এক কর্মকর্তা চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে যুবকটির গালে কষিয়ে মারলেন এক থাপ্পড়! ‘‘তোমার বাবা মনমোহনবাবু এই ক্লাবের জন্য এত কিছু করেছেন, আর তুমি ইস্টবেঙ্গলে খেলতে যাচ্ছ? বিরাট প্লেয়ার হয়ে গিয়েছ না!’’

সাহসী যুবক কিছুটা হতচকিত। বয়স তখন বছর কুড়ি-একুশ হবে। শ্যামবাজার স্পোর্টিং, বউবাজারের মতো ক্লাবে খেলে নামডাকও হয়েছে খানিক। নিজেরই মনে হয়েছিল, এবার মোহনবাগানে খেলবেন তিনি। যেমন ভাবা তেমন কাজ। সরাসরি নিজেই চলে গেলেন ক্লাব তাঁবুতে।

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

সেটা ১৯৩০ সাল। মোহনবাগান তাঁবুতে তখন বসে গোষ্ঠ পাল, উমাপতি কুমার এবং কয়েক জন কর্মকর্তা। যুবকটি তাঁদের জানালেন নিজের মনোবাঞ্ছার কথা। যুবকটিকে তাঁরা চেনেন, তার খেলার কথাও সামান্য শুনেছেন। কিন্তু সেই প্রস্তাবে তাঁরা বিশেষ উত্তেজিত না হয়ে স্বাভাবিক স্বরেই বললেন, ‘‘বেশ, তাহলে তো তোমাকে পাওয়ার লিগ খেলে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে।’’ যুবকটির সাফ জবাব, ‘‘না, আমি পাওয়ার লিগ খেলব না।’’


১৯১১ সালে শিল্ডজয়ী মোহনবাগান দলের জার্সি। নিজস্ব চিত্র

পাওয়ার লিগ ছিল সেই সময়ে বিভিন্ন ক্লাবের জুনিয়রদের লিগ। সেই দলে সিনিয়র টিমের ৬ জনকে খেলানো যেত। এই লিগে খেলা দেখেই সাধারণত সিনিয়র দলের জন্য খেলোয়াড় মনোনীত করার চল ছিল। কর্মকর্তারা যুবকটিকে জানালেন, পাওয়ার লিগ না খেলে দলে ঢোকা সম্ভব নয়। কারণ তা আইনবিরুদ্ধ তো বটেই, উপরন্তু এ ছাড়া তাঁর খেলোয়াড়ি দক্ষতার যথাযথ বিচার করাও কার্যত অসম্ভব।

কিন্তু যুবকটি নিজের অবস্থানে অনড়। পাওয়ার লিগ খেলার কোনও প্রশ্নই নেই! মোহনবাগান ক্লাবের চূড়ান্ত ‘না’ শুনে তিনি বেরিয়ে এলেন। হতাশ, বিষণ্ণ মনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন খানিক দূরে। এক পরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে দেখা। তিনি আবার ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত। ইস্টবেঙ্গলের বয়স তখন মাত্র ১০। ময়দানে মোহনবাগানের পাশেই তখন তাদের তাঁবু। সেই ভদ্রলোক যুবকটিকে বলে, সে যদি ইস্টবেঙ্গলে খেলতে আগ্রহী থাকে তাহলে সেই ব্যবস্থা করা যেতে পারে। অগত্যা সম্মতি জানায় যুবকটি।

ইতিমধ্যেই মোহনবাগান ক্লাবে খবর চলে গিয়েছে, ১৯১১ সালের শিল্ডজয়ী দলের অন্যতম সদস্য মনমোহন মুখোপাধ্যায়ের ছেলে বিমল সই করতে চলেছেন ইস্টবেঙ্গলে! টনক নড়ে কর্মকর্তাদের। তড়িঘড়ি ডেকে পাঠানো হয় ঝকঝকে যুবক বিমল মুখোপাধ্যায়কে। আবার ফিরে আসেন বিমল মোহনবাগান তাঁবুতে। ঢুকতে না ঢুকতেই কর্মকর্তার সপাটে চড় আছড়ে পড়ে তাঁর গালে!

তবে, পাওয়ার লিগ খেলার শর্ত তুলে নেন ক্লাবকর্তারা। পুলিশের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচেই ২ গোল করে মোহনবাগানকে জয় এনে দেন বিমল। তার পর আর ফিরে তাকাতে হয়নি। ১৯৩০ থেকে টানা দশ বছর মোহনবাগানের রাইট হাফে চুটিয়ে খেলেছেন।


১৯৩৯ সালে প্রথম বার লিগজয়ী মোহনবাগান দল। ছবি সৌজন্য: মনমোহন মুখোপাধ্যায়ের পরিবার

বিমল মুখোপাধ্যায়ের অধিনায়কত্বেই প্রথম লিগ জেতে মোহনবাগান, ১৯৩৯ সালে। বাবা মনমোহন মুখোপাধ্যায় ছিলেন প্রথম শিল্ড জয়ের অন্যতম নায়ক, ছেলে বিমল নায়ক প্রথম লিগ জয়ের। এ এক ব্যতিক্রমী ঘটনা, সন্দেহ নেই!


