‘এসেছিলে তবু আস নাই, জানায়ে গেলে’, এমনই মনে হতো অসলোর গুটিকতক বাঙালির, যখন বাকি দেশ-বিদেশের বান্ধবেরা ই-মেল করে ছবি পাঠাত কেমন কাটল তাদের দুর্গোৎসব। অবশ্য কোনও কোনও বছর তিন-চারটে গাড়ি চালিয়ে সুইডেনের রাজধানীতে দলবেঁধে একত্রে যাওয়া হতো, কিন্তু যাতায়াতের ধকলে আর অতিথি হয়ে পুজো দেখে কোথাও যেন দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতো অবস্থা হতো, তাই দল আর ভারী হল না। 

এদিকে, ২০০৮ সালের মার্কিন অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পরে ধীরে ধীরে গবেষক, প্রযুক্তিবিদ আর তথ্যপ্রযুক্তির কর্মীদের সংখ্যা বাড়তে লাগল। বাড়ল কিছু ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যাও। নরওয়ে দেশটি বিশ্বের দরবারে ‘নিশীথ সূর্যের দেশ’ বলে সুপরিচিত। কিন্তু, বাস্তব এই যে, অপরাহ্নের চন্দ্রিমাই বেশি করে দেখতে হয়। দ্রুত ছোট হয়ে আসে শরতের দিনের দৈর্ঘ্য। নরওয়ে সাধারণ বাঙালির কাছে বিদেশে পাড়ি জমানোর সর্বোত্তম পছন্দ না হলেও কিছু অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় আর ভাগ্যান্বেষী বঙ্গসন্তানের আবাস ছিলই। একে একে দুয়ে তিনে মিলে আড্ডা হাসি গানে ভোজনে চলতো প্রবাসের বঙ্গজীবন। স্বদেশী ভাষা, সহৃদয়তা, আন্তরিকতা আর সুস্বাদু রন্ধন একই আড্ডায় নিয়ে এসেছিল সন্ন্যাসী, মধ্যপন্থী, এমনকী অতি-বামপন্থীকেও, পেশাগত পরিচয় নয়, বাঙালি পরিচয়ই যে বাঁধনের মূল কারণ। 

২০০৮ সালে কথাবার্তা-পরিকল্পনা হলেও, কাজের কাজ হয়ে উঠল না। কিন্তু ২০০৯ সালের দোলযাত্রার পর জন্মদিনগুলোর অনুষ্ঠানে প্রবল আলোচনায় উঠে এল দুর্গাপুজো করার কথা। কিছু প্রবীণের আপত্তি এল যে, দুর্গাপুজো মোটেও সহজ নয় আর বেশ খাটুনিও আছে। হেলাফেলা করে পুজো করলে দেবী রুষ্টও হতে পারেন। চাপ বাড়ল দুর্গাপুজো করার। কথায় বলে, চার বঙ্গসন্তান একত্র হলে, প্রবাসেও দুর্গাপুজো করবে। আর গুনে দেখা গেল যে, বঙ্গসন্তানের সংখ্যা প্রায় চল্লিশে পৌঁছেছে। অতএব, পুজো প্রায় অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠল। অভাবনীয় উদ্যোগ নিলেন মহিলারা। ঠিক হল, কোনও কার্যনির্বাহী পদ সৃষ্টি করা হবে না, বরং সকলে মিলে দফায় দফায় আলোচনা করে সমস্ত কাজ সম্পন্ন করা হবে। সব্বাই এককাট্টা হয়ে ঠিক করা হল, পারস্পরিক সুবিধা আর পারদর্শিতা বুঝে নিয়ে কর্মসম্পাদনের দায় ভার দেওয়া হবে ছোট ছোট ভাগে। পুরুষরাও সোৎসাহে সমর্থন জানিয়ে ঐক্যতানে যোগ দিলেন। 

