২১ জুলাই। এই তারিখটা বঙ্গ রাজনীতিতে মমতা-ম্যাজিকের মাপকাঠি। ১৯৯৩-র ২১ জুলাই আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন যুব কংগ্রেস সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই আন্দোলনে যোগ দিয়েই মৃত্যু হয়েছিল ১৩ জন যুব কংগ্রেস কর্মীর।

কংগ্রেস নেত্রীর সেই আন্দোলনকে ভোলেননি তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাম জমানায় প্রতিটি ২১ জুলাই বুঝিয়েছে রাজ্যে নতুন শক্তির উদয় হচ্ছে। প্রতি ২১ জুলাই সমর্থকদের উপস্থিতি বৃদ্ধি সিপিএমের শক্ত ভিত একটু একটু করে নরম হয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। আর ২০১১ সালে রাজ্যে পরিবর্তন সেই ইঙ্গিতকে সত্যি করেছে।

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

কারও অস্বীকার করার উপায় নেই তিন দশকের বাম জমানায় ইতি টানার পিছনে যে শক্তি সব থেকে বেশি কাজ করেছিল তার নাম— মমতা-ম্যাজিক।

সেই ম্যাজিকে ২০১৪-র লোকসভা নির্বাচনে গোটা দেশের মোদী-ঝড় থমকে গিয়েছে বঙ্গোপসাগরের তীরে এসে। সপা, বসপা-র উত্তরপ্রদেশেও পদ্ম পাঁপড়ি মেলেছে সর্বজয়ীর মতো। কিন্তু ঘাসফুলের সামনে মাথা নোয়াতে হয়েছে সর্বগ্রাসী মোদী-হাওয়াকে। তার পিছনেও এক ও অদ্বিতীয় কারণ ছিল— মমতা-ম্যাজিক।

এর আগে ২০১৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচন। তার ঠিক আগে আগে রাজ্যে চিটফান্ড কেলেঙ্কারি। সারদা, রোজভ্যালি ইত্যাদি নিয়ে রাজ্য তখন যেন তৃণমূল বিরোধী বারুদের স্তূপ। তার মধ্যেও তৃণমূল থেকেছে তৃণমূলের মতো। যাবতীয় জল্পনা মিথ্যা করে বাংলা দেখেছে— মমতা-ম্যাজিক।

গত বিধানসভা নির্বাচনের ক্ষেত্রেও তো একই চিত্র। বিজেপি তখন থেকেই রাজ্যে নতুন শক্তি হিসেবে শক্তি সঞ্চয় করছে। অন্য দিকে, বাম-কংগ্রেস জোট হয়ে ভোট ভাগ আটকে গিয়েছে। সেই পরিস্থিতিকে আরও প্রতিকূল করে দিতে তৃণমূল কংগ্রেসের সামনে এসে দাঁড়াল নারদকাণ্ড। এক ডজন নেতামন্ত্রী অভিযুক্ত। না, এবার অভিযোগ শুধু মুখে নয়, ভিডিওতে। যা দেখা যায়। যেখানে দেখা যাচ্ছে, নেতারা বান্ডিল-বান্ডিল টাকা নিচ্ছেন। কেউ কেউ আবার তোয়ালে মুড়ে। কার্যত কোণঠাসা তৃণমূল কংগ্রেসের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া অবস্থা।

না, তৃণমূলকে উদ্ধার করতে কোনও ঐশ্বরিক শক্তি লাগেনি। সব কিছুর সমাধান করে দিয়েছিল সেই এক— মমতা-ম্যাজিক।

সেই ম্যাজিক কি আর নেই? নাকি ক্যারিশ্মা কমছে? সেটা না হলে অনুব্রত মণ্ডলকে কেন রাস্তায় নামিয়ে ‘উন্নয়ন’-কে দাঁড় করিয়ে রাখতে হল! মমতা-ম্যাজিক অক্ষুণ্ণ থাকলে কেনই বা মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে ‘বিরোধীশূন্য’ পুরস্কার ঘোষণা করতে হবে! কেন মনোনয়ন থেকে গণনা প্রতি পর্বে রক্তের বিনিময়ে, প্রাণের বিনিময়ে জয় ছিনিয়ে নিতে হল? এত উন্নয়নের সাফল্য সত্ত্বেও কেন ৩৪ শতাংশ ভোটহীন জয় পেতে হবে! কেন গর্বের সঙ্গে বলা গেল না, আমরা একশো শতাংশ লড়াই দিয়ে জনতার রায় নিয়েছি! বার বার তাই সেই একই প্রশ্ন— সহজ জয়ের জন্য কি মমতা-ম্যাজিক ‘কম পড়িয়াছিল’?

