‘মানবজাতি তার নিজের কাছেই ক্যানসারের মতো’। গোটা ছবিটা এই কথার উপর দাঁড়িয়ে। গ্রেট বেরিয়ার রিফ ধ্বংস হয়ে গিয়েছে, এই খবরের পর পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি-করে-ফেলেছি ভেবে পাবলিক যখন লোকদেখানো অস্বস্তিতে ভুগছে, তখন এ রকম একটা প্রেক্ষাপটের ছবি তাৎক্ষণিক কানেক্ট তৈরি করে তো বটেই।
কিন্তু তার সঙ্গে দান্তে, ইতালি, ইস্তানবুল যোগ হলে সিনেমার প্লটে একটা ভজঘট ব্যাপার হয়ে যায়! ‘ইনফার্নো’ ছবিটার শুরুতে সম্ভাবনা প্রচুর থাকলেও পরিচালক রন হাওয়ার্ড তেমন কিছু করতে পারলেন কই, যা দেখে উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হয়! 

ড্যান ব্রাউনের বই অবলম্বনে ছবি। কিন্তু মুশকিলটা হল, বই অবলম্বনে ছবি হলে গোদা গল্পটাকে অনেকাংশে স্ক্রিনপ্লে’র পরিসরে ছাঁটতে হয়। ফলে বাদ পড়ে যায় বহু ট্রিটমেন্টের সম্ভাবনা। এ ছবির গল্প শুরু হয় ইতালিতে। রবার্ট ল্যাংডন (টম হ্যাঙ্কস) আহত অবস্থায় ফ্লোরেন্সের একটি হাসপাতালে ভর্তি। মাথায় চোট। সেমি-সিলেক্টিভ অ্যামনেশিয়ায় ভুগছে সে। রহস্যজনকভাবে তার কাছে একটি ফ্যারাডে সিলিন্ডার রয়েছে। কিন্তু সেটা কীভাবে তার কাছে এল এবং তা দিয়ে হবেই বা কী— বুঝে ওঠার আগেই কারা যেন ল্যাংডনকে মেরে ফেলতে আদাজল খেয়ে লেগে পড়ে! 

অসুস্থ ল্যাংডনকে সাহায্য করে ডক্টর ব্রুকস (ফেলিসিটি জোন্‌স)। দু’জনে মিলে বার করে ফেলে ফ্যারাডে সিলিন্ডারে আসলে কী আছে। আছে বতিচ্চেলি’র আঁকা ‘ম্যাপ অফ হেল’। ঠিক যেভাবে দান্তে তাঁর ‘ইনফার্নো’তে নরকের ন’খানা ভাগ করেছিলেন, তার সঙ্গে মিলিয়েই প্রাক-রেনেসাঁ যুগের ওই ছবি। তারই একটা ‘ইমপোজিশন’ রয়েছে সেই সিলিন্ডারে। যেটা বানিয়েছে ছবির অ্যান্টাগনিস্ট বার্ট্রান্ড জোব্রিস্ট। যার বক্তব্য একটাই— ‘মানবজাতি তার নিজের কাছেই ক্যানসারের মতো’। ফলে মানবজাতির নিশ্চিহ্ন হওয়া প্রয়োজন। তাই দান্তের ‘ইনফার্নো’কে মাথায় রেখে জোব্রিস্ট বানায় ইনফার্নো-ভাইরাস।

বতিচ্চেলির ‘ম্যাপ অফ হেলে’র সঙ্গে যাঁরা পরিচিত, তাঁরা জানবেন নরকের প্রতিটা আলাদা স্তরে বাইবেলীয় পাপীদের কেমন ধরনের ‘শাস্তি’র বর্ণনা করা আছে সেখানে। সেখানে বীভৎসতা, নৃশসংতা, রক্ত, দুরাচার— রয়েছে সবেরই গ্রাফিক বিবরণ। পরিচালক ল্যাংডনের অ্যামনেশিয়ার পর্বে সেই বিবরণের সিনে-ভিস্যুয়াল তৈরি করেছেন। সেগুলো চোখ টেনে রাখবে! ভিএফএক্সের কেরামতিও দারুণ। প্রতি পর্বেরই ব্যাকগ্রাউন্ডে কেউ না কেউ ল্যাংডনকে হয় আটকে ফেলার চেষ্টা করছে, না হয় মেরে ফেলার! কীভাবে বাঁচবে ল্যাংডন? রহস্যটাকে জমিয়ে দিতে বেশ টানটান ছন্দ রেখেছেন পরিচালক। যতক্ষণ না সেটা ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছয়।
ক্লাইম্যাক্স থেকে ঘটনাগুলো অযৌক্তিকতার পাঁচিল টপকাতে না পেরে ছিটকে ছড়িয়ে যায়! জোব্রিস্টের ‘মহতী’ প্ল্যান সার্থক করতে মাঠে নেমেছিল একটি গুপ্ত সংস্থা। যার মাথা ইরফান খানের চরিত্রটি। সেই সংস্থা আবার ভয়ঙ্কর শক্তিশালী। জোব্রিস্টের ফান্ডিং সামলায়। যে কোনও সরকারকে তুলতে পারে, নামাতে পারে— এমনই তার মহিমা! কিন্তু চোখের পলকে কেন কে জানে, সেই সংস্থার মাথা মত পাল্টে ল্যাংডনদের দলে ভিড়ে যায়, জোব্রিস্টের প্ল্যান ভেস্তে দিতে। অমন ‘সাবভার্সিভ’ সংস্থা হাত মিলিয়ে নেয় ওয়ার্ল্ড হেল্থ অর্গানাইজেশনের মতো সিরিয়াস একটা সংস্থার সঙ্গে। এবং ওয়ার্ল্ড হেল্‌থ অর্গানাইজেশনের ভূমিকা দেখলে তাজ্জব হতে হয়! তারা একদিকে মানবসমাজের স্বাস্থ্য বাঁচাতে ভাইরাস নাশ করতে চায়, আরেকদিকে তারাই এফবিআই! এজেন্টও আছে নাকি তাদের!

গল্পে হাজিয়া সোফিয়া জায়গাটার একটা ভূমিকা ছিল। ইসলাম এবং খ্রিস্টান ধর্মের সহাবস্থান সেই জায়গার প্রবাদে, ইতিহাসে। ড্যান ব্রাউন তার ভাল একটা ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। কীভাবে অতীত ও বর্তমান ঘটনাক্রমের ‘সিম্বোলজি’ মিলেমিশে যায়, সেটাও ছিল গল্পে। রন হাওয়ার্ড সেটা পুরো বাদ দিয়েছেন। ল্যাংডনের আলগা সংলাপে হাজিয়া সোফিয়া খালি পূর্ব এবং পশ্চিমের মাঝে একটা গেটওয়ে হয়ে রয়ে গেল! 

ভাল অভিনয় টম হ্যাঙ্কস তো করবেনই, করেওছেন। ইরফান হলিউডে পরিচিত নাম, তিনি নিজেও পরিচিত হলিউডি কাজের ধরনের সঙ্গে। ভালই তাল মিলিয়েছেন। শুধু গল্পটাকে নেহাত জোলো থ্রিলার হিসেবে ট্রিট না করলে রন হাওয়ার্ডকেও নম্বর দেওয়া যেত, এই আর কী!