একজন আচমকা ছুটে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে জাপটে ধরে মজায় রয়েছেন। আর অন্যজন পাটিগণিত কষে যাচ্ছেন আনন্দে। এঁদেরকে নিয়ে বেশ খুশিতেই রয়েছেন নরেন্দ্র মোদী। 

রাহুল গাঁধী তো একদম হিরো হয়ে গিয়েছেন মোদীকে বুকে টেনে নিয়ে। ‘কেমন দিলাম দাদা’-টাইপের হাবভাব নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কেউ কেউ গ্যাস বেলুনে গ্যাস ভরার মতো কংগ্রেস সভাপতিকে হাওয়ায় ভাসাচ্ছেন। পাপ্পু যেন আর পাপ্পু নেই। যেন মোদীর ঘাড়ে তিনি নিঃশ্বাস ফেলছেন।

সেটা নিঃশ্বাস না দীর্ঘশ্বাস, তা পরে দেখা যাবে। কিন্তু নরেন্দ্র মোদীরা ছাড়াও যাঁরা এখনও রাহুলকে ‘পাপ্পু’ বলেই মনে করেন তাঁদের মধ্যে একজন কী করছেন? ধর্মতলার মোড়ে দাঁড়িয়ে অঙ্ক কষছেন, ‘হাতে রইল ৪২...ওদিকে ২০...ওখানে শূন্য...।’

রাহুল গাঁধী বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি ভাবেন প্রধানমন্ত্রীর ড্রামাবাজির জবাবে ড্রামা করে আর পাটিগণিত কষে দেশকে বাঁচিয়ে দেবেন, তাহলে তাঁরা ভুল ভাবছেন। নাটক বা পাটিগণিত দিয়ে বিজেপি-আরএসএসদের ঠেকানো তাঁদের কম্মো নয়।

‘এক্কা দোক্কা’ কলামের অন্যান্য খবর

আসলে রাহুল বা মমতা কাঁচা রাজনীতিক এমন ভাবাও তো ভুল। তাঁরা জানেন ভাল করে যে, তাঁরা ফাঁদে পড়ে গেছেন অনেকদিন আগেই। সংঘ পরিবার যে ফাঁদ পেতেছে তাঁদের জন্য, তাতে পা জড়িয়ে গিয়েছে।

হিন্দু জাতীয়তাবাদের বীজ পুঁতে তাতে জল-আলো-বাতাস দিচ্ছেন সংঘ-বিজেপি কর্তারা, তা সবাই ভালই বুঝতে পারছে। রাম-কাহিনি পুরনো হয়ে গেছে। এখন মহাভারতের যুগের ‘ইন্টারনেটের’ গল্প শোনাচ্ছেন তাঁরা। মেকলে সাহেবের শিক্ষাব্যবস্থা বদলে দেশজ শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রকল্প হাতে নিয়েছেন তাঁরা। তলায় তলায় এইরকম অনেক কিছুই ঘটছে।

একই সঙ্গে যোগ করার চাইতে ভাগ করার দিকেই জোর দিয়েছেন এঁরা। সাফ বলে দিচ্ছেন— হয় তুমি আমাদের মতো সংখ্যাগুরুদের কথায় চল, নয়তো তুমি ফুটে যাও। বিবিধের মধ্যে ঐক্য নয়। সংখ্যাগুরুদের সঙ্গে এক হয়ে থাকার ঐক্য তৈরি হোক ভারতে।

আর নরেন্দ্র মোদী এই হিন্দুত্বের সঙ্গে অচ্ছে দিন, নতুন ভারত, স্বচ্ছ ভারত, যোগ দিবস, কালো টাকার বিরুদ্ধে লড়াই ইত্যাদিকে চমৎকার মিশিয়ে দিয়েছেন। 

এসবের মাঝে ‘অচ্ছে দিনের’ স্বপ্ন ধাক্কা খেয়েছে। এটাকে খড়কুটোর মতো ধরেছেন রাহুল-মমতারা। কিন্তু অন্যদিকে বিশেষ কিছু করতে পারছেন না।

না পারছেন ভয় পাওয়া মুসলমান-খ্রিস্টান-দলিতদের নিরাপত্তা দেওয়ার কথা জোর গলায় বলতে, না পারছেন বিজেপির হিন্দুত্বে ভেসে যাওয়া অংশকে নিজেদের দিকে টানতে।

যদি আবার ‘মুসলমান তোষণকারী’ বলে স্ট্যাম্প লেগে যায় গায়ে! এই একজন প্রাক্তন মন্ত্রী বললেন, দেশটা তো ‘হিন্দু পাকিস্তান’ হয়ে যাবে। তক্ষুণি তাঁকে বকে চুপ করে দিলেন রাহুলরা। আবার নেত্রীকেও তো রাজনীতির মঞ্চ থেকে ‘জয় মাতাদি’র নাম নিতে হচ্ছে এক নিঃশ্বাসে। ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’ তো বেশি শোনা যাচ্ছে না!

কারণ, কীভাবে এই হিন্দু জাতীয়তাবাদের মোকাবিলা করবেন তাঁরা এ নিয়ে পথই খুঁজে পাচ্ছেন না। ফলে যাঁদের মাথা ঘুরে গেছে মোদীর কথা শুনে, তাঁরা মোদীর ‘অচ্ছে দিনের’ স্বপ্নভঙ্গে একটু ব্যথা পেলেও, অন্য কাকে বিশ্বাস করবেন তা বুঝতে পারছেন না।

বিজেপি-আরএসএস ভাবধারার উলটো দিকে আর একটি ভাবধারা তৈরি না হলে বিপদ যেমন ছিল, তেমনই থাকবে। 

বুকে জাপটে ধরে আর অঙ্ক কষে রাজনৈতিক জুয়া খেলাই হবে। দেশ বাঁচানো হবে না। ফলে খুশিতেই থাকবেন মোদীরা। যদি না বিরোধীদের জুয়ার বাজি লেগে যায় ২০১৯-এ।