তাঁরা সব আজ গেলেন কোথায়?

একসময়ে যাঁদের নাম শুনলে উত্তাল হত কলকাতা ময়দান, ডার্বি ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিত যাঁদের দু-দুটো পা, ঘটি-বাঙালের ঘরে ঘরে যাঁদের নাম শোনা গেলেই উলুধ্বনির শব্দ ভেসে আসত, তাঁদের ঠিকানা এখন আর কেউ জানেন না।

খোঁজ পর্যন্ত রাখেন না কেউ। তাঁরা যেন মার্কেজের সেই কর্নেল, যাঁকে আজ আর কেউ চিঠি লেখেন না।

তাঁরা আজ সত্যিই হারিয়ে গিয়েছেন এই বঙ্গের ফুটবলপাগলদের স্মৃতি থেকে। এখন আর উগা ওপারার নামে গগনেভদি সেই ‘উ-গা-উ-গা’ সিংহনাদ শোনা যায় না।


চিডি

বাঙালির চির আবেগের ম্যাচের আগের দিন দুই প্রধানের তাঁবুর সামনে কান পাতলে অবধারিত ভাবে শোনা যেত, ‘এ বি সি ডি, গোল করবে চিডি’। সেই চিডি এখন কোথায়?

খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। তখন আই লিগের ভরা মরসুম। মোহনবাগান কোচ সঞ্জয় সেন অবজ্ঞা ভরে সাংবাদিক বৈঠকে প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, ‘এডে চিডি বলে একজন ফুটবলার ছিল। সে এখন কোথায় খেলে কেউ জানেন?’

ভুল কিছু বলেনননি তিনি। চিডি হারিয়ে গিয়েছেন। আর তিনি, পেন অর্জিকে নিয়ে তো একসময় অজস্র কালি খরচ হয়েছে সংবাদমাধ্যমে। সেই সময় শিরোনামও হয়েছিল, পেন দিয়ে ডেম্পোর শোকগাথা লিখল ইস্টবেঙ্গল। এই ত্রয়ীর আজ আর দেখা নেই ময়দানে। হয়তো চিরতরে মুছে গিয়েছেন। ভবিষ্যতের কথা কে আর বলতে পারে! তবে ঘটনাপ্রবাহ যে দিকে গড়াচ্ছে, তাতে তাঁদের ফিরে আসার পথ যে এখন আর নেই। সবাই এখন অস্তাচলে।

টাইমমেশিনের সাহায্যে বছর কয়েক পিছিয়ে যান। নাইজিরীয় চিডির পা-তেই তো শাপমুক্তি ঘটেছিল গঙ্গাপারের ক্লাবের। আজ থেকে বছর চল্লিশ আগে এক শিল্ড ফাইনালে লাল-হলুদের কাছে পাঁচ গোল হজম করার পর বাগান-অন্ত-প্রাণ উমাকান্ত পালধি শোকে, দুঃখে, লজ্জায় আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন। ২০০৯-এর ২৫ অক্টোবর চিডিকে সেই বিষণ্ণ ইতিহাসের কথা কেউ শুনিয়েছিলেন কি না জানা নেই। সেদিন, অর্থাৎ ২৫ অক্টোবরের পড়ন্ত বিকেলে চিডি শোধ তুললেন বাঙালির বড় প্রিয় যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে। ইস্টবেঙ্গলের জালে নিজে চার-চার বার বল জড়ালেন।

মোহনবাগান সাকুল্যে দিল পাঁচ গোল। ইতিহাসের চাকা না কি ঘুরল সত্যি সত্যি। গ্যালারিতে সুনামির মতো আছড়ে পড়ল পাঁচ-পাঁচ শব্দব্রহ্ম। কেউ দেখাচ্ছেন পাঞ্জা। কেউ বা মুষ্টিবদ্ধ হাত ছুড়েই চলেছেন শূন্যে। নব্বই মিনিটের সেই ম্যাচের পরই তো অমর হয়ে যাওয়ার কথা ছিল চিডির। কিন্তু সে সব তো হলই না। বেসুরে বাজল সব। পৃথিবী চলে তার নিজের নিয়মে।

পরের বছরই চিডিকে ছুড়ে ফেলে দিলেন বাগানকর্তারা।কাঁদতে কাঁদতে সবুজ-মেরুন তাঁবু ছেড়ে চিডি বেরিয়ে গেলেন। কর্তাদের এহেন সিদ্ধান্ত নিন্দিত হল খুব। তাতে অবশ্য মোহনবাগান কর্তাদের গদি টলল না। ভাগ্য বিড়ম্বিত চিডি কলকাতা ছেড়ে পাড়ি জমালেন গোয়ায়। সেখান থেকে পরে ইস্টবেঙ্গলে। একসময়ে যে ক্লাবকে লজ্জার সাগরে ডুবিয়ে দিয়েছিলেন, সেই ক্লাবই তাঁকে জামাই আদর করে ডেকে আনল। লাল-হলুদ জার্সি পিঠে চাপিয়ে চিডি আপেল চাষ করতে না-পারলেও, মোটের উপর সফলই ছিলেন। সাহেব কোচ ট্রেভর জেমস মর্গ্যান-জমানা তখন ইস্টবেঙ্গলে।

