এক রবিবারের ভোর সাড়ে তিনটে। গঙ্গাবক্ষে ভেসে বেড়াচ্ছি। ‘কলকাতা পোর্ট ট্রাস্ট’ (কেওপিটি) আয়োজিত নদীবক্ষে হেরিটেজ ট্যুরের অংশ হয়ে আমার সঙ্গে তখন ছিলেন আরও ২১ জন।

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

প্রিন্সেপ ঘাট থেকে খানিক এগিয়ে, একটি ‘বিশেষ’ জেটিতে দাঁড়িয়ে ছিল সুসজ্জিত একটি লঞ্চ। শুধু এই ২২জন নিশাচরের জন্য। লঞ্চের অর্ধেকটা খোলা ডেক, বাকিটাতে কনফারেন্স রুম। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত। ঘরের এক দিকে রাখা প্রজেক্টর। সামনে দুই সারিতে আরামদায়ক থ্রি-সিটার সোফা। কাচের ঘরের পরদা সরালেই কালো টলটলে জল চারপাশে। 

তিনটে নাগাদ ভেসে পড়ল কেওপিটি-র ‘সিল্যান্ড’। সঙ্গে সঙ্গেই মাইক ধরলেন গৌতম চক্রবর্তী, কেওপিটি-র সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার। যাঁর প্রচেষ্টাতেই আয়োজিত হয়েছিল এমন অভিনব এক রাত্রিযাপন। তাঁর যোগ্য সঙ্গত করেছিলেন পার্থসারথি মজুমদার। সকাল প্রায় ছ’টা পর্যন্ত।


মেরিটাইম হেরিটেজ সেন্টার-এর অন্দরে।

স্ট্র্যান্ড রোডে কেওপিটি-র ‘মেরিটাইম হেরিটেজ সেন্টার’ বর্তমানে খুলে দেওয়া হয়েছে সাধারণ মানুষের জন্য। ২০০৯ সাল থেকেই এমন ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু কিছুটা অবস্থানের জন্যই এই যেন মিউজিয়াম লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে গিয়েছে। 

স্পেশাল পারমিট নিয়ে সেই রাতে প্রায় দুটো নাগাদ, ২২ জনের দল পৌঁছেছিলাম সেই জাদুঘরে। আধ ঘণ্টার একটি ছোট্ট সেশনে কলকাতা বন্দর ও তার ইতিহাস সম্পর্কে অনেক তথ্য দিয়েছিলেন সরকার স্বীকৃত গাইড পার্থসারথী মজুমদার।


মেরিটাইম হেরিটেজ সেন্টার-এ রাখা বন্দর ও জাহাজ সম্পর্কিত নানা বস্তু।

সেখান থেকেই আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল মধ্যরাতের লঞ্চ ভ্রমণে। জলবিহারের যাত্রা শুরু হয় প্রিন্সেপ ঘাটের পরেই ম্যান ও’ ওয়ার ঘাট থেকে। তার পর একে একে বাবুঘাট, গ্বালিয়র ঘাট, আর্মেনিয়ান ঘাট, চাঁদপাল, জগন্নাথ— প্রত্যেকটি ঘাটের ইতিহাস সংক্ষেপে শুনতে শুনতে এক সময় বুঝলাম লঞ্চ ইউ-টার্ন নিচ্ছে। একটু মন খারাপ হয়ে গেল যে, এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল!

কিন্তু নাহ্! আরও ‘সারপ্রাইজ’ তখনও বাকি ছিল। 

নদীতে তখন ‘বোর টাইড’ চলছে বলে যাওয়ার সময়ে খুব তাড়াতাড়ি ভেসে গিয়েছিল ‘সিল্যান্ড’। কিন্তু ফিরতি পথে তার গতি খানিক শ্লথ হয়ে যায়। ভাগ্যিস! না হলে, ভোর প্রায় সাড়ে তিনটের সময় হাওড়া ব্রিজের এ হেন রূপ দেখতে পেতাম না।

