দেশের স্বাধীনতার সময় যেমন ব্যবস্থা হয়েছিল, তেমনই আয়োজন ছিল জিএসটি-কে ঘিরে। এই বছর ৩০ জুন ও ১ জুলাই-এর সন্ধিক্ষণে, মধ্যরাতে সংসদের যৌথ অধিবেশন বসল। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় এলেন। হাসিমুখে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পাশে দাঁড়িয়ে সূচনা করলেন ঐতিহাসিক কর ব্যবস্থা— পণ্য ও পরিষেবা কর বা জিএসটি। 

ঐতিহাসিকই বটে। এক দেশ এক কর ব্যবস্থা ভারতে প্রথম। একটি পরিষেবা বা একটি পণ্যের উপরে বিভিন্ন রাজ্যে বার বার কর দিতে হবে না। এক বার কর দিলেই চলবে। এক সঙ্গে ১৭টি ট্যাক্স উঠে গেল। দারুণ ব্যাপার। চারিদিকে হই হই রব— জিনিসপত্রের দাম অনেক কমে যাবে।

সকলের মনেই নানা প্রশ্ন। কৌতূহল। কেউ বিরোধিতায় ব্যস্ত। কেউ বাহবা দিতে। কিন্তু জিএসটি-র ফলে সাধারণ মানুষের কতটা সুবিধা হবে, তা নিয়ে কারও কোনও স্পষ্ট উত্তর নেই।

শাক-সবজি, ব্র্যান্ডহীন চাল-ডালে জিএসটি নেই, সুতরাং মধ্যবিত্তের ভাঁড়ারে টান পড়ার সুযোগ নেই। সুতরাং নিশ্চিন্তি।

কিন্তু সেই হাততালি বেশি দিন শোনা গেল না। জিএসটি-র কর তো সাধারণ ক্রেতা বা গ্রাহক দিয়ে দিল। ব্যবসায়ীরা সেই করের কাগজ ভরতে গিয়েই প্রথম ধাক্কা খেলেন। সিস্টেমটাই ঠিকমতো তৈরি নেই। বার বার পিছিয়ে গেল সেই জিএসটি রিটার্নসের সময়সীমা।

শুধুই সময়সীমা নয়, বার বার বদলে গেল জিএসটি-র করের হারও। গুজরাত নির্বাচনের কল্যাণে সবচেয়ে বড় রদবদল হল নভেম্বরে গুয়াহাটির জিএসটি কাউন্সিলের বৈঠকে। শুধুমাত্র ৫০টি দ্রব্য ও পরিষেবাকে রেখে দেওয়া হল সর্বোচ্চ করের স্ল্যাবে (২৮ শতাংশ)। ১৭৮টি দ্রব্য ও পরিষেবা চলে গেল ১৮ শতাংশের স্ল্যাবে। রেস্তোঁরায় খাওয়া দাওয়ার উপরে প্রথমে কর বাড়ে। তার পরে কমে যায়। 

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

বিরোধীরা হই হই করে উঠলেন— ‘দেখলে তো বলেছিলাম ভেবেচিন্তে করের হার ঠিক করা হয়নি প্রথমে।’ ব্যবসায়ীদের মধ্যে কেউ খুশি। কেউ কেউ বিরক্ত। 

গুজরাতের নির্বাচনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলে এলেন, জিএসটি বিল কিন্তু সব দল সমর্থন করেছে। একা বিজেপি-র বিল নয়। 

জিএসটি-র ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করেছিল বাজপেয়ী সরকার। তৎকালীন বাম অর্থমন্ত্রী অসীম দাশগুপ্তের নেতৃত্বে বিশেষ কমিটি তৈরি করে দেন বাজপেয়ী। নানা ধাপ পেরিয়ে জিএসটি বর্তমানের রূপ নেয়।   

যে কোনও বড় ও জটিল ব্যবস্থা চালু হলে তার ফাঁকফোকর বুজিয়ে ব্যবস্থাকে ত্রুটিমুক্ত করার কাজ চলতেই থাকবে।

একটু পাকাপোক্ত ব্যবস্থা করে হয়তো জিএসটি শুরু করলে সত্যিই ভাল হতো। দিনের শেষে সাধারণ মানুষের কী লাভ হল, তা অস্পষ্টই থেকে গেল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো যাঁরা বিরোধিতা করছিলেন জোর গলায়, তাঁরাও কেমন মিইয়ে গেলেন। ব্যবসায়ীরা শুধু লড়ে যাচ্ছেন জিএসটি রিটার্ন ফাইল করা নিয়ে।

জীবনের নানা ওঠা-পড়ার মতো, আর কিছু না হোক, ২০১৭ সালে জিএসটি-র মতো ঐতিহাসিক কর ব্যবস্থার ওঠা-পড়া অবশ্যই ইতিহাসে লেখা থাকবে।