লিওনেল মেসি এবং তিনি একই শহরের মানুষ। দু’ জনেরই উত্থান রোজারিও থেকে। মেসি মাঠে ফুল ফোটাচ্ছেন। আর তিনি, জেরার্দো ‘টাটা’ মার্টিনো মেজর লিগ সকারের ক্লাব আটলান্টা ইউনাইটেডের ‘চাণক্য’। 

এক গভীর দুঃসময়ে বার্সার রিমোট কন্ট্রোল হাতে তুলে নিয়েছিলেন মার্টিনো। ক্যানসারে আক্রান্ত বার্সেলোনা কোচ টিটো ভিলানোভা চিকিৎসার জন্য দায়িত্ব ছাড়েন মেসিদের। ভিলানোভার ছেড়ে যাওয়া ‘শিরস্ত্রাণ’ মাথায় তুলে নেন মার্টিনো। কোপা দেল রে এবং লা লিগায় রানার্স করার পরে বার্সেলোনার দায়িত্ব ছাড়েন তিনি। 

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

২০১৫ সালে আর্জেন্টিনাকে কোপা আমেরিকার ফাইনালে পৌঁছে দিয়েও চিলির কাছে হার মানতে হয় মার্টিনোর আর্জেন্টিনাকে। সেই হারের প্রায়শ্চিত্ত নেওয়ার সুযোগও এসে গিয়েছিল আর্জেন্টিনার সামনে। কোপা আমেরিকার শতবর্ষপূর্তিতে মার্টিনোকে ফের হার মানতে হয় চিলির কাছে। তার পরেই নাটকীয় ভাবে অবসর নেন মেসি। ‘এলএম ১০’ এবং মার্টিনোর পথ আলাদা হয়ে যায়। অবসর থেকে ফেরেন মেসি। আর মার্টিনো পাড়ি জমান মার্কিন মুলুকে। 

রাশিয়ায় আর্জেন্টিনার ব্যর্থতার কারণ, মেজর লিগ সকার নিয়ে তাঁর ভাবনাচিন্তা এবং অতি অবশ্যই ‘সাত রাজার ধন, এক মাণিক’ মেসি সম্পর্কে এবেলা.ইন-কে খুল্লমখুল্লা সাক্ষাৎকার দিলেন মার্টিনো। 


 
প্রশ্ন— প্যারাগুয়ে জাতীয় দল, বার্সেলোনা, আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের পরে আপনি এখন মেজর লিগ সকারে। বাকিগুলোর থেকে এমএলএস সব অর্থেই ভিন্ন। বলতে পারি, অন্য এক গ্রহে আপনি। হঠাৎ মেজর লিগ সকারের দায়িত্ব নিলেন কেন? অন্যান্য দেশের লিগকে কি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারবে এমএলএস? 
   
মার্টিনো — মেজর লিগ সকার প্রজেক্টটা শোনার পরে আমি দারুণ উৎসাহ বোধ করেছিলাম। মালিকদের দৃষ্টিভঙ্গি, ক্লাবের প্রতি সমর্থকদের ভালবাসা, উৎসাহ দেখে আমি সত্যিই অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম। মেজর লিগ সকার বেছে নেওয়ার পিছনে এগুলোই অন্যতম কারণ। পেশার সুবাদে আমি এখন মার্কিন মুলুকে রয়েছি। আর এখানে থাকতে থাকতে দেশটাকে দারুণ ভালবেসে ফেলেছি। প্রতিটি মুহূর্ত আমি দারুণ উপভোগ করছি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমাকে সব অর্থেই মুগ্ধ করেছে। কত সুযোগ সুবিধা পাচ্ছি তার ইয়ত্তা নেই। এ তো গেল আমার ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা। আপনার প্রশ্ন প্রসঙ্গে বলি, বিশ্বের অন্যান্য লিগের সঙ্গে এখনই মেজর লিগ সকারের তুলনা টানা ঠিক নয়। শুধু তুলনার জন্য তুলনা করে কোনও লাভ নেই। এমএলএস এখনও নতুন। অন্যান্য দেশের লিগকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে হলে আরও অনেক পথ যেতে হবে। তবে খুব দ্রুত এই লিগ উন্নতি করছে। ছড়িয়ে পড়ছে। এগুলোই ইতিবাচক দিক। 

ম্যাসচেরানোর সঙ্গে মার্টিনো। ছবি— এএফপি

প্রশ্ন— বার্সেলোনার রিমোট কন্ট্রোল আপনার হাতে ছিল। বার্সায় ফেলে আসা দিনগুলোকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? 

মার্টিনো— বার্সেলোনার দায়িত্ব গ্রহণ করা আমার কেরিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ একটা অধ্যায় বলতে পারেন। পিছন ফিরে বার্সার দিনগুলো যখন দেখি, তখন মনে হয় আমার পারফরম্যান্স বেশ ভালই।  বিশ্বের অন্যতম বড় একটা ক্লাবের দায়িত্ব নেওয়া আমার কেরিয়ারের জন্য দারুণ একটা ব্যাপার। 

প্রশ্ন— রাশিয়া বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হতশ্রী পারফরম্যান্স দেখে আপনি নিশ্চয় ভারাক্রান্ত। বিশ্বকাপে তাল কাটল কোথায়?  

