দিল্লি ডেয়ারডেভিলসের বিরুদ্ধে কলকাতা নাইট রাইডার্সের ম্যাচ শুরু হওয়ার কথা রাত আটটায়। কিন্তু নাইটদের ম্যাচটা সম্ভবত শুরু হয়ে গিয়েছিল রবিবার সকাল থেকেই। যখন তাঁদের দুই কর্তা গোপনে হাজির হয়ে গিয়েছিলেন ইডেন গার্ডেন্সে। কিউরেটর সুজন মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে প্রায় আধ ঘণ্টা বৈঠকের পর তাঁকে পিচের ঘাস ছাঁটতে রাজি করান ওই দুই কর্তা। 

শনিবার যে পিচকে আউটফিল্ডের সঙ্গে আলাদা করা যাচ্ছিল না, রবিবার রাতে সেই উইকেটকে অনেকটাই ন্যাড়া দেখাল। জায়গায় জায়গায় সামান্য সবুজের আভা শুধু রয়ে গিয়েছিল। পেসার-অলরাউন্ডার আন্দ্রে রাসেলের সঙ্গে যে পিচে দাপট দেখালেন স্পিনার ব্র্যাড হগ-পীযূষ চাওলারাও। দিল্লির লোয়ার মিডল অর্ডার কেকেআরের স্পিন-জালে হাসফাঁস করল। প্রথমে ব্যাট করে কার্লোস ব্র্যাথওয়েটরা ১৭.৪ ওভারে শেষ হয়ে গেলেন মাত্র ৯৮ রানে। ইডেনে সর্বনিম্ন স্কোর।

নাইট শিবিরে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, শনিবার সন্ধ্যায় প্র্যাক্টিসের পর ইডেনের ড্রেসিংরুমেই টিম মিটিংয়ে বসে পড়েছিলেন গৌতম গম্ভীর-জাক কালিসরা। সেখানে সকলেই একমত হন যে, ঘাসের উইকেটে খেলা হলে বিপক্ষ ব্যাটিংকে ধাক্কা দেওয়ার মতো পেস-বোলিং শক্তি নাইটদের রয়েছে। কিন্তু প্রতিপক্ষ দলে জাহির খান-ক্রিস মরিসদের মতো পেসার থাকায় সবুজ পিচে কেকেআরের ব্যাটসম্যানরা পাল্টা চাপে পড়ে যেতে পারে। রাতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, কিউরেটরকে ঘাস ছাঁটার জন্য অনুরোধ করা হবে। দায়িত্ব দেওয়া হয় দলের ম্যানেজার অভিষেক সিংহ এবং আর এক কর্তাকে। শনিবার পর্যন্ত ঘাস না ছাঁটার ব্যাপারে কিউরেটর এতটাই অনড় ছিলেন যে, সিএবি-র এক কর্তাকে মধ্যস্থতা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
সেই মতো সকালেই ইডেনে হাজির হয়ে যান কেকেআরের প্রতিনিধিরা। অনেক বোঝানোর পর কিউরেটরকে ঘাস ছাঁটার ব্যাপারে রাজি করানো হয়। নিজেরা দাঁড়িয়ে থেকে ঘাস ছাঁটার কাজ তদারকি করেন কেকেআর কর্তারা। সুজন মুখোপাধ্যায় অবশ্য নাইট শিবিরের ঘাস ছাঁটার অনুরোধ নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে মাঠকর্মীদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, গোটা ঘটনায় বিরক্ত সুজন। তাঁকে চাপে রাখার জন্যই কি একপেশে ম্যাচ জেতার পরেও পিচ নিয়ে ক্ষোভের কথা শুনিয়ে গেলেন গম্ভীর? কেকেআর অধিনায়ক বললেন, ‘‘ঘরের মাঠে এই ধরনের পিচে খেলতে আমরা অভ্যস্ত নই।’’ পরে সাংবাদিক বৈঠকে চাওলাও একই কথা শুনিয়ে গেলেন। 
উদ্বেগ ছিল রাসেলকে নিয়েও। একে দেশে ফিরে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের উৎসবের রেশ। তার ওপর দীর্ঘ ষোলো ঘণ্টার বিমানযাত্রার ধকল-সহ রবিবারই কলকাতায় ফেরা। রাসেল মাঠে নেমে কীরকম পারফর্ম করবেন, তা নিয়ে অনেকেই সন্দিহান ছিলেন। কিন্তু দিল্লি ডেয়ারডেভিলসের বিরুদ্ধে রাসেল শুধু সফলই হলেন না, পেলেন ম্যাচের সেরার স্বীকৃতি। গম্ভীর তাঁর হাতেই তুলে দিলেন নতুন বল। এবং তিন ওভারের একটা স্পেলে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিয়ে চলে গেলেন রাসেলই। 

তিন ওভারের স্পেলে যিনি দিল্লির দুই ওপেনার মায়াঙ্ক অগ্রবাল ও কুইন্টন ডি’কক ছাড়াও তুলে নিলেন শ্রেয়স আইয়ারের উইকেট। রাসেলের দাপটে ৩১-৩ হয়ে গিয়েছিল দিল্লি। কেকেআর-এর হয়ে প্রথম ম্যাচ খেলতে নেমে বল হাতে নজর কাড়লেন অস্ট্রেলিয়ার পেসার জন হেস্টিংসও। মাত্র ছয় রান দিয়ে নিলেন দু’উইকেট। বাকি কাজটা সারলেন স্পিনাররা। হগ ও চাওলা ভাগাভাগি করে নিলেন বাকি পাঁচ উইকেট। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনালের চার ছক্কার নায়ক ব্র্যাথওয়েট শুরু করলেন চাওলার বল গ্যালারিতে ফেলে। কিন্তু ওই ওভারেই তিনি এলবিডব্লিউ হলেন। দিল্লি ইনিংসের ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্নেরও ওখানেই সলিলসমাধি। বাকি ম্যাচে পড়ে রইল ওপেনিং পার্টনারশিপে গম্ভীর ও রবিন উথাপ্পার সাবলীল ব্যাটিং। আর জয়ের লক্ষ্যে শাহরুখের নাইটদের হিসাব কষে এগিয়ে যাওয়া। ৩৫ বল বাকি থাকতে ন’উইকেটে ম্যাচ জিতল কেকেআর।

ম্যাচের সেরা রাসেল বললেন, ‘‘পিচ যেমনই হোক আমরা মানিয়ে নিতে পারি। সেখানেই তো পেশাদারিত্বের পরিচয় পাওয়া যায়। উইকেট দ্রুত গতির ছিল না। আবার স্লো-ও ছিল না।’’ তবে রাতের দিকে কিউরেটরকে যেরকম থমথমে মুখে মাঠ ছাড়তে দেখা গেল, তাতে মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের বিরুদ্ধে ম্যাচের প্রস্তুতিতে নেমে ফের না পিচ-ধাক্কা সামলাতে হয় নাইটদের।