শনিবার কলকাতার জনসভায় যেন কোয়েশ্চেন কমন পেয়ে গিয়েছিলেন অমিত শাহ। আসলে আগেই যে প্রশ্ন ফাঁস করে দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। সেই মতো বিজেপির হেড স্যার রীতিমতো নোটস রেডি করে এনেছিলেন দিল্লি থেকে। শিক্ষকের মতো সেই নোটস ক্লাসে লেকচার দেওয়ার স্টাইলে পেশ করেছেন সমাবেশে। কিংবা কোয়েশ্চেন কমন পাওয়া ছাত্রের মতো উগরে দিয়েছেন উত্তর। 

কী সেই প্রশ্ন? উত্তর এক হলেও অনেক কিছুই হতে পারে প্রশ্ন। ‘এনআরসি কী এবং কেন’ কিংবা ‘এনআরসি সম্পর্কে যাহা জান লিখ’ কিংবা ‘নাগরিক পঞ্জির গুরুত্ব ও উপকারিতা ব্যাখ্যা কর’। মেয়ো রোডের সমাবেশে ঠিক এটাই তো করে গেলেন অমিত শাহ। নাগরিক পঞ্জি নিয়ে নিজের দলের ব্যাখ্যা সর্বভারতীয় সভাপতি স্পষ্ট করে দিয়ে গেলেন বিজেপির কর্মী, সমর্থক, নেতাদের। শুনিয়ে দিয়ে গেলেন সামনের লোকসভা নির্বাচন পরীক্ষার বড় প্রশ্নের উত্তর— ‘শরণার্থী ও অনুপ্রবেশকারীর মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ কর।’।

বিজেপি সভাপতি নিজের স্টাইলে পরীক্ষাও নিলেন সমাবেশে। আরও জোরে, আরও জোরে, আরও জোরে জানতে চাইলেন— ‘‘এনআরসি হোনা চাহিয়ে ইয়া নেই চাহিয়ে? ঘুসবেঠিও কো দেশ সে নিকালনা চাহিয়ে ইয়া নেহি চাহিয়ে?’’

অসম ইস্যুতে কলকাতা সরব মমতা। — নিজস্ব চিত্র

জন-সমাবেশ থেকে সদর্থক উত্তর আদায় করে নিয়ে গেলেও অমিত শাহ নিশ্চিত হতে পারবেন কি? এই প্রশ্নটা থেকেই যাবে। কারণ, তৃণমূল কংগ্রেস ইতিমধ্যেই ‘মা-মাটি-বাঙাল’ স্লোগান অস্ত্রে শান দিতে শুরু করে দিয়েছে। ঠিক যেমনটা দিয়েছিল ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে।

এই রাজ্য থেকে তেমন পলিটিক্যাল ডিভিডেন্ড যে মিলবে না সেটা আগাম বুঝেই ২০১৪ সালে খুব বেশি টাইম পশ্চিমবঙ্গে ইনভেস্ট করেননি বিজেপির প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী। গুটিকয় সভা করেছিলেন। তারই মধ্যে হুগলির শ্রীরামপুরের সভা থেকে মোদী বলেছিলেন, কেন্দ্রে ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশিদের তাড়ানো হবে। বাক্স-প্যাঁটরা গুছিয়ে রাখতেও বলেছিলেন।

শরণার্থী। বনগাঁ সীমান্তে। — নিজস্ব ফাইল চিত্র

অনুপ্রবেশকারী তাড়ানোর সেই হুঁশিয়ারিকে রাতারাতি ইস্যু বানিয়ে ফেলে তৃণমূল কংগ্রেস। পালটা প্রচার শুরু হয়ে যায় যে, পূর্ববঙ্গ থেকে আগত ‘বাঙাল’-দের দেশ থেকে খেদাতে চায় বিজেপি। বড় মঞ্চ থেকে তো বটেই পূর্ববঙ্গ থেকে আগত মানুষের সংখ্যা যেখানে বেশি সেখানে সেখানে প্রচারের অভিমুখটাই বদলে যায়। বলা হয়— বিজেপি এলে তাদের সবাইকে বাংলাদেশে ফেরত চলে যেতে হবে।

