দারিদ্র তাঁর নিত্য সঙ্গী। বাবা বরুণ চন্দ্র দাস ভদ্রেশ্বরের চটকলে সামান্য মাইনের চাকরি করতেন। ত্রিবেণীর শিবপুর গাঁধী কলোনিতে টালির চালের বাড়ি। লিলি দাসের দু’বেলা পেট ভরে খাওয়াও হতো না সব সময়।

অ্যাথলেটিক্স ট্র্যাকে সেই ১৯ বছরের লিলি’ই সকলের নজর কেড়ে নিয়েছেন। সিনিয়র মহিলাদের ১৫০০ মিটারে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন। যুব বিভাগে ১৫০০ ও ৮০০ মিটারে দেশের দ্রুততম। প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে লিলি এখন স্বপ্ন দেখছেন ২০২০ সালে টোকিও অলিম্পিক্সে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার।

সল্ট লেকে স্পোর্টস অথরিটি অফ ইন্ডিয়ার (সাই) ক্যাম্পাসে প্রস্তুতি নিচ্ছেন প্রতিশ্রুতিমান অ্যাথলিট। প্র্যাক্টিসের ফাঁকে লিলি বলছিলেন, ‘‘স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়ায় আমার দৌড় দেখে ভাল লেগে গিয়েছিল স্থানীয় কোচ রথীন দাসের। তিনিই আমার বাবা-মা’কে বুঝিয়ে ত্রিবেণী স্পোর্টিং ক্লাবে আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন।’’ কিন্তু অভাবী পরিবারে আধুনিক মানের রানিং শ্যু কেনার সামর্থ ছিল না। চটকল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লিলি’র বাবা তখন কর্মহীন। লিলি বলছেন, ‘‘আমার অ্যাথলেটিক্সে আসার ব্যাপারে বাবা প্রথমে রাজি ছিলেন না। মা নিজের সমস্ত সঞ্চয়ের টাকা খরচ করে আমাকে জুতো কিনে দিয়েছিলেন।’’

কিন্তু তার পরেও বিপত্তি। রান্নাঘরে ফুটন্ত ডাল পড়ে গিয়েছিল শরীরে। যন্ত্রণায় ছটফট করেছিলেন। লিলির ট্র্যাকে ফেরা নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছিল। কিন্তু প্রত্যাবর্তন ঘটিয়েছিলেন লিলি। ডান কাঁধে এখনও পুড়ে যাওয়ার ক্ষত। অনটনের জন্য পুরনো জুতো সেলাই করিয়ে তা পরেই দৌড়তেন। পুরস্কার অর্থ জমিয়ে রাখতেন খেলাধুলোর খরচ চালানোর জন্য।

২০১১ সালে রাজ্য জুনিয়র মিটে ৬০০ মিটারে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর তাঁকে সাই-এর শিবিরে প্র্যাক্টিসের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন শৈশবের কোচ রথীন। সেখানে কল্যাণ চৌধুরীর প্রশিক্ষণে নতুন অভিযান। সে বছরই রাঁচিতে জাতীয় জুনিয়র মিটে ৬০০ মিটারে সোনা জেতেন। লিলি বলছেন, ‘‘সাই-এ প্র্যাক্টিস শুরু করলেও থাকার সুযোগ পাইনি তখন। ত্রিবেণী থেকে সল্ট লেকে যাতায়াত করতাম। ভাল পারফরম্যান্সের জন্য পরের বছর সাই হোস্টেলে থাকার ব্যবস্থা হয়।’’

২০১৫ সালে সিনিয়র জাতীয় অ্যাথলেটিক্সে ১৫০০ মিটারে ব্রোঞ্জ জিতেছিলেন লিলি। সে বছরই দোহায় প্রথম আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় নামার সুযোগ। কিন্তু পাসপোর্ট না থাকায় যাওয়া হয়নি। দেশের মাটিতে যুব ফেডারেশন কাপে ৪.২০.৩১ মিনিটে ১৫০০ মিটার দৌড়ে রেকর্ড করেন। পরে ভিয়েতনামে যুব এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে ৮০০ ও ১৫০০ মিটারে সোনা। পোল্যান্ডে বিশ্ব জুনিয়র মিটে দেখা হয়েছিল পি টি ঊষার সঙ্গে।

‘‘ঊষা ম্যাডাম বলেছিলেন, জীবনে যত প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে, ট্র্যাকে দৌড়নোর সময় সেগুলো মনে রেখো। তাহলেই সেরাটা বেরিয়ে আসবে,’’ বলছিলেন লিলি। যোগ করলেন, ‘‘টোকিও অলিম্পিক্সে পদক জিতলে তবেই মনে করব জীবনযুদ্ধে সফল হয়েছি।’’