এই প্রশ্ন শুধু এই কলমচি বা রাজনৈতিক মহলের নয়। এই প্রশ্ন, অগণিত সাধারণ তৃণমূলকর্মীর। দিদিকে ভালবাসা, নেত্রীর প্রতি অনুগত বিশ্বাসে অন্ধ শহুরে, শিক্ষিত তৃণমূল সৈনিকদের মধ্যেও।

বছর পার করলেই লোকসভা নির্বাচন। তার পরে একটি বছর কাটিয়েই বিধানসভা নির্বাচন। রাজ্যে বিজেপি-র শক্তি ক্রমশ বাড়ছে। কংগ্রেস ও বামেদের শক্তিহ্রাস বিজেপির শক্তি আরও বাড়াচ্ছে। এমন সময়ে প্রশ্ন মনে আসা স্বাভাবিক। ‘মমতা-ম্যাজিক’ থাকতে, এত ‘লাঠি-সোটা’-র দরকার কী?

নাকি ‘ম্যাজিক’ ফুরিয়েছে! আচ্ছা, ফুরিয়ে না যাক, কমেছে কি! এমন সব প্রশ্ন মনে নিয়ে ঘুম আসছে না তৃণমূলপ্রেমীদের। চোখ-চাওয়া ঘুম যে মানুষের অসাধ্য।

এ রাজ্যে যেমন মমতা, ঠিক তেমনই দেশে মোদী। একের পরে এক জয়ের নেশায় সেনাপতি অমিত শাহ ঘোড়া ছুটিয়েই চলেছেন। কিন্তু কর্ণাটকে সেই ঘোড়া হোঁচট খেয়েছে। মোক্ষম হোঁচট। মহাভারতের আমল হলে বলা হতো— ‘‘শপথ নিয়ে পদত্যাগ ক্ষত্রিয়ের ধর্ম নহে।’’

এ রাজ্যেও তৃণমূলের অনেক জয় যে থমকে রয়েছে। কেউ জানে না অনুব্রত মণ্ডলের একশো শতাংশ জেলা পরিষদ জয়ের ভবিষ্যৎ। কেউ জানে না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ৩৪ শতাংশ ভোট-হীন জয়ের পরিণতি কী হবে? অনেক নালিশ যে সুপ্রিম কোর্টের ফাইলে।

আরও পলিটিপস পড়তে ক্লিক করুন এখানে

তৃণমূল কিংবা বিজেপি দুই ‘ফুল’ পার্টিই ম্যাজিক নির্ভর। আর বঙ্গ কিংবা কর্ণাটক যে ছবি দেখাল তাতে এটা নিশ্চিত, ম্যাজিকে ভাটা পড়েছে। তাই খাবার কেড়ে খাওয়ার প্রবণতা। কিন্তু খেলেই তো আর সব কিছু পেটে সয় না। খাপছাড়া ভাবেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এক ‘খাপছাড়া’ ছড়া মনে পড়ছে—

রসগোল্লার লোভে পাঁচকড়ি মিত্তির
দিল ঠোঙা শেষ করে বড় ভাই পৃথ্বীর।
সইল না কিছুতেই,                যকৃতের নিচুতেই
যন্ত্র বিগড়ে গিয়ে ব্যামো হল পিত্তির।
ঠোঙাটাকে বলে, ‘পাজি               ময়রার কারসাজি।’
দাদার উপরে রাগে— দাদা বলে, ‘চিত্তির!
পেটে যে স্মরণসভা আপনারই কীর্তির।’

বিরোধীশূন্য বাংলা, বিরোধীশূন্য ভারত গড়ার লোভে এই বেশি খাওয়া না ‘বদহজম’ হয়ে যায়! ঠোঙা বা ময়রা কেউ দায় নিতে আসবে না। ভোটের ব্যামো থুড়ি পেটের ব্যামো মোটেও ভাল নয়।