পছন্দের খবর করতে হবে। না হলেই সাংবাদিককে হজম করতে হবে মার। হাতের সামনে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিককে না পেলে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছিঁড়ে খাওয়া হবে তাঁকে। এই যেন সংস্কৃতি হয়ে গিয়েছে কলকাতা ময়দানের। 

ইদানীংকালে মানুষের সহিষ্ণুতা কমে গিয়েছে। ময়দানও এর ব্যতিক্রম নয়। সব সময়ে পছন্দের খবর দেখতে চান সদস্য, সমর্থকরা। প্রিয় দল হারলে সেই হারকেও গৌরবান্বিত করতে হবে। প্রতিপক্ষের ছেলেমানুষি ভুলে যদি তথাকথিত বড় দল ম্যাচ জেতে, সত্যিটা তুলে ধরা যাবে না। কালোকে কালো বলা যাবে না। বললেই তাঁদের নখ-দাঁত বেরিয়ে পড়ে। রক্তাক্ত হতে হয় সংশ্লিষ্ট সাংবাদিককে। নিরীহ সাংবাদিকের উপরে যাবতীয় রাগ এসে পড়ে। কখনও ক্লাব নিষিদ্ধ করে সেই সংবাদমাধ্যমকে। কখনও আবার সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক ‘টার্গেট’ হয়ে যান।

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

অতীতেও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্ট পছন্দ না হওয়ায় ক্লাবকর্তাদের গোঁসা হয়েছে। রাগারাগি, মন কষাকষি হয়েছে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকের সঙ্গে। সমর্থকরা ক্ষুব্ধ হয়েছেন রিপোর্টিং মনপসন্দ না হওয়ায়। একবার ডার্বিতে মোহনবাগানের জয়ের পরে ‘জিতল মোহনবাগান খেলল ইস্টবেঙ্গল’ হেডিং করায় সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকের বাড়িতে ঢিল পড়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও জল ছিল বিপদসীমার নীচেই। উভয়পক্ষ বাঁধা ছিল সৌজন্যের সরু সুতোয়। এখন বোধ হয় ছিঁড়ে গিয়েছে সেই সুতো।

এটা সোশ্যাল মিডিয়ার যুগ। ভার্চুয়াল দুনিয়ায় অপরিচিতও আজকাল খুব সহজেই পরিচিত হয়ে যান। অতীতে বিস্তৃত সমর্থক কুলের পক্ষে কলমচিকে চেনা সহজ ছিল না। ইদানীং সাংবাদিককে সোশ্যাল সাইটে খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়। পছন্দের খবর না হলেই সাংবাদিককে খুব সহজেই সোশ্যাল মিডিয়ায় খুঁজে বের করে অশ্রাব্য গালিগালাজ করা হয়। মূল্যবোধ আজ হারিয়ে গিয়েছে অনেকটাই। ব্যক্তিগত মেসেজ করা হয় সাংবাদিককে। সাংবাদিকের উত্তরের স্ক্রিনশট নিয়ে তা আবার বিভিন্ন গ্রুপে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।   

বুধবার ইস্টবেঙ্গল মাঠে ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটল বুধবার। ইস্টবেঙ্গল-জর্জ টেলিগ্রাফ ম্যাচ কভার করতে গিয়ে এবেলা.ইন-এর সাংবাদিককে প্রবল মার হজম করতে হল। মারের চোটে সাংবাদিকের পরনের টি-শার্ট ছিঁড়ে যায়। কপালের বাঁ পাশ ফুলে যায়। রক্ত ঝরে নাক দিয়ে। বারংবার আইএফএ-র অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড দেখিয়েও উন্মত্ত ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের বোঝানো যায়নি তিনি সাংবাদিক। ম্যাচ কভার করতে এসেছেন ইস্টবেঙ্গল মাঠে। 

ঘটনার সূত্রপাত ম্যাচের শেষের দিকে। পিছিয়ে থেকে ইস্টবেঙ্গল তখন সমতা ফিরিয়ে এনেছে। হাতের মোবাইল নিয়ে গোটা স্টেডিয়ামের ছবি ক্যামেরাবন্দি করার সময়ে লেন্সে ধরা পড়ে যান বেশ কয়েক জন উগ্র সমর্থক। ফেন্সিংয়ের উপরে দাঁড়িয়ে তাঁরা ম্যাচ কমিশনার ভোলানাথ দত্তকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করছিলেন। গোটা স্টেডিয়ামের দৃশ্য ভিডিও করার সময়েই কয়েক জনের নজরে পড়ে যান সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক। 

ম্যাচ শেষে কোচের সাংবাদিক সম্মেলন কভার করতে যাওয়ার সময়েই উগ্র সমর্থকদের রোষের মুখে পড়তে হয় তাঁকে। ‘কেন ভিডিও তুলেছিস’, ‘এখুনি ভিডিও ডিলিট কর’, ‘কোন দলের সমর্থক তুই’, ‘ফোন দে’, ‘মার মার’ চিৎকার শুরু হয়ে যায়। সঙ্গে অশ্রাব্য গালিগালাজ তো ছিলই। ভিড় ক্রমশ বাড়তে থাকে। ভিড়ের মধ্যে থেকে উড়ে আসা কিল, চড়, ঘুসি, লাথির আঘাতে রক্তাক্ত হতে হয় সাংবাদিককে। নিজেকে বাঁচাতে পিছনের জার্সি রুম কোনও রকমে খুলে সেখানে আশ্রয়ের জন্য গিয়েও নিস্তার হয়নি। 

