তার নাম ডলি চেরকুরি শিবানী। বয়স এখন পাঁচ। তিরন্দাজি তার নেশা। অনূর্ধ্ব ৯ সাব জুনিয়র ন্যাশানলে রিকার্ভ বিভাগে দু’টো ব্রোঞ্জ এবং একটা রুপো জিতে ইতিহাস গড়ে ফেলেছিল। তখন তার বয়স? মাত্র দশ মাস! সেই রুপো রাতারাতি বদলে গিয়েছে সোনায়! ব্যাঙ্ককে প্রথমবার বাবার সঙ্গে এশিয়ান ইয়ুথ কাপে অনূর্ধ্ব ৯ এবং অনূর্ধ্ব ১৩ রিকার্ভ বিভাগে ১৭ নম্বর স্থান অর্জন করেছে ফুটফুটে মেয়ে শিবানী।
এখানেই শেষ নয়। গত বছর পর্যন্ত পাঁচ থেকে সাত মিটার দূরত্বে শিবানীর স্কোর ছিল ২০০ পয়েন্ট! দু’ঘণ্টায় সে ২৪ বারের চেষ্টায় নিখুঁতভাবে তির মেরেছে ৭২টা! তিরন্দাজিমহল জানিয়েছিল এটা বিশ্বরেকর্ড। আর শিবানী শুধু ভারতীয় তিরন্দাজি নয়, বিশ্ব তিরন্দাজির সাম্প্রতিক ইতিহাসেও বিস্ময় বালিকা! 
শিবানীর কোচ কে? তার বাবা চেরপুরি সত্যনারায়ণ। দেশের অন্যতম সেরা তিরন্দাজি কোচ বলা হয় তাঁকে। অন্ধ্রপ্রদেশের বিজয়ওয়াড়ায় তাঁর ভোলগা তিরন্দাজি অ্যাকাডেমি থেকে উঠে আসা ছাত্রদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম অলিম্পিয়ান মঙ্গল চাম্পিয়া। কমনওয়েলথ গেমসে পদকজয়ী রিতুল চট্টোপাধ্যায়, এশিয়ান গেমসে পদকজয়ী জ্যোতি সুরেখা। 
সত্যনারায়ণের দুই ছেলে ছিলেন। ভোলগা এবং লেনিন। দু’জনেই তিরন্দাজ ছিলেন। তার মধ্যে লেনিনের নাম ব্যতিক্রমী হয়ে রয়েছে। কমনওয়েলথ গেমসে রুপোজয়ী লেনিনই দেশের প্রথম তিরন্দাজ, যিনি খেলতে খেলতেই জাতীয় জুনিয়র দলের কোচ হয়েছিলেন। সত্যনারায়ণের দুর্ভাগ্য, দুই ছেলের অকালমৃত্যু হয়! বিশেষ করে, ২০১০ সালে গাড়ি দুর্ঘটনায় লেনিনের মৃত্যুতে ভীষণভাবে মানসিক অবসাদ গ্রাস করেছিল সত্যনারায়ণকে। 

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর


তাই হয়তো সোমবার বিজয়ওয়াড়া থেকে ফোনে তাঁর প্রথম মন্তব্য, ‘‘শিবানী ঈশ্বরের দান! আমার দুই ছেলেকে নিয়ে নিয়েছেন ঈশ্বর। তার পরিবর্তে তিনি উপহার দিয়েছেন এই মিষ্টি মেয়েকে।’’
 না হলে শিবানীর জন্মের কয়েকমাস আগে পোল্যান্ডে গিয়ে কেনই বা সত্যনারায়ণ সঙ্গে করে নিয়ে আসবেন পাঁচটা ধনুক আর গোটা পঞ্চাশেক তির! গর্বিত বাবা বলছিলেন, ‘‘জন্মানোর কয়েকমাস পর থেকে ওই ধনুক আর তির বগলদাবা করে চেষ্টা করত হামাগুড়ি দেওয়ার। তখনই আমি বুঝে গিয়েছিলাম শিবানী বড় হয়ে তিরন্দাজ হবে।’’ 

