কলকাতা থেকে মুম্বই কোনও জিনিস ক্যুরিয়ার করতে গেলে যেভাবে প্যাক করা হয়, অনেকটা সেভাবেই সাদা চাদরে মোড়া রাজকোটের পিচ। কখন? না, টেস্ট শুরুর একদিন আগে দুপুরবেলায়। 
উপমহাদেশে কখনও যে দৃশ্য দেখা যায়নি। দেখা দূরে থাক, কখনও শোনাও যায়নি। এখানে ইংল্যান্ড বা অস্ট্রেলিয়া এসে উল্টোটাই দেখেছে এতকাল। সামান্য রোদ উঠেছে মানেই পিচ খুলে রাখা হবে। যত পারো রোদ খাওয়াও যাতে দ্রুতই পিচে ফাটল ধরতে শুরু করে আর আমাদের স্পিনারদের ভেল্কি শুরু হয়ে যায়।
প্রশ্ন উঠছে, রাজকোটে তাহলে পিচ হঠাৎ ঢাকা কেন? দিনদুপুরে কড়া রোদে ভারতের কোনও কেন্দ্রে পিচে আবরণ, সত্যিই অবিশ্বাস্য! বোর্ডের পিচ কমিটির অন্যতম সদস্য এবং প্রাক্তন ক্রিকেটার ধীরাজ পারসানা বুধবার সেলিম দুরানি, দিলীপ দোশীদের সঙ্গে সৌরাষ্ট্র ক্রিকেট সংস্থার সংবর্ধনা নেবেন। তিনি এখানেই আছেন পিচের তদারকি করার জন্য। পারসানা বললেন, ‘‘আমরা চাইছি টেস্ট ম্যাচটা পাঁচদিনের হোক। সেই কারণে ঢেকে রেখেছি।’’ তিনি এরপর ব্যাখ্যা দিলেন, ‘‘আজ তাপমাত্রা প্রায় পঁয়ত্রিশ ডিগ্রি মতো ছিল। সেটা দেখার পরেই পিচ ঢেকে রাখার সিদ্ধান্ত নিই। এত গরমে পিচ খোলা রাখলে ফেটে যেতে পারে।’’ আরও অবাক করে দিয়ে এরপর তাঁর সংযোজন, ‘‘পিচে সকলের জন্যই সমান সাহায্য থাকবে। ব্যাটসম্যান, স্পিনার, পেসার।’’ 
পারসানার কথা শুনে গুলিয়ে যেতে পারে, বুধবার ভারত-ইংল্যান্ড টেস্ট সিরিজ শুরু হচ্ছে কোথায়? লর্ডস না রাজকোটে? এখানকার নতুন স্টেডিয়ামে প্রেস বক্সটাও একদম লর্ডসের আদলে তৈরি। সেদিকে চোখ গেলে হয়তো আরওই তালগোল পাকিয়ে যাবে।    
যদিও বিরাট কোহলিকে দেখে পিচ নিয়ে নাটক বোঝার উপায় নেই। কখনওই পিচ নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামান না তিনি। রাজকোটেও খুব প্রভাবিত দেখাল না। এই ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধেই ব্যর্থ হয়ে তিনি সমালোচিত হয়েছিলেন। সেটা মনে করানোয় সাংবাদিক সম্মেলনে বলে গেলেন, ‘‘ওটা একটা খারাপ অধ্যায় ছিল শুধু। ইংল্যান্ড বলে নয়, যে কারও বিরুদ্ধেই আসতে পারত। সেটা থেকে আমি শিক্ষা নিয়েছি। তবে এমন কোনও ব্যাপার নেই যে, ইংল্যান্ডে গিয়ে ওদের বিরুদ্ধে ব্যর্থ হয়েছিলাম বলে এখানে দারুণ করে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে।’’  
সবচেয়ে নাটকীয় হচ্ছে, সাদা কভারে পিচ ঢেকে দেওয়া হল দুপুর একটা নাগাদ ইংল্যান্ড টিম প্র্যাক্টিসে আসার কিছুক্ষণ আগেই। তার আগে ভারতীয় দল প্র্যাক্টিস করে চলে গিয়েছে এবং সেই সময়েই পিচ প্রস্তুতকারক এবং মাঠের কর্মীদের ব্যস্ত দেখিয়েছে। 
কুক তাঁর দলবল নিয়ে যখন এলেন, কিউরেটর নেই। তিনি নিজেই ঢাকনা সরিয়ে টিপে টিপে দেখলেন। টিপে টিপে দেখার অর্থ, পিচে ভিজে ভাব আছে কি না দেখে নেওয়া। ঢেকে রাখা পিচে কি আর ‘ময়শ্চার’ থাকবে? 
