পেশায় একজন কৃষক। সংসারে স্ত্রী ছাড়াও আরও ছয় সন্তান। দিন আনা দিন খাওয়া সংসারে দু’বেলার খাবার জোটানোটাই এক এবং একমাত্র লক্ষ্য। সেখানে মেয়ের দৌড়ের পিছনে কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ করাটা বিলাসিতার সমান। 

অসমের নওগাঁও জেলার ধিংয়ের বাসিন্দা রঞ্জিত দাসের তাই ছোট মেয়ের দৌড়ের ভবিষ্যত নিয়ে খুব বেশি ভাবার সামর্থ্যটুকুও ছিল না। আর্থিক কারণে যখন কৃষক পরিবারের এক কিশোরীর দৌড় থেমে যাওয়ার উপক্রম, তখনই উদয় নিপন দাসের।

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

বছর তিনেক আগে প্রথমবার দেখেই যিনি বুঝেছিলেন, অ্যাথলেটিক্সে দেশের মুখ উজ্জ্বল করতে পারে হিমা দাস। অসম সরকারের ক্রীড়া এবং যুব উন্নয়ন দফতরের এই কোচ যে সেদিন ভুল ছিলেন না, অনুর্ধ্ব কুড়ি বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা জিতে তা প্রমাণ করেছে হিমা। বলা ভাল, নিপন না থাকলে হয়তো আজকের হিমাকে চিনতেই পারত না গোটা বিশ্ব।

হিমার প্রতিভা নিয়ে নিশ্চিত হওয়ার পরই তাঁকে গ্রাম থেকে ১৪০ কিলোমিটার দূরে গুয়াহাটিতে নিয়ে আসতে চান নিপন। কিন্তু তখন মেয়েকে ছাড়তে আগ্রহী ছিলেন না হিমার বাবা-মা। নিপন অবশ্য জোর করেই সতেরো বছর বয়েসি হিমাকে নিয়ে এসে সারুসাজাই স্পোর্টস কমপ্লেক্সে কোচিংয়ের ব্যবস্থা করে দেন। ভাড়া বাড়িতে থাকারও বন্দোবস্ত করে দেনে তিনি। 

নিপন দাসের সঙ্গে হিমাকে নিয়ে পড়েন অসমের রাজ্য কোচ নবজিৎ মালাকার। দু’জনে মিলে টাকা ধার করে ২০১৭ সালে হিমাকে কেনিয়ার নায়রোবিতে বিশ্ব যুব চ্যাম্পিয়নশিপে পাঠান। সেখানে ২০০ মিটার দৌড়ে পঞ্চম স্থান পায় হিমা।

দেখুন সেই ইতিহাস সৃষ্টির মুহূর্ত, রইল ভিডিও। (সৌজন্যে- এএফআই-এর ফেসবুক পেজ)

আন্তর্জাতিক মঞ্চে এই সাফল্যের পরেই ভারতীয় অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশনের কোচ গালেনা বুখারিনার নজরে পড়ে যায় হিমা। এর পরে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি অসমের এই কিশোরীকে। প্রাক্তন এই স্প্রিনটারের অধীনে আরও ধারালো হয়ে ওঠে হিমা। 

ফিনল্যান্ডে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে হিমার সোনা জয়ের পরে নিপন একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘‘মাত্র দু’বছর হল পায়ে স্পাইক পরে দৌড়চ্ছে হিমার। যে গতিতে ও উন্নতি করেছে, সেটাই বুঝিয়ে দেয় যে ওর মধ্যে কতটা ক্ষমতা রয়েছে। এমন প্রতিভা আমি কোনওদিন দেখিনি।’’

পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে পদক নেওয়ার সময় জাতীয় সংগীত শুনে কেঁদে ফেলে হিমা। দেশকে বেনজির সাফল্য এনে দেওয়ার দিনেও শুরুর লড়াইকে ভোলেনি এই কিশোরী। তাকে গুয়াহাটি নিয়ে এসে ভাল প্রশিক্ষণের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য মা-বাবার পাশাপাশি নিজের কোচদেরও ধন্যবাদ জানিয়েছে দেশকে নতুন স্বপ্ন দেখানো হিমা।