ইন্টারনেট কি অনন্ত? মানে, তাতে অনন্তকাল ধরে অগণিত মানুষ অনিঃশেষ ডেটা কি মজুত রাখতে পারেন? প্রশ্ন কঠিন। গুগলের শরণাপন্ন হতে দেখা গেল, তেমন খোলসা করে কেউই ঝেড়ে কাশছে না। খ্যাতনামা বিজ্ঞান বিষয়ক ওয়েবসাইট লাইভসায়েন্স.কম জানাচ্ছে, ইন্টারনেট অসীম নয়। তারও ক্যাপাসিটি বা ধারণক্ষমতা রয়েছে। সেটা হল ১০^২৪ বাইট বা ১ মিলিয়ন এক্সাবাইট। ১ এক্সাবাইট মানে ১০ লক্ষ টেরাবাইট। শুনলে মাথা যতই ঝিম ঝিম করুক, এটা নির্যস সত্য যে, ইন্টারনেটের সীমা রয়েছে। এটা আর যেই বুঝুক, ভারতীয়রা বোঝেন না। তাঁদের ধারণা সম্ভবত— মাথার উপরে বিছিয়ে থাকা এই জাল সীমাহীন, এতে যা ইচ্ছে তা-ই করা যায়। 

সম্প্রতি ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন জানাচ্ছে, এক বিশেষ কারণে ইন্টারনেটের এই সসীম পরিধি ভরে এসেছে। এবং এই কারণটির পিছনে সব থেকে বেশি অবদান ভারতীয়দের। প্রতিদিন কোটি কোটি ভারতীয় হোয়াটসঅ্যাপ বা ফেসবুকে ‘গুড মর্নিং’ বা ওই জাতীয় মেসেজবাজি করে মোটামুটি ভরে এনেছেন ইন্টারনেট। বলাই বাহুল্য, এ এক অনবদ্য অবদান। এমন কাণ্ড কোথাও খুঁজে পাবে না কো তুমি।

পৃথিবীর এত দেশ থাকতে এহেন অভিযোগ কেন পড়ল শুধুমাত্র ধনধান্যপুষ্পভরা এই দেশের উপরে? এ কি কোনও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র? পশ্চিমবঙ্গে বাম শাসন থাকলে এই মুহূর্তে উত্তর আসত— এ সবই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কারসাজি। সন্দেহ নেই তায়। জুকেরবার্গ ও তাঁর দুই ব্র্যান্ড, ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপ নিঃসন্দেহে মার্কিনি প্রডাক্ট। এই সব সোশ্যাল মিডিয়া সেদিক থেকে দেখলে, তৃতীয় বিশ্বের সামনে ছুড়ে দেওয়া ললিপপ, ঝুমঝুমি। মার্কিনি প্রভুরা ঈষৎ বঙ্কিম হেসে মনে মনে বলে থাকেন— লেঃ, এই লিয়ে চুপ থাক। তা ছাড়া এটাও সত্যি যে, সোশ্যাল মিডিয়া মানে তার ব্যবহারকারীকে বিনি পয়সার শ্রমিকের কাজ করিয়ে নেওয়া। কাঠামো বানিয়ে ছেড়ে দিয়েছি, এবার তুই মর লাঙল চষে। পয়সা তো আমার পকেটেই আসবে।   

গণমাধ্যমের এই চরিত্র নির্ধারণ ও তা থেকে তিন নম্বরি বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণের এই মডেল নিয়ে অগণিত সমাজবিজ্ঞানী সরব হয়েছেন। দুঃখের বিষয়, তাঁরা প্রায় সবাই মার্কসবাদী। সেই মতবাদ অনুসারে, ক্যাপিটালিজমের কাজই এই। তৃতীয় বিশ্বকে কারণে বা অকারণে প্রথম বিশ্বের অভিমুখী করে তোলাটাই এখানে উদ্দেশ্য। এই সোশ্যাল মিডিয়া দিয়েই ঢুকবে পণ্যমোহ, কেনাকাটার বিপুল চাপ। তার পরে কিনতে কিনতে একদিন আপনা-আমার-পাঁচুর-হরিদাসীর মৃত্যু হবে। আর সেই মরণোত্তর টাকা-পয়সা গাপ করবে মার্কিনি বহুজাতিক। 

সোশ্যাল মিডিয়া কিন্তু মুফতিয়া নয়! ছবি: পিক্সঅ্যাবে

আজ থেকে কুড়ি বছর আগেও এমন বক্তব্য বিপুল আদর পেত। পাড়ার মোড়ে নেঞ্চুদা সভা ডেকে ফেলতেন ‘বৈকাল পাঁচ ঘটিকায়’। স্টার ইলেক্ট্রিকের বেটোদা মাইক লাগাতেন, তীব্র কিঁ-ই-ই-ইচ সহ সেই মাইক উদ্গীরণ করত জ্বালাময়ী ভাষণ। কিন্তু সে ঘটনা ঘটেনি। কারণ ইন্টারনেট জেঁকে বসার আগেই বামেরা বিগত। এখন মাথার উপরে ডিজিটাল ইন্ডিয়ার চাপ। 