পিছু ধাওয়া করে দু’এক জনও ঢুকে পড়েন সেই রুমে। ফের চলে আরও এক প্রস্থ মার। কেড়ে নেওয়া হয় হাতের মোবাইল ফোন, আইএফএ-র অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড। ফোনে তুলে রাখা ভিডিও ডিলিট করে দেন তাঁরা। ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ পড়েন তাঁরা। ঘটনার তাৎক্ষণিকতায় তাঁরা হয়তো ভুলে গিয়েছিলেন সৌজন্যবোধও। সাংবাদিককে হেনস্থা করে ব্যক্তিগত মেসেজ, চ্যাট,  কললিস্ট, মোবাইলে সেভ করে রাখা ফটো বলপূর্বক দেখে তাঁরা কি কলঙ্কের নতুন এক ইতিহাস তৈরি করলেন না?

ক্লাবের এক শীর্ষকর্তা চিনতে পারায় নিরস্ত হন সমর্থকরা। পুলিশ এসে উদ্ধার করেন সাংবাদিককে। পরে ময়দান থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ইস্টবেঙ্গল সদস্য-সমর্থকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়। পুলিশ এই ঘটনার তদন্ত করবে বলে জানিয়েছে। 

ইস্টবেঙ্গল মাঠে ছিনিয়ে নেওয়া আইএফএ-র অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড এখনও সাংবাদিকের কাছছাড়া। হদিশ নেই গুরুত্বপূর্ণ নথির। মোবাইল পরে ফেরত দেওয়া হলেও তা চূর্ণ-বিচূর্ণ, ব্যবহারের অযোগ্য। মুছে ফেলা হয়েছে এসডি কার্ডের সমস্ত তথ্য। দীর্ঘদিন ধরে তিলতিল করে সংগ্রহ করা ব্যক্তিত্বের কন্ট্যাক্ট হারিয়ে গিয়েছে। বুধবারের হামলাকারীরা কি সাংবাদিককে সেই কন্ট্যাক্ট ফিরিয়ে দিতে পারবেন? কপালের উপরে তাঁদের হামলা ছাপ ফেলে রেখেছে। কালসিটে পড়ে গিয়েছে। শরীরের ক্ষত একদিন শুকিয়ে যাবে। হৃদয়ে যে গভীর ক্ষত তৈরি করে দিল এই ঘটনা, তা কি করে মুছবে?  

দিনকয়েক আগে মোহনবাগান মাঠে রেনবো কোচের মেয়ের বন্ধুকে প্রবল মার হজম করতে হয়। সেই খবর এবেলা.ইন-এ প্রকাশিত হওয়ার পরে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিককে প্রবল ব্যারাকিংয়ের মুখে পড়তে হয়েছিল। সবুজ-মেরুন সমর্থকরা ব্যক্তিগত ভাবে মেসেজ করেছিলেন সংশ্লিষ্ট সাংবাদিককে। আমাদের খবরের প্রেক্ষিতে সমর্থকরা দাবি করেছিলেন নিগৃহীত যুবকের ছবি প্রকাশ করা হোক। রেনবো কোচের কন্যাকে দিনের পর দিন ট্রোল করা হয়েছে। ছাড়া হয়নি এবেলা.ইন-এর সাংবাদিককেও। প্রিয় ক্লাবের প্রতি সমর্থকদের আবেগকে আমরা শ্রদ্ধা করি। কিন্তু প্রিয় ক্লাবের খেলা দেখতে এসে প্রতিপক্ষ কোচের মেয়ে ও তাঁর বন্ধুরা বিপন্ন— এই দৃশ্য দেখেও চুপ করে থাকতে হবে, খবর লেখা যাবে না, এ কোন ধরনের আবদার! 

তবে কি এখনকার সমর্থকরা হারিয়ে ফেলেছেন মূল্যবোধ? পছন্দ না হলেই আক্রমণ করা হবে নিরীহ সাংবাদিককে? এ কোন ধরনের সংস্কৃতি চালু হল ময়দানে। বুধবার ইস্টবেঙ্গল মাঠে যে সদস্য-সমর্থকরা এবেলা.ইন-এর সাংবাদিককে বেদম মার মেরেছেন, তাঁরা অজ্ঞাতই থেকে যাবেন। ইতিহাসের পাতায় কিন্তু লেখা হয়ে গিয়েছে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের সমর্থক-সদস্যদের হাতে নিগৃহীত সাংবাদিক। উগ্র ক্লাব-প্রীতি দেখাতে গিয়ে সমর্থকরা কি নিজেদের প্রিয় ক্লাবকেই কালিমালিপ্ত করলেন না?