দোকানে গিয়ে ঘোঁতার দেখা সহজে পাওয়া যায় না। ওয়েট করে করে পায়ে ঝিঁঝিঁ। অতঃপর ঘোঁতার আগমন। জিভের তলায় খৈনির ঠুস্। কথা কম। কাজ বেশি। চোখ নাচিয়ে জিগ্যেস করল— কী ব্যাপার? পোস্টারের দিকে আঙুল তুলে দেখানোয় বলল— পাঁচ লাখ পার হেড। তিন অ্যাডভান্স। আর বাকি দুই লাইফ নিয়ে ফিরে এলে। এবারে প্রশ্নকর্তার চোখ কপালে তোলার কথা। বলে কী! মিন মিন করে জিগ্যেস করা গেল— লিখেছ তো লাক্সারি বাসে...। তাহলে পাঁচ লাখই বা কেন? আর ফেরা না-ফেরার কথাই বা ওঠে কেন? ঘোঁতার সরল উত্তর— বাস তো এয়ারপোর্ট অব্দি। আর না-ফেরাটা আপনার ব্যাপার। হেবি বাওয়াল হয় না ফিরলে। তাই ওই দু’লাখ মায়ের ভোগে রেখেই ট্যুর ছকেছি। এখন বলুন, বুক করব?

উপরের বিজ্ঞাপন আর সংলাপ আপাতত কাল্পনিক। কিন্তু বেশিদিন নেই, ওটা বাস্তবে পা দেবে। যে হারে বাঙালি হানা দিতে শুরু করেছে, তাতে পারমাদান ফরেস্ট, সবুজদ্বীপ, ডায়মন্ড হারবার, বকখালি, মিরিকের পরেই মাউন্ট এভারেস্টই বাকি থাকে পিকনিক-ক্ষেত্র হিসেবে নিজেকে মেলে ধরতে। ভ্রমণ-বাই বঙালিকে ঠেকানো অত সোজা নয়। মানচিত্রের বৃহদন্ত্র খুঁটে খুঁটে সে বের করে এনেছে ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশন। বিশেষ করে পাহাড়ের তলদেশের ম্যলেরিয়াপ্রবণ গ্রাম থেকে পাহাড়ের সাততলার ইয়েতি-অধ্যুষিত বরফ-প্রন্তর— সর্বত্র সে গিয়েছে। রুমটেক মনাস্টারি থেকে থিয়াংবোচি মঠ— বজ্রযানী বৌদ্ধধর্মের হাড়হদ্দ সে জানে। নামচে বাজারে নেমে গিয়ে কোন শর্টকাটে উঠছে বাজারে ওঠা যায়, শেরপারা না-জানলেও বাঙালি জানে। এই সমস্ত জ্ঞান আছড়ে পড়ে অফিস ফেরতা চায়ের দোকানে, অফিসের কাজের টেবিলেও। এ হেন বাতেলার উদ্দেশ্য অবশ্যই আত্মপ্রক্ষেপণ। কিন্তু এখানে প্রশ্ন উঠতেই পারে, এত বিষয় থাকতে এভারেস্ট কেন? উত্তর সহজ। বাঙালির পাহাড়বাজির একটা অদম্য ইচ্ছে বরাবরের। সন-তারিখ মিলিয়ে দেখবেন, এই পাহার-বাই একান্তভাবে ইংরেজ আমলের পরে গজানো একটা ব্যাপার। সাহেবরা গরমের দেশে ‘হোম ওয়েদার’ খুঁজে পেতেই পাড়ি জমিয়েছিলেন পাহাড়ে। বাঙালি কীসের জন্য জমিয়েছিল, কে জানে! আর শৃঙ্গবিজয়কে একান্তভাবে প্রভুশক্তির বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই দেখেন ইকো-ক্রিটিকরা। বিরাট শৃঙ্গ জয় আর বাঘ মারা— দুটোই কলোনিয়াল পাওয়ারের সিম্পটম। এতে বাঙালি নিজেকে যুক্ত করে নেহাতই লেজুড় হিসেবে। যে কেতায় সে একদা ড্রেসিং গাউন পরেছিল, চুরুট ফুঁকেছিল, চূড়ান্ত অ্যাকসেন্টে ইংরেজি বলেছিল, সেই একই কেতায় কি সে পাহড়ে চড়ে?

মনে হয় অতটা নয়। মাউন্টেনিয়ারিং একটা জবরদস্ত স্পোর্টস। এর পিছনে ‘অভিযান’ ও ‘বিজয়’-এর পাওয়ার গেম নিশ্চয়ই রয়েছে, সব খেলাতেই তা থাকে। তা সত্ত্বেও একথা বলতেই হয় যে, আইপিএল আর এভারেস্ট অভিযান মোটেই এক জিনিস নয়। এখানে ডোপিং নেই, বেটিং নেই, খেলার শেষে হোটেলের ঘরে ডেটিং নেই। তবু কেন এর পিছনে ভারতীরা লম্বা লাইন মারলেন? সাম্প্রতিক কেয়েকটি এভারেস্ট-অভিযান এবং তাতে বাঙালির অংশগ্রহণ ও বেশ কিছু পর্বতারোহীর প্রয়াণ কী প্রমাণ করে? কোথায় পৌঁছে দেয় এই সব ‘খবর’? এবারেস্ট কি একটা হুজুগে পর্যবসিত? খানিকটা মাউন্টেনিয়ারিং ট্রেনিং আর খানিকটা স্পনসরের খেলা পাঞ্চ করলেই এভারেস্ট? 

আটজন-দশজন-বারোজন? দল বাড়ছে পিকনিকের। দল বাড়ছে... ওইতো ঘোঁতার লাক্সারি বাস এসে ঠেকল বেস ক্যাম্পে। হড়হড় করে নামছে কাঁধে গামছা, কোমরে গেঁজে, কোলে স্ট্র্যাপ-ছেঁড়া অ্যাডিডাস লেখা ব্যাগ নেওয়া বাঙালি। নেমেই প্রশ্ন উঠছে— দাদা টয়লেটটা কোথায়? এখানো শপিংয়ের কী বন্দোবস্ত? কিছুই তো দেখছি না! বস্ একাট গোল্ড ফ্লেক ছাড়ো তো! এই সবের মঝখানে এভারেস্টের পায়ের কাঠে জমে উঠছে বিয়ারের ক্যান, বিফের টিন, প্লাস্টিকের বোতল, হয়তো ‘গজপতি বস্ত্রালয়’ লেখা পলিব্যাগও।