১৯৩৮ সালে অস্ট্রেলিয়া সফরে বিমল মুখোপাধ্যায়। ছবি সৌজন্য: মনমোহন মুখোপাধ্যায়ের পরিবার

অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন গঠিত হওয়ার পর ভারতীয় ফুটবল দলের প্রথম বিদেশ সফরেও দলে ছিলেন বিমল মুখোপাধ্যায়। অস্ট্রেলিয়ায় খেলতে যায় ভারত। সেটা ছিল ১৯৩৮।

দেখুন ভারতীয় দলের অস্ট্রেলিয়া সফরের খেলার ভিডিও, ১৯৩৮

কিন্তু এহেন বিমল মুখোপাধ্যায়কে কি বাঙালি আদৌ আর আজ মনে রেখেছে? কাতর প্রশ্ন বিমল মুখোপাধ্যায়ের ছেলে নিখিল মুখোপাধ্যায়ের। ব্রিটিশদের পর্যদুস্ত করে প্রথম বার শিল্ড জয়ী দলে থেকেও মনমোহন মুখোপাধ্যায়ের পাক্কা একশো বছর লেগেছিল ‘মোহনবাগান রত্ন’ খেতাব পেতে। তাঁর পুত্র বিমলের সেটুকু সৌভাগ্যও হবে কি না, অনিশ্চিত বিমল-পুত্র।

বিমল মুখোপাধ্যায়ের পুত্র নিখিল মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য

 

শুধু মোহনবাগান ক্লাবের পক্ষ থেকে নয়, নিজের ভিটে হুগলির উত্তরপাড়া এলাকাতেও বিমল মুখোপাধ্যায়ের আজও কোনও স্বীকৃতি জোটেনি। এমনকী মুখোপাধ্যায় পরিবারের পক্ষ থেকে উদ্যোগের ক্ষেত্রেও দেখা দিয়েছে আশ্চর্য সমস্যা।


বিমল মুখোপাধ্যায়ের অস্ট্রেলিয়া সফরের ব্লেজার। নিজস্ব চিত্র

আজও তাঁদের কাছে সযত্নে রক্ষিত রয়েছে মনমোহন মুখোপাধ্যায় ও বিমল মুখোপাধ্যায়ের ব্যবহৃত বিভিন্ন বস্তু। জার্সি কিংবা ব্লেজার থেকে নানা মেডেল, পুরস্কার, পুরনো ফটোগ্রাফ ইত্যাদি। এমনকী প্রায় একশো বছরের পুরনো মনমোহন মুখোপাধ্যায়ের সাধের বেহালাও রয়েছে সেই সংগ্রহের তালিকায়।


মনমোহন মুখোপাধ্যায়ের বেহালা। নিজস্ব চিত্র

উত্তরপাড়ার মুখোপাধ্যায় পরিবার চাইছে তাঁদের বাড়িতেই গড়ে তুলতে একটি ছোট্ট ফুটবল মিউজিয়াম। সেখানে ঠাঁই পেতে পারে পূর্ব প্রজন্মের এই সব ঐশ্বর্য, অফুরন্ত ধনভাণ্ডার। আগ্রহী মানুষজন সেগুলি দেখতেও পারবেন। কিন্তু সে গুড়েও বালি!

মনমোহন মুখোপাধ্যায়ের প্রপৌত্র অরিজিৎ মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য

 

ভাড়াটের সমস্যা ও আইনি জটিলতার কারণে আটকে রয়েছে মিউজিয়ামের উদ্যোগ। মুখোপাধ্যায় পরিবারের দাবি, মনমোহনের মুখোপাধ্যায়ের মেজছেলে ও বিমল মুখোপাধ্যায়ের ভাই কমলকুমার মুখোপাধ্যায়ের অংশটি জবরদখল হয়ে তালা বন্ধ পড়ে থাকায় এই সমস্যা দেখা দিয়েছে।


মনমোহন মুখোপাধ্যায়ের ভিটে। নিজস্ব চিত্র

১৯৭১ সালে মারা গিয়েছেন বিমল মুখোপাধ্যায়। তার পর যত সময় গড়িয়েছে বাংলার ফুটবলপ্রেমীদের মন থেকে তাঁর নাম এক্কেবারে মুছে গিয়েছে। কিন্তু আজ তাঁর পরিবারের লোকেরা চাইছেন, সময়ের গতির কাছে যেন শেষমেশ হেরে না যায় ফুটবলের গতি। মাঠের লড়াই, মাঠের বাইরের উত্তেজনায় নিজেদের গৌরবময় ইতিহাস যেন তারা নিজেরাই ভুলে না যায়, তাবৎ সবুজ-মেরুন সমর্থকদের কাছে আপাতত তাঁদের এটুকুই চাওয়ার।