অন্ধকারে হঠাতই আকাশে ফুটে উঠল আলোকিত হাওড়া ব্রিজ। ঠান্ডা ঘরের আকর্ষণকে তুচ্ছ করে সকলেই বেরিয়ে এল ডেকের উপরে। খুব ধীরে সেই লৌহ-দানবের নীচ দিয়ে ভেসে চলে গেলাম খিদিরপুর ডকের দিকে।


ইনডেঞ্চার মেমোরিয়াল

ভোর প্রায় সাড়ে পাঁচটা। আমাদের তরী গিয়ে ভিড়ল খিদিরপুরের ‘ইনডেঞ্চার মেমোরিয়াল’-এর ঘাটে। এক সময় এখান থেকেই ভারতীয়দের পাঠানো হতো বিভিন্ন দেশে, চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক হিসেবে। প্রসঙ্গত, এমনই একটি স্মারক স্তম্ভ রয়েছে সুরিনাম ঘাটেও। 

এতদিন পর্যন্ত কলকাতার পথে পথে, তস্য গলিতে পায়ে হাঁটিয়ে, এ শহরের অনেক গল্প শুনিয়েছেন অভিজিৎ ধরচৌধুরী। মূলত কলকাতা ও শহরতলির বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজো দিয়ে তিনি শুরু করেছিলেন তাঁর ‘হেরিটেজ ওয়াক’। তার পরে সম্পূর্ণ নিজের প্রচেষ্টায় বনেদি বাড়ির আঙিনা পেরিয়ে পরিধি বিস্তার করেন হেরিটেজ দুনিয়ায়।

কলকাতায় বসবাসকারী নানা পরিবার, তাঁদের ইতিহাস, কোন বাড়িতে পদধূলি পড়েছিল ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের, রসগোল্লার সৃষ্টিকর্তার বাড়ি, কার বাড়িতে রয়েছে এক প্রকাণ্ড ঝাড়বাতি, কোথায় রয়েছে বর্মার বৌদ্ধ মনাস্টারি— এমন নানা তথ্যের আকর যেন ‘কলকাতা এক্সপ্লোরার্স’ সংস্থার অভিজিৎ ধরচৌধুরী


শিয়ালদহ ফুটব্রিজ থেকে রাতের শহর।

এবার এক ধাপে অনেকটাই এগিয়ে গেলেন তিনি। কেওপিটি-র সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে তিনি উদ্যোগ নিয়েছিলেন কলকাতা ও তার চারপাশের জলপথ সম্পর্কে নানা গল্প বলতে। 

ভাগীরথী থেকে গঙ্গা হয়ে কোথায় এসে সে হয়ে যায় হুগলি নদী, তার শাখা-প্রশাখা, বর্তমানে কতগুলি ঘাট রয়েছে কলকাতায়, নদী বন্দর— এমন ঝুড়ি ঝুড়ি তথ্যের মাঝেই কেটে গিয়েছিল সারা রাত। 

কলকাতার প্রতিষ্ঠাতা জোব চার্নক কোন পথে এসে নোঙর ফেলেছিলেন এ শহরে, বৈঠকখানা বাজারের সঙ্গে কী সম্পর্ক ছিল চার্নকের... প্রশ্ন আর তার উত্তরে মাথা গজ গজ করছিল এক সময়ে। 


মেঘের আড়াল থেকে... 

কিন্তু ভ্যাপসা গরমে, সারা রাত জেগে এমন ইতিহাস শুনতে যে ঠিক কেমন লাগছিল তা জিজ্ঞাসা না করলেও অভিব্যক্তি স্পষ্টই ফুটে উঠেছিল সকলের মুখে। ট্যুর শেষে অনেকের মুখেই শুনেছিলাম ‘সুযোগ হলে আবার আসব’!

আপাতত সে গুড়ে বালি। কারণ, বর্ষার জন্য এই হেরিটেজ ট্যুর কয়েক মাস বন্ধ থাকবে। শুরু হবে অক্টোবর মাসে। কারণ, সরকারি ভাবে কেওপিটি-র জন্মদিন ওই মাসের ১৭ তারিখ, জানালেন গৌতম চক্রবর্তী।

ছবি: শেলী মিত্র