তখনও বৈদ্যুতিন সামাজিক মাধ্যমগুলো এত বেশি চালু হয়ে ওঠেনি, তাই ওয়েবসাইট বানিয়ে যথাসম্ভব পুজোর প্রচার করা হল। কম সময়ে দশকর্মার জিনিস আর কলকাতা থেকে ফাইবারগ্লাস-এর একচালা প্রতিমা আনানো হল। কথাগুলো শুনতে যত সহজ, কাজগুলি করে ওঠা মোটেই সহজ নয়। বিদেশের দৈনন্দিন জীবনে সাহায্যকারী হাত মোটেই সহজলভ্য নয়। সব কিছু সামলে কেবল বাঙালিয়ানাকে ছুঁয়ে ফেলবার চাহিদায় সবাই হাতে হাত আর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সুষ্ঠু ভাবে পুজো করবার প্রচেষ্টা চলল। আশ্চর্যভাবে বাঙালি পুজোর কাজ জানা ব্রাহ্মণের অভাব দেখা দিল। সেই সমস্যারও সমাধান হল সনাতন মন্দিরের প্রধান পুরোহিত রাজি হওয়ায়। সমস্যা আরও হল, কোথায় পাওয়া যাবে কলা-বউ? কোথায় পাওয়া যাবে ১০৮টি অকালবোধনের পদ্মফুল? যোগাযোগ করা হল বাগান রোপনের বড় দোকানগুলোয়, শ্রীলঙ্কার তামিল মালিদের দোকানগুলোতেও জানতে চাওয়া হল কোনও বিকল্প আছে কি না! লাতিন আমেরিকা থেকে আসা কচি কলাগাছ পাওয়া গেলেও পদ্মফুলের বিকল্প মেলা অতি দুষ্কর। অনেক অনুসন্ধানের পর পাওয়া গেল একটা বিরল সুন্দর ফুল যা হুবহু মিলে যায় প্রকৃত পদ্মফুলের সঙ্গে। পদ্মের মতোই সৌরভহীন। ১০৮টি সংখ্যায় বায়না করে পাওয়াও গেল।

বিদেশের পুজো যথাসম্ভব শাস্ত্র মেনে করার চেষ্টা হলেও নির্ঘণ্ট মেনে চালানো গেল না, সপ্তাহান্তের দিনগুলিকেই বেছে নিতে হয় সংগঠকদের। ইউরোপের বাকি সন্নিহিত দেশ আর সুইডেনের আশপাশের শহর থেকে বাঙালিরা পুজোর খবরে উৎসবের আমেজে নির্ভেজাল আড্ডা আর প্রায় ষোল আনা বাঙানিয়ানায় ভরা বাংলা আর কিঞ্চিৎ বলিউডি মিশেলের মনোরম ঘরোয়া সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আহ্বানে জমায়েতে ইতিউতি সামিলও হলেন। কালে কালে কলেবরে কল্লোলে বেড়ে উঠল এই দুর্গাপুজো। নবপত্রিকা থেকে সন্ধিপুজো, সন্ধারতি আর সিঁদুরখেলা— কোনও আচারই বাদ থাকে না আর, ঢাকের তালে কোমর দুলিয়ে আর লাবড়া-খিচুড়ি আঙুল চেটে খেয়ে হই হই করে কেটে যায় পুজোর দিনদুলো। বৃহস্পতিবার রাত্তিরে মূর্তিস্থাপন আর রবিবার রাত্তিরে নিপুণ হাতে পুজো হয়ে যাওয়া প্রেক্ষাগৃহের মেঝে পরিষ্কারের পর অসলোর বাঙালিরা সোমবারের সকালে ক্লান্ত শরীরে নরওয়েজিয়ান সহকর্মীদের সঙ্গে সমানতালে পেশাগত দায়িত্বও সামলান। কিন্তু মনে থাকে এক অপূর্ব তুষ্টি।

পুজো মণ্ডপে পৌঁছনোর ঠিকানা
Furuset Vel, Furusetveien 1,
Oslo, Norway-1053

ওয়েবসাইট
www.oslopuja.com