সময়টা কম-বেশি ১৯২২ সাল। কালো কম্বল গায়ে জড়িয়েই ঋষিকেশের পথে-প্রান্তরে ঘুরে বেড়াতেন এক সাধক। নাম স্বামী বিশুদ্ধানন্দজী মহারাজ। তখন দেবভূমির রাস্তা-ঘাট বর্তমানের মতো এত মসৃণ ছিল না। আর না ছিল থাকা-খাওয়ার সুযোগ সুবিধা। তীর্থযাত্রীদের কষ্ট দেখে স্বামীজি এক পদক্ষেপ নেন। ভক্তদের মধ্যেই যাঁরা আর্থিক ভাবে সম্পন্ন ছিলেন, তাঁদের সাহায্য নিয়ে তৈরি করান ছোট ছোট ধর্মশালা। শুধু থাকার সুবিধাই নয়, এই সব জায়গায় সাধুদের খাবারদাবারেরও বন্দোবস্ত থাকত।

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

স্বামী বিশুদ্ধানন্দজী মহারাজের সেই কালো কম্বলের জন্যই তিনি সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত হন ‘কালী কম্বলিওয়ালে বাবা’ হিসেবে। 

পরবর্তীকালে, উত্তরাখণ্ডের বিভিন্ন জায়গায় গড়ে ওঠে ‘কালী কম্বলিওয়ালে বাবা ধর্মশালা’। মূলত, মারোয়াড়ি সম্প্রদায়ের মানুষই এই আশ্রমগুলি গড়ে তোলেন। 

এবার হরিদ্বারে গিয়ে এক রাতের জন্য ঘর নেওয়া হয়েছিল সেখানের কালী কম্বলি ধর্মশালায়। বাইরে থেকে দেখে বোঝা না গেলেও, দ্বিতল আশ্রমে অন্তত ৫০টি ঘর ছিল। আমাদের বুক করা দুটি ঘরের এক-একটিতে পাঁচজন অনায়াসেই শুতে পেরেছিলাম। 


হরিদ্বারের কালী কম্বলিওয়ালে বাবা ধর্মশালা। ছবি: শেলী মিত্র

ধর্মশালায় ঘরে খাওয়ার কোনও ব্যবস্থা নেই। রয়েছে আলাদা ডাইনিং প্লেস। আগে থেকে টোকেন নিয়ে রাখতে হয়। রাত ১০টার পরে গেলে খাবার পাওয়া যাবে না বলা হলেও, কাউকেই ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। 

নিরামিষ খাবার। ভাত-রুটি, ব্যবস্থা রয়েছে দুটোরই। টেবিলে গিয়ে খানিক অপেক্ষা করলেই গরম খাবার দিয়ে যাচ্ছে ধর্মশালায় কর্মরত অল্প বয়েসি ছেলেরা। প্রথম দফায় যা খাবার দেয় তাই খেয়ে শেষ করা মুশকিল। শেষ পাতে সাদা-দই। শর্ত একটাই, খাবার ফেলা চলবে না। যা না খাবে, আগেই তা বলে দিতে হবে। 

ব্রেকফাস্ট খেতেও সকাল সকাল সকলে মিলে পৌঁছে গিয়েছিলাম ‘ভোজনালয়’এ। এক প্লেট পুরি (৬ পিস), বা ২টো পরোটা, সঙ্গে সবজি, অথবা ব্রেড-বাটার। চা বা কফিও পাওয়া যায়। বললে লাল চাও দিয়ে দেবে। 

এই ট্রিপেই আরও এক জায়গার কালী কম্বলিওয়ালে ধর্মশালায় থাকার অভিজ্ঞতা হয়। জায়গার নাম পিপলকোঠি। যোশিমঠ যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু ধসের জন্য এগোতে পারেনি গাড়ি। রাত প্রায় ১১টা নাগাদ, এক দঙ্গল মহিলা গিয়ে উপস্থিত হই সেখানে। হরিদ্বারের তুলনায় বেশ ছোট পরিসর জায়গা নিয়ে তৈরি এই ধর্মশালাটি। কিন্তু ধাঁচটা একই রকম। চার কোণা দোতলা বিল্ডিং, মাঝখানে ফাঁকা জায়গা। 


পিপলকোঠির ধর্মশালা থেকে মেঘে ঢাকা দূরের পাহাড়ি গ্রাম। ছবি: শেলী মিত্র

দু’জন মানুষ ওতো রাতেও আমাদের আপ্যায়নে ত্রুটি রাখেননি। বিছানার চাদর পালটে পেতে দেন ধোয়া চাদর। পিপলকোঠিতে খাওয়াদাওয়ার সুযোগ হয়নি।

তবে, এখানকার আশ্রমের দেওয়ালে একটি বাঁধানো ছবি দেখে চোখ আটকে গিয়েছিল। আমরা যে দিকে ছিলাম, তার উল্টোদিকের দেওয়ালে। দূর থেকে দেখে মনে হয়েছিল ‘নেতাজির ছবি এখানে!’

কাছে গিয়ে দেখলাম সেটাই কালী কম্বলিওয়ালে বাবা। কী অদ্ভুত মিল চেহারার!

মনে পড়ে গেল গুমনামী বাবার কথা। যাঁর সঙ্গেও নেতাজির চেহারার মিল পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু সঠিকভাবে প্রমাণ কিছুই হয়নি। তা হলে কি...!