জমিদারি, আধিপত্য ও প্রাচুর্য্য প্রদর্শনের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে, ১৮ শতকের শেষে 'বারোয়ারি' আর বিংশ শতাব্দীর শুরুতে উত্তর কলকাতার সর্বজনীন দুর্গাপুজোর মাধ্যমে, বাঙালির সর্ববৃহৎ উৎসবের সীমানা সাধারণের জন্য উম্মুক্ত হয়েছিল। বিশ্বায়নের পরিসরে দুর্গাপুজো আজ এক বিশ্বজনীন উৎসব। ষাটের দশকের প্রথমার্ধে লন্ডনে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম 'বিদেশী' দুর্গাপুজো। ক্রমশ তা ছড়িয়ে পড়ে বাকি পাঁচ মহাদেশেও। 

ব্রিটেনে দুর্গাপুজো বেশ পুরনো ও পরিচিত হলেও, স্কটল্যান্ডে দুর্গাপুজো তুলনামূলক ভাবে নবীন। স্কটল্যান্ডের রাজধানী এডিনবরাতে প্রথম দুর্গাপুজো অনুষ্ঠিত হয় ২০১৪ সালে। এ বছর এডিনবরা দুর্গোৎসবের চতুর্থ বর্ষপূর্তি।

স্কটিশ এসোসিয়েশন অফ বেঙ্গলি আর্টস এন্ড সাংস্কৃতিক হেরিটেজ (SABASH)-এর উদ্যোগে এবং এডিনবরা হিন্দু মন্দির ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত হয় স্কটিশ রাজধানীর একমাত্র দুর্গাপুজো— এডিনবরা দুর্গোৎসব। ২০১৬-র শুরুতে গড়ে ওঠা ‘সাবাশ’ স্কটল্যান্ডের মাটিতে বাঙালি ঐতিহ্যকে বয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ করছে দায়িত্ব সহকারে। দুর্গাপুজোর আয়োজন ছাড়াও পয়লা বৈশাখ, রবীন্দ্র জয়ন্তী, বিজয়া সম্মেলনীতে সকলকে সমবেত হওয়ার সুযোগ করে দেয় ‘সাবাশ’।

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর


এডিনবরা দুর্গোৎসব আর অন্যান্য উৎসবের আয়োজনে একটা বড় ভূমিকা থাকে তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে কর্মরত বাঙালি ইঞ্জিনিয়ারদের। স্বল্পমেয়াদী বা দীর্ঘমেয়াদী ভিসায় এডিনবরাতে কর্মরত তরুণ-তরুণীদের দেশীয় সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা ও বাঙালীয়ানাকে উদযাপন করার উদ্দীপনাই এডিনবরা দুর্গোৎসবের সাফল্যের অন্যতম প্রধান কারণ।

বিদেশের অধিকাংশ দুর্গাপুজোই অনুষ্ঠিত হয় সপ্তাহান্তের ছুটিতে। কিন্তু, এডিনবরা দুর্গোৎসব পালন করা হয় পঞ্জিকা অনুসারে। বোধন, কলা বউ স্নান, কুমারী পুজো, সন্ধিপুজো, দধিকর্মা, সিঁদুর খেলা— সবই হয় নিষ্ঠা ও আচার সহকারে। প্রসাদ ও ভোগের ব্যবস্থা হয় মন্দির প্রাঙ্গণেই।

এডিনবরা দুর্গাপুজোর প্রথম বছর থেকেই পুজো ও আচার অনুষ্ঠানের দায়িত্ব পালন করে আসছেন পন্ডিত ব্রহ্মচারী ব্রজবিহারী শরণ। এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংস্কৃতে ডক্টরেট ব্রজবিহারী মহারাজ বর্তমানে আমেরিকার জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দু শাস্ত্র ও শিক্ষার প্রধান। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম হিন্দু ধর্মযাজকও বটে। এবছরও তিনি সুদূর আমেরিকা থেকে স্কটল্যান্ড পাড়ি দিয়েছেন, এডিনবরা দুর্গোৎসবের প্রধান পুরোহিতের ভূমিকা পালন করবার উদ্দেশ্যে।

দুর্গাপুজোর পাঁচটা দিন এডিনবরার প্রায় পাঁচশো বাঙালি যেন এক বৃহত্তর পরিবারের অংশ হয়ে ওঠেন এই দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে। শুধু বাঙালিরাই নন, অন্যান্য ভাষাভাষীর ভারতীয় ও বিদেশি মানুষজনও আসেন মাতৃদর্শনে। মাতৃ আরাধনার পাশাপাশি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গান, কবিতা, নাটক, ধুনুচি নাচ, নৃত্যানুষ্ঠান ইত্যাদি বাংলার মাটির সঙ্গে ৫০০০ মাইলের দূরত্বটাকে নিমেষে অদৃশ্য করে তোলে। প্রকাশিত হয় বার্ষিক শারদীয়া পত্রিকা 'এডি-ব্লসম'।

বিজয়ার কোলাকুলি, মিষ্টিমুখ, সৌহার্দ্য বিনিময়ের রেশ কাটিয়ে ওঠার মধ্যেই ‘সাবাশ’ আয়োজন করে এক মনোজ্ঞ বিজয়া সম্মিলনী সন্ধ্যার, যার অন্যতম আকর্ষণ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর ষোলো আনা বাঙালি খাবার।

বিগত বছরের তুলনায় একধাপ এগিয়ে এ বছর বিজয়া সম্মিলনীতে থাকছে বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী ও গীতিকার সাহানা বাজপেয়ীর একক অনুষ্ঠান ও স্থানীয়দের বিচিত্রানুষ্ঠান। এডিনবরা দুর্গোৎসব কুর্নিশ জানায় বিশ্বজনীন বাঙালীয়ানাকে।


বিশদে জানতে দেখুন এডিনবরা দুর্গোৎসবের ওয়েবসাইট:  http://edinburghdurgotsav.com/
ফলো করতে পারেন: ফেসবুক,  টুইটার