবর্ণরেখার ওপারে।

এখন তো নদীতে ভাটা, তাই কাদার মধ্যে হেঁটে নৌকার কাছে পৌঁছতে হবে। সাবধান! নরম এঁটেল মাটিতে হাঁটু পর্যন্ত ডুবে যায়। ওপারে ভূষন্ডেশ্বর। ওখানেই আমাদের ট্রেক শেষ।

ভূষন্ডেশ্বর দুপুরের খাওয়া শেষ করে শিবমন্দিরটি দেখতে যাবো। এই মন্দিরেই নাকি রয়েছে পৃথিবীর সবচাইতে বড় শিবলিঙ্গটি। মন্দির, শিবলিঙ্গ দেখে যাবো তালসারি। আজ রাত সেখানেই থাকা। 


ঘরে ফেরা।

কাল ফিরব চেনা দুঃখ, চেনা সুখগুলির কাছে। আস্তে আস্তে ব্যস্ততা আর যাপনের মলিনতার ইরেজার মুছে দেবে অনেক স্মৃতি। শুধু বেঁচে থাকবে "ইশ্ কী দারুণ ছিল দিনগুলো। কত মজা করেছিলাম"...

এই জানুয়ারিতে আবারও যাচ্ছি। এবার পারাদ্বীপ থেকে কোণারক। 

(ছবি সৌজন্য: সোমা’জ ক্যাম্প)

লেখক পরিচিতি

ভ্রমণের সঙ্গে অ্যাডভেঞ্চার— এটাই যেন
জীবনের মূল উদ্দেশ্য। তবে শুধু নিজেই নয়,
অন্যদেরও সেই স্বাদ পাওয়াতে ভালবাসেন।
তাই তৈরি করেছেন ‘সোমা’জ ক্যাম্পস’।
আকণ্ঠ নিমজ্জিত জীবন ও প্রকৃতির প্রেমে।