চিডিকে বর্শার ফলা করে ভারতজয়ের স্বপ্নে বিভোর লাল-হলুদ কোচ। ফেডারেশন কাপ জিতে ইস্টবেঙ্গলকে ভারতসেরাও করেন তিনি। তার পর? বিধি যে বাম!লাল-হলুদ কর্তারা তাঁকে আর রাখলেনই না। বাতিলের তালিকায় ফেলে দেওয়া হল চিডিকে। মনের দুঃখে দেশে ফিরে গেলেন তিনি। তারপর থেকে তাঁর খবর আর কেউ রাখেন না। তাঁর নামও খবরের কাগজের পাতায় জায়গা পায় না। ইস্ট-মোহন কর্তারা বোধহয় ভুলেই গিয়েছেন তাঁকে। গুগল সার্চ ইঞ্জিনে চিডির নাম টাইপ করার সঙ্গে সঙ্গে ফুটে ওঠে কোনও এক অজ্ঞাতকুলশীল মালয়েশিয়ান ক্লাবের নাম। ফেলে আসা দিনের কথা জানতে চাইলে মৌনব্রত নেন অভিমানী নাইজেরীয়। মৌনতা কিন্তু অনেক কথাই বলে!


ওপারা

ওপারা ভাগ্যবিড়ম্বিত একজন। ২০০৯ সালে সুদূর নাইজিরিয়া থেকে ভারতে এসেছিলেন ইস্টবেঙ্গলে খেলার জন্য। চার বছর চুটিয়ে সামলান লাল-হলুদ রক্ষণভাগ। আই লিগ ছাড়া সবই ট্রফিই পকেটস্থ করেছিলেন তিনি। তারপর কী হল কে জানে! আর্মান্দো কোলাসোর হাতে তখন লাল-হলুদের রিমোট কন্ট্রোল। হঠাৎই চোট পেয়ে বসলেন ওপারা। সেই যে চোটের কবলে পড়লেন, আর সেরে উঠলেন না। ইস্টবেঙ্গল কর্তারা আগেভাগে স্থির করে ফেলেছিলেন মাস্টার প্ল্যান।নাইজিরীয় ডিফেন্ডারকে আর রাখা হবে না। যেমন ভাবা ঠিক তেমন কাজ। মুখোমুখি সাক্ষাতে কর্তারা জানালেন, নতুন মরসুমেও তাঁরা রাখতে চান ওপারাকে। কিন্তু চোট সারিয়ে ফিরতে হবে। ওপারা রাজি। চোটমুক্ত হওয়ার জন্য দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়ে অনুশীলন করবেন বলে পরিকল্পনাও ছকে ফেললেন। কিন্তু দেশে ফিরেই জানতে পারলেন, কলকাতা থেকে যা শুনে গিয়েছিলেন, তা ছিল সত্যের অন্য পিঠ। ইস্টবেঙ্গল কর্তাদের অভিসন্ধি বুঝতে পেরে নীরবে চোখের জল ফেলেন নাইজিরীয় ডিফেন্ডার। সেই জল দেখতে পেলেন না কেউ। তারপর বহু ক্লাব তাঁর সঙ্গে কথা এগিয়েও শেষে আর সই করায়নি। ক্লাব না-পেয়ে বাধ্য হয়ে কলকাতা লিগের জন্য টালিগঞ্জ অগ্রগামীতে সই করেন তিনি। ভাল সার্ভিস দিতে পারেননি। নিজের ছায়ায় ঢাকা ছিলেন। কোথায় গেল আগের সেই ঝলক? সেই দিন তিনি তো ফেলে এসেছেন বহু আগেই। টালিগঞ্জে খেলার সময়তেই স্বপ্ন দেখতেন আই লিগে নামবেন। গলায় ঝরে পড়ত আত্মবিশ্বাস। তার পর সবার অজান্তে ফিরে গেলেন নাইজিরিয়াতেই। সেই স্বপ্ন আর সফল হল কোথায় ওপারার!


পেন

পেন অর্জিরও একই হাল। বলা হয়, ইস্টবেঙ্গল ছেড়ে চলে যাওয়ার পর পেনের কালি না কি শেষ হয়ে গিয়েছে। অথচ একসময় তো বিপক্ষের রক্ষণভাগের ঘুম কেড়ে নিতেন তিনি। মাঝমাঠের ব্রিগেডিয়ার ছিলেন।আইএসএল-এর প্রথম সংস্করণে সচিন তেন্ডুলকরের কেরল ব্লাস্টার্সের হয়ে খেললেও কেউ তো আর বললেন না, ‘পেন ইজ মাইটিয়ার দ্যান দ্য সোর্ড’।

খুব বেশিদিন আগের কথা নয়।এই ত্রয়ীই তো লাল-হলুদে একসময় মশাল জ্বালতেন। তাঁদের সামনে রেখে ঘুঁটি সাজানো হত। সমর্থকদের মুখে মুখে ফিরতেন তাঁরা। ক্লাবের মুখ হয়ে উঠেছিলেন। সময়ের নিয়মে তাঁরাই এখন বড় ক্লাবে ব্রাত্য। ব্রাত্যজনের সেই সঙ্গীত কি আর কেউ শোনেন?