১৯৮৭-র কলকাতা। একটি ভিনদেশি ছবির শ্যুটিং নিয়ে খবরের কাগজে তোলপাড় খবর। বাঙালির মান-সম্ভ্রম নিয়ে টানাটানি? নাকি তার চাইতেও ঘোরতর কিছু? গেল গেল রব উঠেছিল সেই ছবি নিয়ে। শহরবাসীর কৌতূহলের পারদ তুঙ্গে।

সেই বছরেই আম বাঙালি জানতে পারে, মির্চা এলিয়াদের নাম। জানতে পারে, বরেণ্য লেখিকা মৈত্রেয়ী দেবীর অসামান্য লিখন ‘ন হন্যতে’-র পশ্চাদভূমির কথা। সেই সঙ্গে এ-ও জানতে পারে, সব কথা নাকি সেখানে লেখা ছিল না। কী হয় কী হয় কী জানি কী হয়-মার্কা একটা মনোভাব নিয়ে সকলেই অপেক্ষা করতে থাকেন কবে রিলিজ হয় ‘লা নুই বেঙ্গলি’।

না একবার মাত্র ফেস্টিভ্যালে দেখানোর পরে সেই ছবি আর প্রদর্শিত হয়নি এদেশে। ফরাসি ভাষায় তোলা সেই ছবির পরিচালক ছিলেন নিকোলাস ক্লোৎজ। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, শাবানা আজমি, সুপ্রিয়া পাঠকের সঙ্গে নায়ক হিসেবে যিনি ছিলেন, সেই সাহেব অভিনেতাকে তখন কেউ চিনতেন না। হিউ গ্রান্ট নামক ব্রিটিশ অভিনেতাটির তখনও খ্যাতি পেতে বছর দেরি রয়েছে।

‘লা নুই বেঙ্গলি’-র কাহিনিতে নায়কের নাম অ্যালান, সে কলকাতায় এসে প্রেমে পড়ে গায়ত্রী নামের এক বাঙালি মেয়ের। তার সেই প্রেমের কথা জানাজানি হতেই মধ্যবিত্ত বাঙালি পারিবারিক ইথোজ-এ যে ঝড় শুরু হয়, তা-ই এই ছবির উপজীব্য। মির্চা এলিয়াদের লেখা এই কাহিনি আত্মজৈবনিক। কিন্তু তার আগে মৈত্রেয়ী দেবীর রচনায় যে ভার্সনটি পাওয়া গিয়েছিল, তার সঙ্গে এ কাহিনির মিল অতি সামান্যই। ওদিকে গ্রন্থ প্রকাশের বছরেই মির্চা দেহান্তরিত হয়েছেন। সমস্যা দেখে দিলে অভিযোগ কার দিকে যাবে, তা নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত মৈত্রেয়ী দেবী ব্যক্তিগত বিষয়কে জনসমক্ষে আনার ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। মির্চার রচনাকে সিনেমায়িত করার অনুমতি প্রদানের জন্য তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন মির্চার বিধবা পত্নী ক্রিশ্চিনেলের প্রতি। ব্যাপারটি শেষমেশ আদালত পর্যন্ত গড়ায়। মৈত্রেয়ী দেবীর বক্তব্য ছিল— মির্চা তাঁকে কথা দিয়েছেলেন, তাঁর জীবদ্দশায় এই বই কখনওই ইংরেজিতে প্রকাসিত হবে না। এখন তা ইংরেজি সিনেমা হতে চলেছে। ফলত, ব্যক্তিগত পরিসরকে বাইরে নিয়ে আসা হচ্ছে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে। মৈত্রেয়ী দেবী অভিযোগ আনেন প্রযোজক ফিলিপ দিয়াজের বিরুদ্ধে। দাবি করেন এই ছবির বিষয়বস্তু হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মনে আঘাত আনতে পারে এবং এই ছবি কোনও কোনও জায়গায় পর্নোগ্রাফিক।

তুঙ্গে ওঠে বিতর্ক। অনেকেই চাননি ছবিটি নিষিদ্ধ হোক। সত্যজিত রায়ও ছবির সপক্ষেই ছিলেন। কিন্তু সে ছবি কোনও দিনই এ দেশের পাবলিক-প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হয়নি। আজ অবশ্য সেই ছবি ইউটিউবে লভ্য। এক ক্লিকেই দেখে নেওয়া যায়। কিন্তু দেখা যায় না হিউ গ্রান্ট নামক সুপার স্টারের স্মৃতিরেখাকে, দেখা যায় না মির্চা এলিয়াদ নামক এক প্রেমিক নায়ককে। গত তিন দশকের বিস্মরণ-অভ্যাসে তাঁরা কোথাও ধূসরতর হয়ে রয়েছেন।

হাতে সময় থাকলে দেখে নিতে পারেন সেই ছবি—