মার্টিনো— বিশ্বকাপে আমি তো আর্জেন্টিনাকে কোচিং করাইনি। তাই আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। একটা কথা অবশ্য বলতে পারি, রাশিয়া বিশ্বকাপে নামার আগে আর্জেন্টিনা মানসিক দিক থেকে ধাক্কা খেয়েছিল। টানা তিনটি বড় প্রতিযোগিতার ফাইনালে পৌঁছেও ট্রফি জিততে পারেনি আমার দেশ। ব্রাজিল বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হারতে হয়েছিল মেসিদের। দুটো কোপা আমেরিকা ফাইনালেও মুখ থুবড়ে পড়ে আর্জেন্টিনা। আর এর ফলে ফুটবলাররা প্রচণ্ড চাপে পড়ে গিয়েছিল। এই চাপ কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি ছেলেদের পক্ষে। বারবার ফাইনালে পৌঁছে মাথা হেঁট করে মাঠ ছাড়ার ফলে ফুটবলারদের আত্মবিশ্বাসটাই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। রাশিয়ায় আত্মবিশ্বাসের অভাবই দেখা গিয়েছে জাতীয় দলের খেলায়। 

মার্টিনোর মন্ত্র। 

প্রশ্ন— প্যারাগুয়ে জাতীয় দলের কোচ ছিলেন। বার্সার পরে আর্জেন্টিনাকে কোচিং করিয়েছেন। এমএলএস থেকে আর কী চান জেরার্দো মার্টিনো? 

মার্টিনো— ২০১৬ সালে মেজর লিগ সকারে সই করেছিলাম। তখন যে আশা নিয়ে এসেছিলাম, তা এখনও এতটুকুও বদলায়নি। নির্দিষ্ট একটা স্টাইলে দলকে খেলানো, জয়ের সংস্কৃতি তৈরি করা, মাঠের ভিতরে ও বাইরে একই মন্ত্রে দলকে দীক্ষিত করাই আমার উদ্দেশ্য। মাঠে আমি অবশ্যই রেজাল্ট চাই। তার থেকেও বড় কথা, একদম নতুন একটা দলের ভিত শক্ত ভাবে গড়ে তোলাই আমার লক্ষ্য। কারণ ভিত যদি দুর্বল হয়, তাহলে বেশি দূর অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয় কারোর পক্ষেই। একটা ক্লাব একটা শহরের প্রতিনিধি। এই একটা ক্লাবকে নিয়েই যেন স্বপ্ন দেখতে পারে একটা গোটা শহর। সমর্থকদের শ্বাসপ্রশ্বাসে যেন ঘোরাফেরা করে ক্লাবের নাম। 

প্রশ্ন— ১৯৮৬ সালের পরে আর্জেন্টিনা আর বিশ্বকাপ জেতেনি। সঠিক পথের সন্ধানও দিতে পারছেন না কেউ। আপনি বলুন, বিশ্বকাপ জয়ের রোডম্যাপ কী হওয়া উচিত? 

মার্টিনো— আর্জেন্টিনা কোন স্টাইলে খেলবে, তা নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। আর্জেন্টিনার সমস্ত বয়সভিত্তিক দলগুলোর জন্য একটাই মাস্টার প্ল্যান তৈরি করা দরকার। দীর্ঘমেয়াদি একটা পরিকল্পনা থাকা দরকার। 

মার্কোস রোহোকে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ মার্টিনোর। ছবি— এএফপি

প্রশ্ন— মেসি সম্পর্কে বলা হয়, তিনি বার্সাতে সুন্দর। আর্জেন্টিনায় নয়। আপনার মতামত কী? আপনি তো একমাত্র কোচ যিনি ক্লাবে ও দেশে মেসিকে কোচিং করিয়েছেন। 

মার্টিনো— এর পিছনে একাধিক কারণ রয়েছে। গঠনগত দিক থেকে বার্সেলোনা ও আমাদের জাতীয় দলের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। দলের সতীর্থদের মধ্যে বোঝাপড়াটা খুবই দরকারি। বার্সেলোনায় মেসি প্রায় এক দশক ধরে একই সতীর্থদের সঙ্গে খেলে চলেছে। ফলে বোঝাপড়াও ভাল। তাছাড়া সতীর্থদের ব্যক্তিগত দক্ষতার জন্য বার্সায় মেসি খোলা মনে খেলতে পারে। সব চাপ ওকে নিতে হয় না।  শুধু মেসি নয়, যে কোনও ফুটবলারকে অনুকূল পরিস্থিতিতে খেলার সুযোগ দেওয়া হলে, সেই ফুটবলারের কাছ থেকে সেরাটাই সব সময় পাওয়া যায়। বার্সেলোনায় যেমন মেসি নিজেকে মেলে ধরে। জাতীয় দলে মেসি কি এই ধরনের সুযোগ সুবিধা পায়?