তবে পিচে সবুজের আভা দেখা গিয়েছে মঙ্গলবারেও। ভারতীয়রা তখন প্র্যাক্টিস করছিলেন আর বাইশ গজও খোলা ছিল। এখানে পৌঁছে বুলেটিন পাওয়া গেল যে, গতকাল, অর্থাৎ সোমবার বিকেলবেলায় চুপিচুপি অনেকটাই ঘাস কেটে ফেলা হয়েছে। তারপরেও কিন্তু সবুজের আভা পুরোপুরি ওড়েনি। অশ্বিনের দেশ ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে পিচে ঘাস কেন রাখবে, সেই ধোঁয়াশায় ভালমতোই বিদ্ধ দেখাল ইংল্যান্ডকে। কুক যেভাবে পিচের ওপর বসে নাড়ি টিপতে থাকলেন ডাক্তারের মতো, তাতে তিনি খুব স্বস্তিতে আছেন বলে মনে হল না। 
এমনিতেও নিজের দেশে শোরগোল ফেলে দিয়েছেন কুক। একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, কতদিন আর অধিনায়ক থাকবে তিনি নিজেও জানেন না। তিনি সাংবাদিক সম্মেলনে একঘণ্টার ওপর দেরিতে আসছেন দেখে জল্পনা শুরু হয়ে গিয়েছিল, নতুন বিতর্কে কি সিরিজ শুরুর আগেই আরও চাপে পড়ে গেলেন কুক? সাংবাদিক সম্মেলনে আসার পর প্রথম চার-পাঁচটা প্রশ্নই হল এই সাক্ষাৎকার নিয়ে। কুক জল্পনা কমানোর বদলে আরও বাড়িয়ে দিয়ে গেলেন। এখানে আরও একধাপ এগিয়ে তিনি বলে দিয়ে গেলেন, ভারতের সঙ্গে এই সিরিজের পরেও তিনি অধিনায়কত্ব ছেড়ে দিতে পারেন। হতেই পারে। 
দেখা গেল উপস্থিত ইংল্যান্ডের সংবাদমাধ্যমও বেশ থতমত খেয়ে গিয়েছে। তাঁদের কাছেও বেশ বিস্ময়কর দেখাচ্ছে যে, এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ সিরিজ শুরুর চব্বিশ ঘণ্টা আগেই কেন কুক নেতৃত্ব ছেড়ে দেওয়ার ধুয়ো তুললেন? এতে তো ভুল বার্তাই গেল যে, অধিনায়ক নিজেই ভিতরে-ভিতরে ধন্দে ভুগছেন। টেস্টের প্রথম বল শুরুর আগেই তো ভুল টাইমিংয়ে তিনি ‘উইকেট’ দিয়ে চলে গেলেন! 
পিচ নিয়ে নাটক আর ধোঁয়াশায় দু’টো দলের প্রথম একাদশ বাছাও চূড়ান্ত করা যায়নি। যদি তিন স্পিনারে খেলার সিদ্ধান্ত হয়, হার্দিক পাণ্ড্যর টেস্ট অভিষেক ঘটতে পারে। সেক্ষেত্রে তিনি এবং মহম্মদ শামি নতুন বল বোলার। 
আবার রাতের দিকেও পারসানাকে বেশ অনড় শোনাল যে, ‘‘ওইটুকু ঘাস তো রাখতেই হবে বাবা। না হলে পিচটার বারোটা বেজে যাবে।’’ তা যদি হয়, তাহলে ছয় ব্যাটসম্যান নিয়ে খেলতে পারে ভারত। তখন করুণ নায়ারের অভিষেক ঘটতে পারে। 
আর ধীরাজ পারসানার অতীত রেকর্ডে কিন্তু ঘাস রাখা, বাড়তি বাউন্সি, ফাস্ট উইকেট বানানোর ঘটনা আছে। আমদাবাদে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে বানিয়েছিলেন একবার। তিনদিনে খেলা শেষ করে দেন ডেল স্টেইন। ইনিংসে হেরেছিল ভারত। সেই ভারতীয় দলের অধিনায়ক কে ছিলেন? 
না, এখন যিনি ভারতীয় দলের কোচ। অনিল কুম্বলে!