মেট্রোর কাজের জন্যই নাকি ভেঙে পড়েছে মাঝেরহাট সেতু। রাজ্য সরকারের দাবি এমনই। মেট্রোর দিকে আঙুল তুলে আপাতত মাঝেরহাটে জোকা-বিবাদী বাগ মেট্রো প্রকল্পের কাজই বন্ধ করে দিয়েছে রাজ্য সরকার। 

বৃহস্পতিবার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই জানিয়েছেন, শহরের কুড়িটি সেতুর মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গিয়েছে। সেই তালিকায় রয়েছে অতি ব্যস্ত শিয়ালদহ উড়ালপুলও। অথচ এই সেতুর পাশেই একইভাবে চলছে ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো রেলের কাজ। 

গ্রাফিক্স-বিশ্বজিৎ দাস

কয়েকমাসের মধ্যেই সেতুর নীচ দিয়ে টানেল বোরিং মেশিনের সাহায্যে সুড়ঙ্গ খোঁড়ার কথা। রাজ্যের দাবি অনুযায়ী আয়ু শেষ হয়ে যাওয়া শিয়ালদহ উড়ালপুলের নীচে মেট্রোর কাজও কি তবে ঝুঁকিপূর্ণ?

মাঝেরহাট সেতুর থেকেও চল্লিশ ছুঁই ছুঁই শিয়ালদহ উড়ালপুল দিয়ে অনেক বেশি যানবাহন চলে। সবথেকে বড় কথা সেতুর নীচ দিয়ে রোজ যাতায়াত করেন লাখো মানুষ। গোটা সেতুর নীচে রয়েছে অসংখ্য দোকান, বাজার। এতকিছুর পরেও বিশেষজ্ঞরা কিন্তু শিয়ালদহ উড়ালপুলের নীচে মেট্রোর কাজ নিয়ে উদ্বেগের কিছু দেখছেন না। 

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

বিশেষজ্ঞদের দাবি, কোনও সেতুর ইনফ্লুয়েন্স এরিয়া বা তার ভর যতটা এলাকা জুড়ে বিস্তৃত থাকে, তার উপর নতুন নির্মাণকাজের কোনও চাপ না পড়লেই ঝুঁকির সম্ভাবনা কমে যায়। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলের এক প্রাক্তন কর্তার মতে, রেল যে ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করে কাজ করে তাতে কাজ চলাকালীন ন্যূনতম সমস্যা হলেও ধরা পড়ার কথা। কারণ ব্যস্ত এলাকায় রেলের বড় কোনও নির্মাণকাজের সময়ে বিভিন্ন ধরনের ক্যালিবারেশন মিটার ব্যবহার করা হয়। যেমন সেটলমেন্ট মিটার, ইনক্লিনেশন মিটার, ওয়াটার মিটার ইত্যাদি। 

গ্রাফিক্স- বিশ্বজিৎ দাস

এই মিটারগুলি প্রকল্প এলাকার আশপাশের সমস্ত বাড়ি, সেতুতে বসানো হয়। প্রাক্তন ওই রেলকর্তার কথায়, ‘‘কাজ চলার সময় কোনও বাড়ি বা সেতু যদি এক মিলিমিটারও হেলে যায় বা বসে যায়, সঙ্গে সঙ্গে তা রেলের ইঞ্জিনিয়াররা জানতে পারবেন। সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।’’

অনেকটা একই মত কলকাতা পুরসভার টাউন প্ল্যানিং বিভাগের প্রাক্তন ডিজি এবং বর্তমানে শিবপুর আইআইইএসটি-র অধ্যাপক দীপঙ্কর সিনহারও। উদাহরণ হিসেবে দীপঙ্করবাবু ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো প্রকল্পেরই গঙ্গা নীচে সুড়ঙ্গ তৈরির কথা উল্লেখ করছেন। 

