প্রতি বছর অন্তত ২০০০ মৃত্যু। ২০০৫ সাল থেকে বজ্রপাতে ভারতে প্রাণহানির পরিসংখ্যান তাই বলছে। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর তথ্য তুলে ধরে একটি প্রতিবেদনে এমনই দাবি করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি। সরকারি হিসেবই বলছে, অন্য কোনও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের তুলনায় প্রতি বছর এ দেশে বজ্রপাতে বেশি মৃত্যু হয়।

কলকাতার মাঠে ক্রিকেট প্র্যাক্টিস করতে করতে বজ্রপাতে বছর একুশের তরতাজা যুবক দেবব্রত পালের মৃত্যু দুঃখজনক। কিন্তু ব্যতিক্রম নয়। মঙ্গলবারও রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বাজ পড়ে দশ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

বাজ তাই ক্রমশই মানুষের কাছে আতঙ্কের কারণ হয়ে যাচ্ছে। ঝড়-বৃষ্টি হলেই যেন নিয়ম করে ঘটছে প্রাণহানির সংখ্যা।

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

ঝড়, বৃষ্টির সময়ে অনেককেই খোলা আকাশের নীচে থাকতে হয়। বাজের ‘মৃত্যুছোবল’ থেকে কীভাবে রক্ষা পাবেন তাঁরা?

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বা সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুযায়ী, বাজ থেকে বাঁচার সবথেকে নিরাপদ উপায় কোনও বাড়ি বা বহুতলের মধ্যে আশ্রয় নেওয়া। এমনকী গাড়ির ভিতরে থাকাও নিরাপদ। কিন্তু কোনওভাবেই গাছের নীচে আশ্রয় নেবেন না। যেহেতু জল বিদ্যুতের সুপরিবাহক, তাই পুকুর বা জলের মধ্যে থাকলেও দ্রুত উঠে আসতে হবে।

বাজ থেকে বাঁচার উপায়, দেখুন গ্রাফিক্সে

গ্রাফিক্স- অভিজিৎ বিশ্বাস

সায়েন্সডেইলি ডট কমে প্রকাশিত একটি রিপোর্টে এক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক জানিয়েছেন, সাধারণত ঝড়, বৃষ্টির শুরুর দিকেই বাজ পড়ে। ফলে, সেই সময়টা সতর্ক থাকা অত্যন্ত জরুরি। 

তবে বাড়ি বা কোনও ভবনের ভিতরে থাকলেও কিছু সতর্কতা অবলম্বনের কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। যেমন বাড়ির ভিতরে থাকলেও বাজ পডার সময়ে কোনও তার যুক্ত ফোন, ইলেক্ট্রনিক অ্যাপলায়েন্সের ব্যবহার, হাত ধোয়া, স্নান করা, বাসন ধোয়া এমনকী বাথরুমের কল বা অন্য ধাতব জিনিসও ব্যবহার করতে নিষেধ করছেন বিশেষজ্ঞরা। বাজ পড়ার সময়ে দরজা, জানলা বা চিলেকোঠার ঘর থেকেও দূরে থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এমনকী কংক্রিটের দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়ানো বা মেঝেতে শুয়ে থাকতেও নিষেধ করা হচ্ছে। 

কিন্তু দুর্যোগের সময় তো সবার পক্ষে এমন কোনও আশ্রয় পাওয়া সম্ভব নাও হতে পারে। সেক্ষেত্রে মানুষ কী করবেন? বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, বাইরে বা খোলা জায়গায় থাকলেও এমন ভাবে মাটিতে কুঁকড়ে বসতে হবে যাতে শরীরের সঙ্গে মাটির সংযোগ ন্যূনতম হয়। বসার সময়ে গোড়ালি পরস্পরকে ছুঁয়ে থাকতে হবে (গ্রাফিক্সে দেখুন)। এর ফলে বিদ্যুৎ তরঙ্গ শরীরে ঢুকলেও তা উপরের দিকে উঠতে পারবে না। এক পা দিয়ে উঠে অন্য পা দিয়ে তা বেরিয়ে যাবে। এর ফলে হৃদযন্ত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা হ্রাস পায়।

বাজ পড়লে ফাঁকা জায়গায় কীভাবে বসা উচিত, দেখুন ভিডিও

 

এর বিরুদ্ধ মতও অবশ্য রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট-এ আমেরিকার বজ্রপাত বিশেষজ্ঞ জন জেনসেনিয়াস দাবি করেন, খোলা জায়গায় মাটিতে কুঁকড়ে বসে থাকলেও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়ার কোনও নিশ্চয়তা নেই। বাড়ি বা গাড়ির মধ্যে আশ্রয় নেওয়াই সবথেকে নিরাপদ।

আমেরিকার আপতকালীন পরিস্থিতি সামলানোর দায়িত্বে থাকা সংস্থা ‘ফেমা’-র এক সদস্যের পরামর্শ, দুর্যোগের সময়ে শেষ বার যখন বাজ পড়ার শব্দ পাওয়া যাবে, তার অন্তত আধ ঘণ্টা পরে বাইরে বেরনো উচিত।

কীভাবে বোঝা যাবে বাজ পড়ে কেউ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়েছেন কিনা? চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, সাধারণত আক্রান্তদের শরীরের বিভিন্ন অংশে পুড়ে যাওয়ার চিহ্ন থাকে। এমনকী পোশাকও জ্বলে যেতে পারে। বাজ পড়ে মূলত মানুষ কার্ডিয়াক বা রেসপিরেটরি অ্যারেস্ট হয়ে মারা যান বলেই জানাচ্ছেন চিকিৎসকরা। ফলে কেউ বাজ পড়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলে সঙ্গে সঙ্গে তাঁর নাড়িস্পন্দন পরীক্ষা করে কৃত্রিমভাবে শ্বাসপ্রশ্বাস চালু করার চেষ্টা করতে হবে। 

আতঙ্কের কারণ অবশ্য আরও রয়েছে। তার জন্য অবশ্য মানুষই অনেকটা দায়ী। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান বিষয়ক পত্রিকা সায়েন্স-এ প্রকাশিত একটি গবেষণা রিপোর্টে দাবি করা হয়, আগামী দিনে বিশ্ব উষ্ণায়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়বে বজ্রপাতের সংখ্যাও। পৃথিবীর তাপমাত্রা এক ডিগ্রি বৃদ্ধি পেলে বাজ পড়ার সম্ভাবনা ১২ শতাংশ হারে বেড়ে যাবে।