তবু মঙ্গলবার সকালে তিনি দেশে ফিরলেন নিঃশব্দে! ইন্দিরা গাঁধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাঁকে বরণ করার জন্য কেউ ছিলেন না। ভুবনেশ্বর বিমানবন্দরে অবশ্য তাঁর জন্য মালা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন দ্যুতির কলেজের বান্ধবীরা। চিনা তাইপে’তে হওয়া এশিয়ান গ্রঁ প্রি-র ১০০ মিটারে রুপো জিততে দ্যুতি সময় নিয়েছেন ১১.৫২ সেকেন্ড। মঙ্গলবার ভুবনেশ্বর থেকে ফোনে দ্যুতি বললেন, ‘‘রিও অলিম্পিক্স থেকে ফেরার পর এটা ছিল আমার প্রথম আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট। তাই, সময় নিয়ে খুব বিচলিত নই। জুলাইয়ে এশিয়ান ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড চ্যাম্পিয়নশিপে আশা করছি পুরনো সময়ে দৌড়তে পারব।’’ পুরনো সময় মানে, ১১.২৪ সেকেন্ড! সাম্প্রতিককালে দ্যুতির সেরা সময়। যে সময়ে ১০০ মিটার দৌড়ে ৩৬ বছর পরে একমাত্র ভারতীয় মহিলা স্প্রিন্টার হিসাবে রিও’তে নামার যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন দ্যুতি। ২১ বছর বয়সি স্প্রিন্টারের কোচ নাগাপুরী রমেশের ব্যাখ্যা, ‘‘এখন দ্যুতির প্রয়োজন উন্নত মানের ট্রেনিং।’’ 
দ্যুতি’কে সেই লক্ষ্যে পৌঁছে দেওয়ার নিঃশব্দ প্রস্তুতি চলছে হায়দরাবাদে। যার ফল, অদূর ভবিষ্যতে জার্মানির একটি বিখ্যাত অ্যাকাডোমির সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধবেন দ্যুতি। সেই গাঁটছড়া আগামী জুলাইয়ে ভুবনেশ্বরে হতে চলা এশিয়ান ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড চ্যাম্পিয়নশিপের আগেই সম্পন্ন হবে বলে আশা রমেশের। আরও তাৎপর্যপূর্ণ, দ্যুতির জন্য এই উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছেন পুল্লেলা গোপীচন্দ! এই প্রসঙ্গে ব্যাডমিন্টন দ্রোণাচার্যের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। কিন্তু উচ্ছ্বসিত দ্যুতির কোচ বলে দিলেন, ‘‘দ্যুতি তো গত দু’বছর ধরে গোপীচন্দ ব্যাডমিন্টন অ্যাকাডেমির হস্টেলে থাকে। ওখানকার জিম ব্যবহার করে। এমনকী, মাঝে মাঝে পি ভি সিন্ধু, এইচএস প্রণয়দের সঙ্গে ফিটনেস ট্রেনিংও করে।’’ সঙ্গে যোগ করলেন, ‘‘দ্যুতির জন্য জার্মানির অ্যাকাডেমির খবর আনা এবং ওদের কর্তাদের সঙ্গে প্রাথমিক কথাবার্তাও গোপীই বলেছিল। তারপর আমার সঙ্গে কথাবার্তা এগোচ্ছে।’’ রমেশের কথা অনুযায়ী, আগামী জুনে জার্মানির অ্যাকাডেমি থেকে একজন কোচের হায়দরাবাদে আসার কথা। তারপর, বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপের আগে দ্যুতিও যেতে পারেন জার্মানিতে। তাঁর প্রধান লক্ষ্য আগামী বছর কমনওয়েলথ গেমস, এশিয়ান গেমস এবং বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে নামার আগে বর্তমান সময় কমানো।’’ 
কিন্তু এশিয়ান গ্রঁ প্রি-তে দ্যুতির রুপো জয়ের আনন্দ থেমে গেল মঙ্গলবার নয়াদিল্লি থেকে ভুবনেশ্বরে পৌঁছে। সেখানে পৌঁছে দ্যুতি জানলেন, গত মঙ্গলবার রাতে তাঁর একমাত্র ন্যানো গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। গাড়িটি সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে গিয়েছে! এই ন্যানো গা়ড়ি দ্যুতি উপহার পেয়েছিলেন চার বছর আগে। অনূর্ধ্ব ১৯ জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের ১০০, ২০০ এবং ৪০০ মিটারে তিনটি ব্যক্তিগত সোনা জেতার পর। ফোনে এই প্রসঙ্গে কথা বলার সময় দ্যুতি যেন কেঁদেই ফেললেন! তিনি বললেন, ‘‘অনেক পরিশ্রমের ফসল ছিল এই উপহারটা। আরও গুরুত্বপূর্ণ যে, এটা আমার প্রথমবার পাওয়া কোনও মনে রাখার মতো উপহার। পরিবারের লোকেরা গোপালপুর থানায় এফআইআর করেছে। কিন্তু গাড়ি তো ফেরত পাওয়া যাবে না।’’
সম্প্রতি ওড়িশা ক্রীড়ামন্ত্রক চাকরি দিয়েছে এই স্প্রিন্টারকে। দ্যুতি জানালেন, কিছুটা হলেও এখন আর্থিক সমস্যার সঙ্গে লড়াই করতে পারছে তাঁর পরিবার। কিন্তু এখনও তাঁর পট শিল্পী বাবাকে প্রত্যেকদিন কাজে যেতে হয়। দ্যুতি বললেন, ‘‘জানি কাজটা খুব কঠিন। তবু, এশিয়ান ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড চ্যাম্পিয়নশিপে পদক জিততে পারলে আর্থিক সমস্যা হয়তো একটু কমবে। তখন হয়তো বাবাকে বলতে পারব এবার বাড়িতে বিশ্রাম নাও।’’
দ্যুতির লড়াই থামেনি। তাই মাত্র দু’দিন ছুটি কাটিয়ে বৃহস্পতিবারই  তিনি ফিরছেন হায়দরাবাদে। প্র্যাক্টিস শুরু করতে!