সাঁড়াশি আক্রমণের মুখে পড়েছেন বীজপুরের তৃণমূল বিধায়ক শুভ্রাংশু রায়। একদিকে দলের মধ্যে অবিশ্বাসের বাতাবরণ, অন্যদিকে বাবা মুকুল রায়ের মতো বিজেপিতে যোগ দিচ্ছেন কি না, তা নিয়ে জল্পনা।

এর মাঝেই এবেলা.ইন-কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে কাঁচরাপাড়ায় নিজের ওয়ার্ড অফিসে বসে খোলামেলা কথা বললেন শুভ্রাংশু।

একটি কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন এই তরুণ রাজনীতিক। 

• খুন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা

যদিও তিনি এটাকে রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলতে রাজি নন, কিন্তু তিনি আশঙ্কা করছেন তিনি খুনও হয়ে যেতে পারেন। শুভ্রাংশু বলছেন, ‘‘আমি আমার দলনেত্রীর কাছে আগেও বলেছি। এখনও বলব, আমার অবস্থা যেন বিকাশ কাকুর মতো না হয়, সেটা দেখার জন্য।’’

উল্লেখ্য, নোয়াপাড়া এলাকার তৃণমূল নেতা বিকাশ বসু খুন হয়েছিলেন ২০০০ সাল নাগাদ। তাঁর স্ত্রী মঞ্জু বসু পরে বিধায়ক হন। কিন্তু তৃণমূলের উত্তর ২৪ পরগনা্র এক প্রভাবশালী নেতার বিরুদ্ধেই বিকাশ বসুকে খুন করার অভিযোগ উঠেছিল। যদিও তার কিনারা হয়নি।

কিন্তু কেন এমন আশঙ্কা করছেন শুভ্রাংশু? এই ডামাডোলে দলের সংগঠন ভাঙছে এবং সমাজবিরোধীরা মাথাচাড়া দিচ্ছে বলেই অভিযোগ এই তৃণমূল বিধায়কের।

তাঁর কথায়, ‘‘সংগঠন তো ভাঙছেই। সঙ্গে এলাকার অপরাধমূলক কার্যকলাপ, অসামাজিক কাজ সবকিছু বেড়ে গিয়েছে। আমাদের প্রশাসনে যাঁরা আছে, তাঁরা দেখলেই ভাল হয়। প্রশাসনের মাথায় আমাদের দলনেত্রী বসে আছে। এ ব্যাপারে আমার মন্তব্য করা ঠিক হবে না।’’

• আমি খেলনা নই

তিনি বারবার দাবি করেছেন তিনি তৃণমূলে আছেন এবং থাকবেন। এদিনও তিনি একই দাবি করলেও, শুভ্রাংশু কেন তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশ্য সভায় পরিষ্কার করছেন না?

এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘‘ব্যক্তিগত কুৎসা আমি পছন্দ করি না। তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে যে যে দল আছে, তাদের মধ্যে যাঁরা যাঁরা বলবে, তাঁদের বিরুদ্ধে আমি নিশ্চয়ই বলব। কিন্তু কারও বিরুদ্ধে একক ভাবে বলতে আমি রাজি নই। আমি খেলনা নই। আমাকে নিয়ে কেউ খেলুক, সেটাও আমার পছন্দ নয়।’’ 

সেই জন্যই কী মুকুল রায়কে জবাব দেওয়ার যে সভা উত্তর কলকাতা যুব তৃণমূল কংগ্রেসের উদ্যোগে হয়েছিল, সেই সভায় অনুপস্থিত ছিলেন শুভ্রাংশ? তিনি বলছেন, সেই দিনের কারণ একদমই শারীরিক ছিল। দরকারে ডাক্তারি রিপোর্ট পেশ করতেও রাজি তিনি। 

• বিশ্ববাংলা বিতর্ক

তাহলে বিশ্ববাংলা বিতর্কের জবাব তো তিনি দিতেই পারেন দলের তরফে। সেখানেও সতর্ক শুভ্রাংশু। তিনি বলছেন, ‘‘বিশ্ববাংলা বা জাগো বাংলা নিয়ে যে অভিযোগগুলো রয়েছে, আমি নিজে এখনও দেখিনি যে এটা সঠিক না বেঠিক। এ ব্যাপারে প্রকাশ্যে কিছু বলার ব্যাপারে আমাদের দলনেত্রী আমাদের কোনও নির্দেশ দেননি। উনি নিজেও কিছু বলেননি। তিনি যদি আমাকে বলেন এটার প্রামাণ্য নথি নিয়ে আমাকে বলার জন্য, আমি নিশ্চয়ই বলব।’’ 

• জ্যোতিপ্রিয় ও অর্জুন

কিন্তু দলের মধ্যে অর্জুন সিংহ বা জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক যে ভাবে তাঁর বিরুদ্ধে কথা বলছেন, তাতে তাঁর পক্ষে চুপ করে বসে থাকাও তো সম্ভব নয়। কোণঠাসা হয়েও তিনি মুখে বলছেন, ‘‘বালুদা আমার সিনিয়র লিডার। বালুদাকে আমি ছোটবেলা থেকে দেখেছি। কাকা বা অভিভাবক হিসেবে দেখেছি। ফলে তিনি কী ভাবছেন সেটা নিয়ে বলা ঠিক নয় আমার। তাঁকে সম্মান করি। সম্মান করেই যাব।

‘‘আমার বাড়ির লোক আমাকে শিখিয়েছে। পরিবারে অনেক লোক থাকে। বাবা বা কাকার মধ্যে গণ্ডগোল হলে তুমি তার অংশীদার হবে না। তাঁদের ব্যাপারে তুমি ব্যক্তিগত মত দেবে না। সেটা আমি এখনও বিশ্বাস করি।’’

আর অর্জুন সিংহ সম্বন্ধে তাঁর বক্তব্য, ‘‘অর্জুনদা বরাবরই এই ধরনের বক্তব্য রাখতে ভালবাসেন। উনিও আমার সিনিয়র লিডার।’’ 

• আপাতত স্ট্রেস ফ্রি

বাবা মুকুল রায়ের সঙ্গে পারিবারিক বিষয়ে কথা হলেও, তিনি বিজেপিতে যাওয়ার বা তৃণমূল ছাড়ার ব্যাপারে কোনও পরামর্শ দেননি বলেই দাবি করছেন বীজপুরের বিধায়ক।

আপাতত শরীর ঠিক রাখতে ও নিজেকে কিছুদিন চাপমুক্ত করতেই বিধানসভা থেকে ছুটি নিয়েছেন। দলের বৈঠকেও যাচ্ছেন না। 

তিনি বলছেন, ‘‘এ ক’দিন কোনও চাপ নেব না। হালকা হয়ে থাকতে চাই। তবে এলাকার মানুষ যাঁরা দেখা করতে আসছেন, তাঁদের সঙ্গে দেখা করছি। কাজের কথা হচ্ছে।’’

কারণ শুভ্রাংশুর বিশ্বাস, ভোটের রাজনীতিতে মানুষই শেষ কথা বলে। তাই মানুষের সঙ্গে থাকার চেষ্টাই করে চলেছেন তিনি।