শুধু কয়েক মুহূর্তের ব্যবধান, মনে হলো সব কষ্টের অবসান ঘটে গেল। 

সকাল আটটা থেকে দুপুর প্রায় তিনটে, টানা সাত ঘণ্টা খাড়াই পাহাড়ি পথ অতিক্রান্ত করে এসে যদি দেবস্থানটি বন্ধ পেতাম, খুবই মন খারাপ হয়ে যেত। এমন তো আর নয় যে, আজ হলো না পরের সপ্তাহে আবার আসব!

হেমকুণ্ড সাহিব বলে কথা, ভারতের সর্বোচ্চ গুরুদ্বার। বছরের ছ’মাস যা বন্ধ থাকে বরফের জন্য। মে মাস থেকে শিখ ধর্মাবলম্বীদের কর-সেবকরা এসে রাস্তা পরিষ্কার করার কাজ শুরু করেন। তার পর থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, হাজার হাজার মানুষ ভিড় জমান এই পথে। 


চলি চলি, চলি চলি... 

শুধু যে শিখ ধর্মাবলম্বীদেরই দেখা যায় এখানে, তা নয়। পাহাড়প্রেমী পর্যটক, অ্যাডভেঞ্চার-প্রেমী ট্রেকারের দলও থাকে তাঁদের মধ্যে। 

উত্তরাখণ্ডের চামোলী জেলার এক প্রত্যন্ত এলাকায়, সাতটি পাহাড় চূড়ার মাঝে রয়েছে হেমকুণ্ড সাহিব গুরুদ্বার। প্রায় ১৫,১৯৭ ফুট উচ্চতার এই গুরুদ্বার তৈরি করিয়েছিলেন ভারতীয় সেনার মেজর জেনারেল হরকিরত সিংহ। তিনি নির্মাণ কাজের দায়িত্ব দিয়েছিলেন স্থপতি সিয়ালি লুড্ডুকে। জানা যায়, হেমকুণ্ড সাহিব গুরুদ্বারের কাজ শুরু হয়েছিল ১৯৬০ সালে। সাধারণ গুরুদ্বারের থেকে এই নির্মাণশৈলী একেবারেই আলাদা। সামনে থেকে বোঝা না গেলেও, উপর থেকে দেখলে মনে হবে এটি একটি উল্টানো পদ্মফুল।


গুরুদ্বারের অন্দরে। গ্রন্থ সাহিব পাঠ হয়ে গিয়েছে অনেক আগেই।

হিমালয়ের বুকে অনেক অদ্ভুত দৃশ্য রয়েছে যার কোনও ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। তেমনই এক স্থান এই হেমকুণ্ড। বরফের পাহাড়ে ঘেরা এই কুণ্ড নাকি শীতের সময়েও জমে যায় না। শিখ ধর্মালম্বীদের বিশ্বাস, তাঁদের দশম গুরু, গোবিন্দ সিংহ এই কুণ্ডে স্নান করেছিলেন। এবং তার উল্লেখ পাওয়া যায় ‘দশম গ্রন্থ’-এ। ভক্তরা মনে করেন এই কুণ্ডের জলে রয়েছে দৈব শক্তি। এবং এখানে স্নান করলে সেরে যায় কঠিন অসুখও। 


হেমকুণ্ড সাহিবের লোঙ্গর। তখন বেশির ভাগ মানুষই খেয়ে ফেরার পথ ধরেছেন।

প্রসঙ্গত, গুরুদ্বারের পাশেই রয়েছে লক্ষ্মণ মন্দির। কথিত, মেঘনাদ বধের পরে লক্ষ্ণণ এ স্থানে বসেই কঠিন সাধনা করেছিলেন, প্রায়শ্চিত্তের জন্য। এই মন্দিরে স্থানীয় গাড়ওয়ালীরা ছাড়াও পুজো করেন গুরুদ্বারে আসা শিখরাও। মনে হয়েছিল, ধর্মসমন্বয়ের এমন নিদর্শন এ দেশে আরও গড়ে উঠুক। 

হেমকুণ্ড গুরুদ্বারে প্রতি দিন গ্রন্থ সাহিব পড়া হয়। রয়েছে একটি দাতব্য চিকিৎসালয়। গুরুদ্বারের লঙ্গরে প্রতি দিন খিচুড়ি রান্না হয় ভক্তদের জন্য। এখনও পর্যন্ত এমন হয়নি যে খাবার না পেয়ে কেউ ফিরে গিয়েছে। এমনও দিন গিয়েছে, যেদিন ভক্ত সংখ্যা ছাড়িয়েছে দু’হাজার।

রান্নার আয়োজন, বাসন ধোওয়া, চা তৈরি করা— সব কাজই করেন কর-সেবকরা। অমৃতসরের বাসিন্দা সৎনম সিংহ তাঁদেরই একজন। বাড়ি-সংসার ছেড়ে, নিঃস্বার্থভাবে মানব সেবা করার তাগিদেই তাঁরা বছরের পাঁচ-ছ’মাস থেকে যান হেমকুণ্ডে। এ বছর ৩৫ জন এমন কর-সেবক রয়েছেন প্রত্যন্ত এই গুরুদ্বারে।


পরিষ্কার করে ধোওয়া থালা-বাটি-গ্লাস ডাঁই করে রাখা থাকে।

অগস্টের মাঝামাঝি এক দল মহিলা গিয়েছিলাম সেই হেমকুন্ডের পথেই। কোনও ধর্মের টানে নয়। একেবারেই পাহাড় ঘোরার জন্য। আর ব্রহ্মকমল দেখার লোভে। কারণ, ভারতে এই ফুল জন্মায় কেবল এ অঞ্চলেই। ৩০০০ থেকে ৪৮০০ মিটার উচ্চতায়েই পাওয়া যায় এই দুর্লভ ফুল। ভেষজ গুণসম্পন্ন ব্রহ্মকমল পাওয়া যায় মায়ানমার ও চিনের কিছু অঞ্চলেও। 

হেমকুণ্ডের পথ বেশ কঠিন। যদিও রাস্তা খুবই ভাল। তবে এই বয়সে এভারেস্ট জয়ের কথা ভাবাও পাপ! তাই নিজেকে সান্ত্বনা দিতে দেশের সর্বোচ্চ গুরুদ্বারটিও কম ব্যাপার নয়। 


গুরুদ্বার চত্বরেই গজিয়ে উঠেছে ব্রহ্মকমল।

এই পুরো অ্যাডভেঞ্চারের নেপথ্যে ছিল এক পাহাড়-পাগল মহিলা, সোমা মজুমদার পাল। স্কুলের বন্ধুটি যে ‘বুড়ি’ হয়ে এমন কীর্তিকলাপ করবে, তা ছোটবেলায় মোটে বুঝতে পারিনি। নিজের চেষ্টায় তৈরি করেছে ‘সোমা’স ক্যাম্প’। যার মাধ্যমে ছোট-বড়, নানা বয়সের মানুষ, মূলত মহিলাদের নিয়ে ঘুরে বেড়ায় হিমালয়ের খাঁজে-খোঁজে।

‘‘সোমা, অসংখ্য ধন্যবাদ তোকে, সেদিন জোর না করলে নিজের উপর ভরসাটা আরও কমে যেত বোধহয়।’’