আচমকাই খবরটা পাওয়া গেল। গোপাল বসু আর নেই। রবিবার, এক ছুটির ভোরবেলা চিরছুটিতে বেরিয়ে পড়েছেন তিনি। ৭১ বছরের জীবন থমকে গেল এক বিষণ্ণ শেষ রাতে। কে ছিলেন গোপাল বসু? এই প্রশ্ন যখন আগামী প্রজন্ম করবে, গুগল ঘেঁটে তখন তারা চিনবে বাংলার একজন প্রাক্তন ক্রিকেটারকে। কিন্তু নেভিল কার্ডাস বলেছিলেন ‘স্কোরবোর্ড একটা গাধা’— সেকথা একেবারে ফেলনা নয়। গোপাল বসু টেস্টে খেলেননি। অথচ সুযোগ পেলে তিনি নিজেকে প্রমাণ করতেনই। সম্ভাবনার বীজ মহীরুহ হয়নি। তবু গোপাল স্মরণীয় হয়ে রয়েছেন। হোক না ট্র্যাজিক নায়ক, তবু তিনি নায়কই।  

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

আজকের প্রজন্মের কাছে তিনি একজন প্রাক্তন ক্রিকেটার। কিন্তু সেই সাতের দশকের ক্রিকেট-পাগলদের স্মৃতিতে গোপাল বসু একজন ক্রিকেটার মাত্র নন। পঙ্কজ রায়ের সফল কেরিয়ারের ব্যতিক্রম বাদ দিলে বাঙালির টেস্ট দলে নিয়মিত হওয়াটা তখনও একটা বড় স্বপ্ন ছিল। সেই স্বপ্নের পথে অন্যতম এক পথিকের নাম ছিল স্টাইলিশ বাঁ হাতি ব্যাটসম্যান গোপাল বসু। 

না, তিনি সরকারি ভাবে টেস্ট খেলার সুযোগ কোনওদিনই পাননি। সাকুল্যে একটি ওয়ানডে ম্যাচ ছাড়া আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সুযোগই পাননি গোপাল। কিন্তু তা সত্ত্বেও সেযুগের এক উজ্জ্বল ক্রিকেটার হিসেবে রয়ে যাবেন তিনি। আর তার সঙ্গে রয়ে যাবে এই অভিমান— ক্রিকেট-রাজনীতিই তাঁকে সরিয়ে দিয়েছিল ক্রিকেটের আন্তর্জাতিক পরিসর থেকে। স্বপ্ন ব্যর্থ হয়েছিল দারুণ সম্ভাবনাময় এক তরুণের। 
 

গোপাল বসুর মৃত্যু  বাংলার ক্রিকেটের এক সাবেক অধ্যায়ের সমাপ্তি। ফাইল চিত্র

গত ১৫ অগস্ট চলে গিয়েছেন অজিত ওয়াদেকর। কী অদ্ভুত সমাপতন! কয়েকদিনের মধ্যেই চলে গেলেন গোপাল বসু। ১৯৭১ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে ভারত সিরিজ জিতে ফেরে। সেই দলের অধিনায়ক ছিলেন অজিত। আর সেই সফরেই ভারতীয় ক্রিকেটে ‘সানি’র উদয়। সুনীল মনোহর গাওস্কর। প্রথম সিরিজেই ৭৭৪ রান। তার পর আর পিছনে ফিরতে হয়নি তাঁকে। সেই একই সময়ে বাংলা দলে খেলতে শুরু করেছেন গোপালও। তিনিও তখন জাতীয় দলে ঢোকার অন্যতম নাম। জাতীয় দলে জীবনের একমাত্র সরকারি সিরিজে গোপালের অধিনায়ক ছিলেন অজিতই।  

শেষ পর্যন্ত গোপাল সুযোগ পাননি। কিন্তু টেস্ট তিনি খেলেছিলেন তার আগেই। আর প্রথম টেস্টেই তিন অঙ্কের রান করেছিলেন তিনি। হ্যাঁ, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের আগেই অভিষেক টেস্টে শতরানের রেকর্ড গোপাল বসুরই নামে থাকার কথা। কিন্তু যেহেতু শ্রীলঙ্কার সঙ্গে সেই টেস্ট ‘সরকারি স্বীকৃতি’ পায়নি, তাই গোপালের এই সাফল্যও রেকর্ড বইতে ঠাঁই পায়নি। কিন্তু রেকর্ড বইতে না থাক, বাঙালির নস্টালজিয়ায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করে রেখেছেন গোপাল। 

কলম্বোর সেই বেসরকারি টেস্টে ভারত প্রথম ইনিংসে ১৪১ রানে পিছিয়ে পড়েছিল। গাওস্কর ও গোপাল ওপেনিং জুটিতে ১৯৪ রান যোগ করে ভারতের বিপর্যয় রুখেছিলেন। গোপালের ব্যাট থেকে এসেছিল ১০৪। পরের ম্যাচে গোপাল করেছিলেন ৫৪ ও ৫। 

এর পরেও ইংল্যান্ড সফরে টেস্ট খেলার সুযোগ পাননি গোপাল। অথচ সিরিজের আগে ভারতীয় একাদশ ও অবশিষ্ট ভারতীয় দলের প্রস্তুতি ম্যাচেও ৭৭ করেছিলেন গোপাল। স্কোয়াড থেকে গোপালকে বাদ দেওয়া সম্ভব হয়নি। ইংল্যান্ডে গিয়েও দারুণ খেলেছিলেন গোপাল। কেবল ব্যাটে নয়, বল হাতেও একটি ম্যাচে ২৩ রানে ৪ উইকেট তুলেছিলেন। তার পরেও সুযোগ হয়নি ‘লিটল মাস্টার’-এর সঙ্গী হিসেবে ওপেন করার। সেই কুখ্যাত ‘সামার অফ ৪২’-তে রীতিমতো ভরাডুবি হয়েছিল ভারতের। যার মধ্যে সবচেয়ে খারাপ পারফরম্যান্সটা ছিল মাত্র ৪২ রানে অলআউট হয়ে যাওয়া। তবু সোলকার, ফারুক ইঞ্জিনিয়র, সুধীর নায়েকরা সুযোগ পেলেও ওপেনিংয়ের একটি সুযোগ তাঁর ভাগ্যে জোটেনি। কেবল সাত্ত্বনা পুরস্কারের মতো একটিই সুযোগ। ওয়ানডে ম্যাচে। ১৩ রান করেছিলেন গোপাল। 

ব্যাস। সেই শেষ। রাজ্য দলে এর পরেও চুটিয়ে খেলে গিয়েছেন গোপাল। চেন্নাই-এ (তখন মাদ্রাজ) এক ম্যাচে আহত গাওস্করের জায়গায় তাঁর সুযোগ পাওয়া যখন নিশ্চিত, তখন আচমকাই শেষ মুহূর্তে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। 

সুঁটে বন্দোপাধ্যায়, সুব্রত গুহ ও আরও অনেক বাঙালির মতোই ট্র্যাজিক নায়ক হয়ে জীবন কাটিয়ে গিয়েছেন প্রতিভাবান এই কিংবদন্তি। কিন্তু জাতীয় দলে সুযোগ না পেলেও বাঙালির হৃদয়ে গোপাল বসু এক হার না মানা নায়কের নাম হয়েই থেকে যাবে। এক অবধারিত এপিটাফের মতো।