শিবাণী। 

বিজয়ওয়াড়ায় স্থানীয় স্কুলে প্রথম শ্রেণির ছাত্রী শিবানী। অভাবনীয় সাফল্যের সুবাদে সেই স্কুলের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডরও হয়ে গিয়েছে ছোট্ট মেয়ে! সম্প্রতি ভোলগা অ্যাকাডেমিতে সাইনা নেহওয়াল, পুসারলা বেঙ্কট সিন্ধু, পিটি ঊষার মতো অন্য খেলার তারকারা গিয়েছিলেন শুধুমাত্র শিবানীর অবিশ্বাস্য দক্ষতা দেখার জন্য। সোমবার বাবার ফোনে শিবানীর সংক্ষিপ্ত মন্তব্য, ‘‘এখন আমার লক্ষ্য ১৫ মিনিটে ১০০টা তির নিখুঁতভাবে ছোড়া!’’ 
সত্যনারায়ণ জানিয়ে দিলেন, এখন প্র্যাক্টিসে শিবানীর দূরত্ব বাড়িয়ে করে দেওয়া হয়েছে ১৮ মিটার। অ্যাকাডেমির একজন কোচ লাগুরি চন্দ্রশেখর যিনি মূলত শিবানী’কে কোচিং করান, সোমবার ফোনে বললেন, ‘‘১৮ মিটার দূরত্বেও শিবানী প্র্যাক্টিসে প্রায় ৪০০’র কাছাকাছি পয়েন্ট করছে!’’ সারাদিনই শিবানী পড়ে থাকে অ্যাকাডেমিতে। বাবা জানালেন, প্রয়াত লেনিনের ট্রেনিং এবং কমনওয়েলথ গেমসের কিছু ম্যাচের ভিডিও দেখতে শিবানী খুব ভালবাসে। অ্যাকাডেমির কোচ চন্দ্রশেখর বললেন, ‘‘অ্যাকাডেমিতে প্র্যাক্টিস করার সময় শিবানী তো মাঝেমধ্যে বড়দের ভুলও ধরিয়ে দেয়! এমনকী, ক্যাম্পের সিনিয়র তিরন্দাজদের সঙ্গেও ৩০ মিটারে সে ট্রেনিং করে সাবলীল ভঙ্গিতে।’’
সত্যনারায়ণের লক্ষ্য আগামী বছর ওয়ার্ল্ড ইন্ডোর এবং ক্যাডেট বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে শিবানীকে পাঠানো। বললেন, ‘‘সেই কারণেই ওকে এখন থেকে ৩০ মিটারে মাঝেমধ্যে ট্রেনিং করাচ্ছেন কোচেরা।’’ কিন্তু সত্যনারায়ণ একজন অভিজ্ঞ কোরীয় কোচ চাইছেন শিবানীর জন্য। গত একবছর ধরে তিরন্দাজি ফেডারেশন আর স্পোর্টস অথরিটি অফ ইন্ডিয়ার (সাই) কাছে চালিয়ে যাওয়া তাঁর দাবি এখনও গ্রাহ্য হয়নি। সিঙ্গাপুরের যে অভিজ্ঞ কোচের উপহার দেওয়া তির আর ধনুক নিয়ে শিবানী প্র্যাক্টিস করে, তিনিও খুব সম্প্রতি প্রয়াত হয়েছেন। 
সত্যনারায়ণের আশা, ওয়াল্ট ডিজনির সংস্থা তাঁর মেয়েকে নিয়ে যে ২১ মিনিটের তথ্যচিত্র তৈরি করেছে, সেটা বিশ্বজুড়ে দেখানো হলে হয়তো স্পনসর পাওয়ার কাজ সহজ হয়ে যাবে। সেই দিনের অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি।