স্বপ্ন নাকি বাস্তব! গায়ে কার্যত চিমটি কেটেই ভাইয়ের মেসেজটা একবার, দু’বার, দশ বার, বারবার পড়েই যাচ্ছিলেন সূরজ সিংহ বিস্ত। বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না তাঁর ছোট্ট ভাইটা আরও একবার ইতিহাস লিখে ফেলেছে!

দিয়েগো মারাদানো, লিওনেল মেসির দেশ আর্জেন্তিনাকে হারিয়ে ভারতীয় ফুটবল যে নতুন ইতিহাস তৈরি করে ফেলেছে। অনূর্ধ্ব ২০ ফুটবলারদের হাত ধরে। সেই টিমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য সূরজের ১৭ বছরের ভাই জিতেন্দ্র সিংহ বিস্ত। খবরটা পাওয়ার পর থেকেই যেন ঘোরের মধ্যে রয়েছে বিস্ত পরিবার। সূরজ বলছিলেন, ‘‘ভাই যখন মেসেজ করল প্রথমে মনে হয়েছিল, ঠিক দেখছি তো! বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে বার বার মেসেজ পড়লাম। ভাবতেই পারছি না ছোটবেলায় যে টিমের জার্সি পরে আমরা বিশ্বকাপ দেখেছি, সেই টিমকে আমার ভাই আর তাঁর সতীর্থরা হারিয়েছে।’’ এর সঙ্গেই সূরজ যোগ করলেন, ‘‘জানেন, যখন ফুটবল বুঝতে শিখলাম, অল্প অল্প খেলতে শুরু করলাম, তখন বিশ্বকাপের সময় মা আমাদের প্রথম আর্জেন্তিনার জার্সিই কিনে দিয়েছিল। দুই ভাই সেই জার্সি পরে বিশ্বকাপ দেখেছিলাম।’’ যদিও এখন জিতেন্দ্র স্পেনের অন্ধ ভক্ত। আর দাদা সূরজ জার্মানির সমর্থক। বিশ্বকাপের সময় স্পেন আর জার্মানিকে নিয়ে দুই ভাইয়ের মধ্যে মারাত্মক তর্ক বিতর্কও চলতে থাকে। সূরজ হাসতে হাসতে বলছিলেন, ‘‘তবে সেটা ফুটবল ম্যাচের নব্বই মিনিটের মতো মাঠের লড়াইয়েই সীমাবদ্ধ।’’

স্পেনে অনুষ্ঠিত কোটিফ কাপে আর্জেন্তিনাকে ২-১ হারিয়েছে ভারত। সেটাও প্রায় চল্লিশ মিনিট দশজনে খেলে! জিতেন্দ্রর এই সাফল্যের কথা সেভাবে অনেকেই জানেন না। তাই অনূর্ধ্ব১৭ বিশ্বকাপ চলাকালীন যে রকম উপচে পড়া ভিড় হয়েছিল তার বাড়িতে, এবার সে রকম নেই। তবু যাঁরা জানতে পেরেছেন শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। ফুল পাঠাচ্ছেন। বাড়িতেও মা-বাবা-দিদি-দাদাদের মধ্যে হইহই পড়ে গিয়েছে। 

কিন্তু যাঁকে ঘিরে এত উচ্ছ্বাস, সে নাকি সংযমের মোড়কে গুটিয়ে রেখেছে নিজেকে। জিতেন্দ্রর দাদাই বলছিলেন, ‘‘ভাইকে সেভাবে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখিনি। আসলে জেতার পর ও মেসেজ করেছিল। খুশি তো হবেই। তবে ওর মধ্যে একটা অদ্ভুত সংযমবোধ রয়েছে। বিশেষত যখন জাতীয় শিবিরে থাকে, তখন ও আরও সিরিয়াস হয়ে পড়ে।’’ ফুটবলের বিষয়ে কোনও রকম গাফিলতি নাকি পছন্দ নয় ১৭ বছরের ছেলেটার। সূরজ বলছিলেন, ‘‘ছুটিতে বাড়ি এলেও সারাক্ষণ প্র্যাক্টিস নিয়েই থাকে ও। দিনে সাত-আট ঘণ্টা অনুশীলন করে। রবীন্দ্র সরোবরে কখনও একা, আবার কখনও আমাদের সঙ্গে।’’ 

একটা সময়ের গলি ক্রিকেটের রাজা ছিলেন জিতেন্দ্র। বড় ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু এখন তার ধ্যানজ্ঞান ফুটবল। ভারতীয় রক্ষণের দুর্ভেদ্য প্রহরী জিতেন্দ্রই। একটা সময়ে মূলত আর্থিক দুরবস্থার কারণেই নিজের স্বপ্নকে বদলে ফেলতে বাধ্য হয়েছিলেন কলকাতার টালিগঞ্জের ছেলেটি। বাবা রবীন্দ্র সিংহ বিস্ত সামান্য নিরাপত্তারক্ষীর চাকরি করতেন। তাঁর সামান্য আয়ে ক্রিকেটের সরঞ্জাম কিনে প্র্যাক্টিস করার মতো সাধ্য ছিল না। দশ বছর বয়সে ডার্বি দেখতে গিয়েই ফুটবল নিয়ে স্বপ্ন দেখা শুরু করেছিল জিতেন্দ্র। এখন সেই স্বপ্নই মহীরুহ হয়ে উঠেছে। সূরজ বলছিলেন, ‘‘বিদেশের ক্লাবে খেলার স্বপ্ন দেখে ও। ইপিএল-এ খেলতে চায় জিতেন্দ্র।’’