দেশ কি প্রগতি বাওয়া! কতা হবে না। যাবৎ লেনাদেনা, বিয়ে, নিকাহ, মায় শ্রাদ্ধ পর্যন্ত ডিজিটাল। তা হলে দেশবাসীর কী দোষ? সে তো শুধু সকালে একটা অভিবাদন জানাতে চায়! এমন নিরীহ কাণ্ড থেকে কি তেমন ঘোটালা ঘটতে পারে? ভারতীয়দের কোনও দোষ নেই। সে তো আজ থেকে তিনশো বছর আগে জানতই না, সক্কাল সক্কাল ‘গুড মর্নিং’ দিয়েই দিন শুরু করতে হয়। সে জানতো না, ঘুম থেকে উঠেই সমাজিকতার চাপে নিজেকে পিষ্ট করাটাই ‘সভ্যতা’। না হে, দেশবাসীর কোনও দোষ নেই।

কেবল গুড মর্নিং নয়, কোন অবকাশে না মেসেজ পাঠান ভারতীয়রা? তার উপরে রয়েছে সারাদিন ধরে পুটুস-পুটুস জোকস, জ্ঞানবাণী, রামদেবের ভিডিও, আর রাউন্ড দ্য ক্লক প্রেম-পিরিতির চ্যাট। সবটাই যে ১০^২৪ বাইট মাপের একটা চৌবাচ্চায় গিয়ে পড়ছে, সে খেয়াল নেই! থাকার কথাও নয়। কারণ এই মহান সত্যটি ভারতীয়দের কাছে অজ্ঞাত। গত তিরিশ বছরে ভারতীয় পরিসরে যে তথ্যচর্চা কমেছে, তার জন্য বিশেষ কোনও পরিসংখ্যানের দরকার পড়ে না। ১৯৭০-এর দশকে জন্মানো ব্যক্তিরাও মনে করতে পারবেন, ১৯৮০-১৯৯০ দশকেও কুইজ-সংস্কৃতির যে রমরমা ছিল, তা একবিংশে এসে ধাঁ হয়ে গিয়েছে। কৌন বনেগা কড়োরপতি বা দাদাগিরি-জাতীয় গেম শো বর্নভিটা কুইজ কন্টেস্ট বা কুইজ টাইমস-জাতীয় প্রোগ্রামের ভেজা ফ্রাই করে দেয়। শেষোক্ত অনুষ্ঠানগুলি ছিল কুইজ নামক এক বিশেষ খেলায় দক্ষতাসম্পন্ন মানুষের শো-ডাউন। আর কৌবক বা দাদাগিরি লটারি বা ওই জাতীয় কিছু তুকতাকের মাধ্যমে ক্যামেরার সামনে উঠে আসা কিছু আনপড় পাবলিকের ধামাল। ফলে ইনফরমেশন সোসাইটি আড়ে-দৈর্ঘ্যে বাড়লেও কাজের কাজ কিস্যু হয়নি। তথ্যকে গণস্তরে ছড়িয়ে দেওয়া যায়নি। 

ফলে ইন্টারনেট কী, তার সীমা বা অসীমত্ব নিয়ে ডেটাভিত্তিক অলোচনার চেহারাটাই বা কী, এসব আম ভারতীয়ের জ্ঞানসীমার বাইরের বিষয়। পকেটে টাকা থাকলেই স্মার্টফোন-মালিক। আর তার পরে নেটবাজির যে অমেয় অবসর, তা এদেশের তালকানা থেকে তালেবর— সবাই এনজয় করেন। পোস্ট করা নিয়ে কথা। সেন্ড করা নিয়ে কথা। তার পরে যা হয় হোক। ইন্টারনেট উপচোলে উপচাবে। তাতে কিস্যু যায় বা আসে না।

ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে...! ছবি: পিক্সঅ্যাবে

আবার অন্য দিক থেকে দেখলে, এই গুডমর্নিংবাজি কোনও অন্তর্ঘাত নয়তো? কোটি কোটি ভারতীয় কি ছিঁড়ে ফেলতে চাইছেন অন্তর্জালতন্তু? ‘‘ওদের বাঁধন যতই শক্ত হবে ততই বাঁধন টুটবে, মোদের ততই বাঁধন টুটবে’’— কবিগুরুর সেই স্বদেশি ডাক আজও ঘুরপাক খাচ্ছে অন্তরের অন্তস্থলে। অথবা মনের গহীনে থাকা ফ্যাতাড়ুরা বলছে— ‘‘পারলেই ড্যামেজ করো। ছিঁড়ে দাও যা যা ছেঁড়ার!’’

আপাতত মাথার উপরে ইন্টারনেটের দশা পলিব্যাগে ভরা আধলার মতো। মাথায় ছিঁড়ে পড়ল বলে। 

ভাইসব, মাথা সামলে!!