বিদেশি ক্রিকেটারদের কাছে কলকাতা বড় প্রিয় ভেন্যু। তাবড় তাবড় ক্রিকেটারদের বক্তব্য, এখানকার দর্শকরা খেলার বড় সমঝদার। নিজের দলকে যেমন এখানকার দর্শকরা সাপোর্ট করেন, তেমনই প্রতিপক্ষ দলকেও উৎসাহ জুগিয়ে যান। এই কারণেই কলকাতায় খেলতে বেশ লাগে বিদেশি ক্রিকেটারদের। 

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

কলকাতার ক্রিকেট আর ফুটবল মাঠ উলটো মেরুতে। দুই মাঠের সংস্কৃতিও এক নয়। কলকাতার ক্রিকেট মাঠেও যে আগুন জ্বলেনি তা নয়। কিন্তু সেগুলো তো ব্যতিক্রম। তার জন্য কম সমালোচনা হয়নি। ফুটবল মাঠে সমালোচনা করেও লাভ হয়নি। দিনকে দিন বেড়েই চলেছে দুই প্রধানের সমর্থকদের কদর্য রূপ। তাঁদের নখ-দাঁতে ক্ষতবিক্ষত বিপক্ষের ফুটবলাররা। স্থানীয় ফুটবলাররা ইস্ট-মোহন-এর ঘরের মাঠে নামতেই ভয় পান। 
 
তাঁদের উদ্দেশে গ্যালারি থেকে উড়ে আসে বাছাই করা সব বিশেষণ। প্রিয় দলের ফুটবলাররা খারাপ খেললেও রাগ এসে পড়ে বিপক্ষ দলের ফুটবলারের উপরে। অশ্রাব্য সব গালিগালাজ উড়ে আসে। মুহূর্তের জন্য সহবত শিক্ষা ভুলে যান দর্শকরা। 
গতবারের কলকাতা লিগ শুরু হওয়ার ঠিক আগে লাল-হলুদের প্রাক্তন ফুটবলার গুরবিন্দর সিংহ ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের কাছে অনুরোধ করেছিলেন, ‘‘ক্লাবের পাশে থাকুন। ফুটবলারদের সাপোর্ট করুন। গালাগালি করবেন না।’’ গুরবিন্দরের কথা কেউ শোনেননি। খেলা শুরু হতেই ইস্টবেঙ্গল ফুটবলারদের হজম করতে হয়েছে বিশ্রী সব গালাগালি। অভিমানী গুরবিন্দর একসময়ে বলেছিলেন, ‘‘কাদের জন্য খেলছি!’’  

নবি। 

এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। এবারের কলকাতা লিগে ইস্টবেঙ্গল একটা ম্যাচ ড্র করতেই সমর্থকদের উগ্রতা দেখা গিয়েছে। টিডি সুভাষ ভৌমিককে আক্রমণ করা হয়েছে। ইস্টবেঙ্গল-জর্জ টেলিগ্রাফ ম্যাচ কভার করতে গিয়ে এবেলা.ইন-এর প্রতিনিধি বন্য লাল-হলুদ সমর্থকদের হাতে নিগৃহীত হয়েছেন। বেদম মার সহ্য করতে হয়েছে আমাদের সাংবাদিককে। 
এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন সৈয়দ রহিম নবি। সমর্থকরা যে ক্রমশ অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছেন, তা দেশের ইউটিলিটি ফুটবলারের চোখ এড়ায়নি। এবেলা.ইন-কে নবি বলেন, ‘‘ইদানীং দেখতে পাচ্ছি খেলার মাঠে সমর্থকরা প্রবল গালিগালাজ করছে। এতে তো ক্লাবেরই বদনাম হচ্ছে। এটা কি ওরা বুঝতে পারছে না?’’ 

এগিয়ে আসছে বাঙালির চিরআবেগের ডার্বি। এরকমই এক ডার্বিতে প্রাণসংশয় হয়েছিল নবির। গ্যালারি থেকে উড়ে আসা পাথরের আঘাতে জীবন প্রায় যেতে বসেছিল তাঁর। তখন নবি মোহনবাগানের ফুটবলার। এখন তিনি পিয়ারলেস-এর। দিনকয়েক আগে ইস্টবেঙ্গল-টালিগঞ্জ অগ্রগামী ম্যাচ দেখতে গিয়ে এক সমর্থকের মুখের ভাষা শুনে তাজ্জব বনে গিয়েছিলেন দেশের অন্যতম তারকা ফুটবলার। সেই অভিজ্ঞতা এবেলা.ইন-এর কাছে শেযার করেন নবি, ‘‘সেদিন ইস্টবেঙ্গল-টালিগঞ্জ অগ্রগামী ম্যাচে আমার পাশে বেশ ভাল জামাকাপড় পরা একটি ছেলে বসে খেলা দেখছিল। সে লাল-হলুদ সমর্থক। আমার সঙ্গে সামান্য বাক্যালাপও হয়েছিল। কিন্তু মোহনবাগান প্রসঙ্গ উঠতেই অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতে শুরু করে দিল সেই ছেলেটা। কিছু দূরে বসেছিলেন বেশ কয়েকজন মহিলা। ছেলেটার গালিগালাজ শুনে আমি আর স্থির থাকতে পারিনি। বলেই ফেলেছিলাম, ভাই, তোমার জামাকাপড় দেখে তো মনে হচ্ছে তুমি বেশ ভাল ঘরের। তুমি এভাবে গালাগালি করছ? মোহনবাগান ক্লাবকে গালিগালাজ করতে গিয়ে তো তুমি ইস্টবেঙ্গল ক্লাবকেই লজ্জায় ফেলে দিচ্ছ।’’
 