সেই অস্ত্র কাজে দিয়েছিল অনেকটাই। এবার লোকসভা ভোটের আগে সেই অস্ত্র নতুন করে এনে দিয়েছে অসম। বিজেপি যতই পুরনো দিনের কথা মনে করাতে চাক না কেন রাজনীতি সব সময়েই ‘বর্তমান’ নির্ভর। ২০০৫ সালের অগস্ট আর ২০১৮ সালের অগস্ট মাসের মধ্যে ১৩টা বছরের তফাত। সেবার অগস্টে লোকসভায় রাজ্য থেকে অনুপ্রবেশকারী হঠানোর দাবি নিয়ে সরব হয়েছিলেন মমতা। স্পিকারের চেয়ারের দিকে নথিপত্র ছুড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু সেটা অতীত। আজকের মমতা মানবাধিকারের প্রশ্নে নাগরিক পঞ্জির বিরুদ্ধে। তাঁর বিশাল সংগঠন এই বর্তমানের প্রচারটাই করবে এবং করছে। সেখানে বিজেপির কর্মীবল অনেক অনেক পিছিয়ে। তাই কলোনি এলাকায় মমতার অতীতের নীতি কিংবা অমিত শাহর শিখিয়ে দেওয়া শরণার্থী ও অনুপ্রবেশকারীর মধ্যে পার্থক্য বোঝানোর মতো তৃণমূল স্তরের সংগঠন নেই দিলীপ ঘোষদের।

সেদিনের শিয়ালদহ স্টেশন। — নিজস্ব ফাইল চিত্র

আগামী লোকসভা নির্বাচনের আগে তাই এই নাগরিক পঞ্জি ইস্যুকেই মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চায় তৃণমূল কংগ্রেস। এখন রাজ্য জুড়ে তৃণমূল কংগ্রেসের উদ্যোগে চলছে সেই প্রচার। রক্তদান উৎসবেও ‘রক্তদান-মহৎদান’ নিয়ে দেড় মিনিট বলার পরেই নেতারা চলে যাচ্ছেন এনআরসি প্রসঙ্গে। আর তাতে স্পষ্ট ভয় দেখানো— হিন্দু-মুসলমানের মতো বাঙাল-ঘটি বিভাজনও চাইছে বিজেপি।

দেশভাগের পরে কিংবা মুক্তিযুদ্ধের সময়ে যে সব হিন্দু পরিবার শরণার্থী হিসেবে পশ্চিমবঙ্গে এসেছেন তাঁরা নিজেদের ‘ঘটিদের বাংলা’য় সংখ্যালঘু বলেও মনে করত। সেই মনোভাব এখনও অনেক জায়গাতেই রয়েছে। আর তাই শরণার্থীদের আশ্রয় নেওয়া কলোনি এলাকা ছাড়াও শহরে শহরে রয়েছে ‘বাঙাল পাড়া’। সংখ্যালঘু মানসিকতা থেকেই এই সঙ্ঘবদ্ধ থাকার প্রবণতা। সুতরাং, ‘মা-মাটি-বাঙাল’ স্লোগান ব্যবহারের জন্য এলাকাও নির্দিষ্ট রয়েছে রাজ্যে। আর প্রকাশ্যে না হলেও এখনও সামাজিক ভাবে ‘ঘটি-বাঙাল’ বিভাজন রয়েছে। এখনও বেঁচে রয়েছে উত্তম-সুচিত্রার— ‘ওরা থাকে ওধারে’।

কলকাতায় বাম সমাবেশ। — নিজস্ব ফাইল চিত্র

নতুন ভোটারদের বড় অংশেরই দেশভাগের স্মৃতি নেই। তবে বড়দের মুখে গল্প শোনা ভয়ঙ্কর কষ্টের ছবি রয়েছে মনে। পদ্মার দেশের মানুষের উত্তর প্রজন্মের মনে থাকা সেই ভয়ের ছবিটাকে একটু জীবন্ত করে তুলতে পারলেই নরেন্দ্র মোদীর রথের চাকা গঙ্গার বঙ্গে থমকে যেতে পারে। এমনই ভাবনা তৃণমূলের।

এখন তো সব শুরু। ভোট যত এগোবে তত নতুন এক ‘ভোট-অঙ্ক’ তৈরি হবে রাজ্যে— ‘বাঙাল ভোটের ভাগ’। 

হিসেব কষতে হবে কারা কাকে ‘আমাগো দল’ বলে বেছে নেবে।