শুধু তাই নয় গঙ্গা পার করে যেভাবে ব্র্যাবোর্ন রোড উড়ালপুল এবং একাধিক বিপজ্জনক বাড়ির নীচ দিয়ে নির্বিঘ্নে মেট্রোর সুড়ঙ্গ তৈরি হয়েছে, তাও তুলে ধরছেন অভিজ্ঞ এই নির্মাণ বিশেষজ্ঞ।

তাঁর কথায়, নির্মাণকাজের সময় এখন যে ধরনের সূ্ক্ষ্ম যন্ত্র ব্যবহার করা হয়, তাতে আশেপাশের কোনও বাড়ি বা নির্মাণে ন্যূনতম বিচ্যুতি এলে তা ধরা পড়ে যাবে। সাধারণত এই ধরনের বিচ্যুতির ক্ষেত্রে কী ধরনের সতর্কতা নেওয়া হবে, তারও বিভিন্ন স্তর থাকে। যেমন ‘কশন’, ‘অ্যালার্ট’ ইত্যাদি। সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে নির্মাণকাজ বন্ধ করতে হবে কিনা। 

প্রসঙ্গত, ব্র্যাবোর্ন রোডের নীচ দিয়ে মেট্রোর সুড়ঙ্গের নির্মাণকাজ চলাকালীন বেশ কয়েকটি বাড়ির বাসিন্দাদের অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে রাখা হয়েছিল। যান চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছিল ব্র্যাবোর্ন রোড উড়ালপুলে। টানল বোরিং মেশিন কাজ শেষ করার পরে বেশ কয়েকমাস কাটলেও এখনও ওই এলাকায় বড় কোনও সমস্যা ধরা পড়েনি।

শিয়ালদহ উড়ালপুলের নীচে সারাদিন এরকমই ভিড় থাকে। ফাইল চিত্র

ধর্মতলা থেকে শিয়ালদহের প্রস্তাবিত মেট্রো রুটেও অনেক বিপজ্জনক বাড়ি রয়েছে। তার তালিকা তৈরি করে ফেলেছেন প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা কেএমআরসিএল কর্তৃপক্ষ। পুজোর পরই হয়তো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে ধর্মতলা থেকে শিয়ালদহ পর্যন্ত সুড়ঙ্গ খোঁড়ার কাজ শুরু হবে।

মাঝেরহাট বিতর্ক এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে এখন শিয়ালদহ উড়ালপুলের নীচে মেট্রোর কাজ নিয়ে কোনও মন্তব্য করতেই রাজি হচ্ছেন না ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা ইঞ্জিনিয়াররা। কেএমআরসিএল-এর এমডি এ কে নন্দী শুধু বলেন, ‘‘বিষয়টি নিয়ে এখনই বলার সময় আসেনি। আমাদের উপরমহলের কর্তারা নিশ্চয়ই আলোচনা করে দেখবেন।’’

মাঝেরহাটের জন্য মেট্রোর কাজকে দায়ী করতে এখনই রাজি নন বিশেষজ্ঞরা। দীপঙ্করবাবুর যেমন দাবি, মাঝেরহাটে সেতুতে যেভাবে উপরের একটি স্ল্যাব ভেঙে পড়েছে, তাতে বাহ্যিক প্রভাবে বিপর্যয়ের সম্ভাবনা কম। বরং ভার নিতে নিতে সেতুর ওই অংশ চূড়ান্ত বহন-ক্ষমতার সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল বলেই তাঁর মত। 

বিশেষজ্ঞদের আরও মত, রাজ্যের পূর্ত দফতরের ইঞ্জিনিয়ারদের তুলনায় সেতুর রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে রেলের ইঞ্জিনিয়ারদের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা অনেক বেশি। ফলে সেতু রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রাক্তন রেল ইঞ্জিনিয়ারদের পরামর্শও রাজ্য সরকারদের নেওয়ার উপদেশ দিচ্ছেন কেউ কেউ। 

তাঁদের মতে, অযথা মেট্রো কাজ নিয়ে আতঙ্ক তৈরি করলে শহর-শহরতলির মেট্রো প্রকল্পগুলির কাজ নিয়েই অযথা জটিলতা তৈরি হতে পারে।