পাশে বসে থাকা অন্য সমর্থকদের উদ্দেশে নবি বলেন, ‘‘এরকম সমর্থককে ক্লাবে একেবারেই ঢুকতে দেবেন না। এরা ক্লাবেরই বদনাম করছে।’’ কে শোনে কার কথা! সমর্থকদের মুখ নিঃসৃত বাণী ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। কাউকে রেয়াত করেন না তাঁরা। ঘরের মাঠে প্রতিপক্ষ দল খেলতে এলে তো কথাই নেই। বীভৎস সব গালাগালি উড়ে আসে বিপক্ষ কোচ ও ফুটবলারের উদ্দেশে। 

সেদিন ইস্টবেঙ্গল-জর্জ ম্যাচ চলাকালীন লাল-হলুদ সমর্থকদের তীব্র আক্রমণের মুখে পড়তে হয় জর্জ টেলিগ্রাফ কোচ রঞ্জন ভট্টাচার্যকে। এবেলা.ইন-কে তিনি বলেন, ‘‘আমার কিছু ছাত্র সেদিন খেলা দেখতে এসেছিল। ওরা আমাকে বলে, স্যার আপনাকে তো বটেই, আপনার পরিবারের সদস্যদেরও বিশ্রী ভাষায় গালিগালাজ করা হয়েছে।’’ সেদিন মরগ্যানের দুর্দান্ত গোলে প্রথমে এগিয়ে গিয়েছিল জর্জ টেলিগ্রাফ। পরে ইস্টবেঙ্গল ২-১ ম্যাচটি জিতে নেয়। ম্যাচ প্রসঙ্গে রঞ্জনের বক্তব্য, ‘‘সেদিন দুর্দান্ত গোল করল মরগ্যান। ওরকম গোল ভারতীয় ফুটবলে কি খুব একটা দেখা যায়? আমরা ইস্টবেঙ্গল মাঠে খেলতে গিয়েছি। ওরা যদি ভাল না খেলে, তার জন্য আমাদের গালমন্দ করা হবে কেন?’’ 

ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের বহিরঙ্গ এখন বদলে গিয়েছে। কিন্তু রঞ্জনের মতে, ক্লাবের মুখসজ্জা বদলালেও অন্যান্য দিক একদমই বদলায়নি। রঞ্জন বলছেন, ‘‘ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে ঢুকলে মনে হয় অন্য কোনও এক পৃথিবীতে চলে এসেছি। কর্পোরেট ধাঁচে ক্লাবটাকে গড়ে তুলেছেন দেবব্রত সরকার। কিন্তু বাকিগুলো তো ক্লাবের অঙ্গসজ্জার সঙ্গে মেলে না। সমর্থকদের সহিষ্ণুতা বলে কিছুই নেই। সেদিন ম্যাচ জেতার পরে তো কোচ কলার তুলে চলে গেলেন। কিন্তু কর্তাদের বলা উচিত, এই জয়ে কোনও গরিমা নেই। সেদিন রেফারি উত্তম সরকার এবং ইস্টবেঙ্গল ফুটবলাররা মিলে আমাদের ফুটবল-সত্তাকে খুন করেছে। কীভাবে ইস্টবেঙ্গল গোল করেছে সবাই দেখেছে।’’ 

সেদিনের ম্যাচ রেফারি উত্তম সরকারের তীব্র সমালোচনা করে রঞ্জন বলছেন, ‘‘উত্তম সরকারের মতো রেফারিদের সাহায্যে এবারও হয়তো কলকাতা লিগ জিতে যাবে ইস্টবেঙ্গল। তাতে কী লাভ হবে? আইলিগে গিয়ে তো সেই চার বা পাঁচ নম্বরে থাকতে হবে। আইলিগে তো আর উত্তম সরকারের মতো রেফারি থাকবেন না!’’ 
খেলা চলাকালীন প্রতিপক্ষ ফুটবলারদের গালাগালি দিয়ে ‘মুখের সুখ’ করে নেন সমর্থকরা। দল ব্যর্থ হলে নখ-দাঁত বের করেন কর্তাদের বিরুদ্ধে। 
খেলার দিন যাঁরা ইস্ট-মোহন গ্যালারি কানায় কানায় ভরিয়ে তুলছেন, তাঁদের বাদ দিয়েও বিশাল সংখ্যক সমর্থক ছড়িয়ে রয়েছেন। দু-চারজনের জন্য কলঙ্কের কালি লেগে যাচ্ছে সবার শরীরে। ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে প্রিয় ক্লাবের। যাতে আখেরে ক্ষতি শতাব্দী ছুঁতে চলা ক্লাবেরই। এই বদনামের কলঙ্ক কি এতদিনের গৌরবময় ইতিহাসের সঙ্গে মানায়? ক্লাব কর্তারা যদি একটু ভেবে দেখতেন। এর দায় কি এড়াতে পারেন তাঁরা?