খলনায়ক, আবার তিনিই নায়ক। বিশ্বকাপের মায়াবী দুনিয়া থেকে সটান পাড়ি দিয়েছিলেন কলকাতায়। রাজপথ থেকে গলির পৃথিবীতে অভিষেক ঘটিয়ে জনি জেরার্ডো অ্যাকোস্টা জামোরা বুঝলেন কলকাতা ফুটবল কী জিনিস! এক মাস আগেই চলে এসেছিলেন। তার পর স্রেফ অনুশীলন করে গিয়েছেন। আইএএফ অফিসে তাঁর সইয়ের জন্যও একরাশ নাটক দেখেছিল এই শহর।

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

তার পর ডার্বিতে নেমেই তিনি নায়ক ও খলনায়ক— একাধারে! হাজার হাজার দর্শকে ঠাসা স্টেডিয়াম, হাজার ডেসিবেলের শব্দব্রহ্ম— চিরকালীন ডার্বি আবহ। এমন প্রেক্ষাপটেই নেমারকে সামলানো জনি অ্যাকোস্টা প্রায় খলনায়ক বনে গিয়েছিলেন আধ ঘণ্টার মধ্যে। জোড়া গোল হজম করে। মেহতাব সিংহ ও জনি অ্যাকোস্টা- দুই স্টপারকে দেখে মনে হচ্ছিল কেউ কাউকে চেনেন না। 

নিজেদের মধ্যে ‘পরিচয়’ সারার আগেই দু’গোল হজম। ঝাড়গ্রাম থেকে প্রথমবার ডার্বিতে খেলতে নামা পিণ্টু মাহাতো এবং দ্বিতীয়বার হেনরি কিসেক্কা জোড়া গোল করে যেন যুবভারতীতে রিংটোন সেট করে দিয়েছিলেন, বিশ্বকাপার তো কী, কুছ পরোয়া নেহি! প্রথমার্ধের মোহনবাগান যেন ‘টাট্টু ঘোড়া’! ছুটছে তো ছুটছেই। কাশিম আইদারা, আল আমনা, কমলপ্রীত, ব্রেন্ডন তখন কোথায়? আতসকাচ দিয়ে খুঁজতে হচ্ছে রত্নখচিত ইস্টবেঙ্গলের মাঝমাঠ।

অন্যদিকে, অরিজিৎ বাগুই, পিণ্টু মাহাত, ব্রিটো, সৌরভদের সদম্ভ ফুটবল দেখে ২০১৪-এর ব্রাজিল-জার্মানি ম্যাচের স্কোরকার্ডও স্মৃতিতে ভেসে আসছিল। অবধারিত ভেসে আসছিল ’৭৫-এর ৫-০-র স্মৃতিও। কলকাতা লিগের সেরা মিডফিল্ডার ধরা হচ্ছিল আমনাকে। এদিন শঙ্করলাল আমনার পিছনে লাগিয়ে দিয়েছিলেন সৌরভকে। সৌরভের ‘দাদাগিরি’-তেই থমকে গিয়েছিলেন সিরিয়ান ম্যাজিসিয়ান। আর হৃদপিণ্ড থমকে যেতেই ইস্টবেঙ্গলের আক্রমণ হাফলাইন পেরোতে ঘাম ছুটে যাচ্ছিল।

মোহনবাগানের মাঝমাঠের রোদের ঝলসানি থেমে গেল প্রথমার্ধের সংযোজিত সময়ে। শহর কলকাতায় প্রথমবার বল পায়েই ফ্লপ নায়ক যাঁকে ধরা হচ্ছিল, সেই জনি-ভাইয়ের কাছ থেকেই এল গোল। পা দিয়ে নয় মাথা দিয়ে তিনি ব্যবধান কমালেন। সেট পিস থেকে উড়ে আসা বলে মাথা ছুঁইয়েই গোলে বল রেখেছিলেন জনি। শিল্টন রুখে দিলেও রিবাউন্ড থেকে জনির শরীরে বল লেগেই জালে জড়ায়।

এটাই ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট! প্রথমার্ধ যদি মোহনবাগানের নামে লেখা হয়। দ্বিতীয়ার্ধ পুরোটাই লাল-হলুদ সুগন্ধ যুবভারতীর মাঠে। প্রথম গোলে দলকে চাগিয়ে দেওয়া জনি বিরতির পরেই অবতীর্ণ হলেন নেতার ভূমিকায়। অন্যদিকে, ক্রমশই যেন মিইয়ে গেল মোহনবাগান। ম্রিয়মান মোহনবাগানের জালে সমতা ফেরানোর গোল করে গেলেন লালডানমাইয়া। ২-২ হয়ে যাওয়ার পর শেষ আধ ঘণ্টা আবার শঙ্কর-সুভাষের সাবধানি গা বাঁচানোর স্ট্র্যাটেজি দেখল লাখো সমর্থক। ডিকা জোড়া সিটার মিস না করলে অবশ্য মুখে হাজার ওয়াটের হাসি নিয়ে ফিরতে পারতেন শঙ্করলাল।

জনি অ্যাকোস্টা, ডিকা, কিংসলে, আমনা, হেনরি— তারকাদের মঞ্চেই আবার নিবে গেলেন মেহতাব হোসেন নামের বঙ্গতনয়। কলকাতা লিগের পরে অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন আগেই। সেই অর্থে এটাই ছিল বাঙালির শেষ সুপারস্টার ফুটবলারের শেষ ডার্বি। নিজের বিদায়ী ডার্বিতে মেহতাব হোসেন মাঠে থাকলেন ঠিক তিন মিনিট। দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নেমে তিন মিনিটেই চোট পেয়ে বিষণ্ণ প্রস্থান তাঁর।

কলকাতা ফুটবলে একজনের উত্থান, অন্যজন নিভে গেলেন। — ফাইল চিত্র

কেরিয়ারে কত ডার্বি খেলেছেন! শেষ ডার্বিতেই ‘রক্তাক্ত’ হতে হল তাঁকে। ডার্বি সত্যিই জন্ম দেয় পিণ্টুর মতো উঠতি তারার, কখন আবার নিবিয়ে দেয় মেহতাবের মতো প্রতিষ্ঠিত নক্ষত্রকে। ডার্বির মাহাত্ম্য এখানেই।

ঘটনা যাই হোক, প্রথমার্ধের শুরুতেই দু’গোলে পিছিয়ে থাকা ইস্টবেঙ্গল-ই যে ডার্বিতে নৈতিক জয় পেয়ে গেল জোড়া গোল শোধ করে, এতে কোনও সন্দেহ নেই।