নীল-সমুদ্র চোখ, কোঁকড়ানো চুল। ধবধবে ফরসা ২২ বছরের তরুণ যেন উপন্যাসের পাতা থেকে উঠে আসা ফরাসি এক প্রেমিক। সেই প্রেমিকের ডান পায়ের এক সোয়ার্ভিং শটেই থেমে গিয়েছিল আর্জেন্টিনার যাবতীয় প্রতিরোধ, গ্যালারিতে বসে থাকা সমর্থকদের হৃৎস্পন্দন। কাজান এরিয়ায় নীল-সাদা জার্সির কোনও এক লিওনেল মেসির চোখে নেমে এসেছিল হাজার বছরের বিষণ্ণতা। আর্জেন্টিনার স্বপ্ন চুরমার করে দেওয়া সেই বেঞ্জামিন পাভ্যা শেষমেশ থেমেছিলেন লুঝনিকি স্টেডিয়ামে ট্রফি হাতে তুলে।

বিশ্বকাপের পরেই ছুটিতে চলে গিয়েছিলেন। তার পরেই স্টুটগার্ট কোচ টাইফান কর্কাটের ডাক পেয়ে ছুটি কাটছাঁট করে হাজির হয়ে গিয়েছেন প্রি-সিজনে। তাঁর আগে এবেলা.ইন-কে একান্ত সাক্ষাৎকার দিয়ে দিলেন লে ব্ল্যুজ’দের ‘ব্লু আইড বয়’—

লিলে, স্টুটগার্টের মতো ছোট শহরে খেলেছেন। সেখান থেকে হঠাৎ বিশ্বকাপ জয়ের সরণিতে। স্বপ্নের ঘোরে রয়েছেন?

বেঞ্জামিন পাভ্যা: মনে হচ্ছে কতটা পথ পেরিয়ে এলাম! অনেকের সংশয় ছিল আমার উপরে। তবে কঠিন সময়ে বাবা-মা সব সময়ে সাহস জুগিয়েছেন। অনেক আত্মত্যাগ, কঠোর পরিশ্রমের পরে এই জায়গায় এসেছি। এখন মনে হচ্ছে, স্বপ্নের ঘোরে রয়েছি। রিয়্যালি।

প্রথমবার বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে খেললেন। অভিজ্ঞতা কেমন, শিক্ষার ঝুলি কতটা ভরল?

বেঞ্জামিন পাভ্যা: গোটা অভিজ্ঞতাটা জাস্ট অসাধারণ ছিল। কখনই ভাবিনি প্রথম একাদশে খেলে দেশকে বিশ্বকাপ জিততে সাহায্য করব। বিশ্বকাপের মান অন্য সব প্রতিযোগিতার থেকে অনেক এগিয়ে। আর হ্যাঁ, দুর্দান্ত অভিজ্ঞতা হল। এখন রাস্তায় বেরিয়ে বলতে পারি, ‘‘আমি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।’’

আপনার সঙ্গে তো লিলিয়াম থুরামের তুলনা শুরু হয়ে গিয়েছে। আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে গোলের পরে কি ভেবেছিলেন ফ্রান্সের জার্সিতে বিশ্বকাপে শেষবার গোল করেছিলেন যে ডিফেন্ডার তাঁর নাম লিলিয়াম থুরাম?

বেঞ্জামিন পাভ্যা: থুরাম একজন কিংবদন্তি। অলটাইম গ্রেট। দুর্ধর্ষ কেরিয়ার ওঁর। এখনই এমন কিংবদন্তির সঙ্গে আমার তুলনায় বেশ বিব্রত। আমি আপাতত কেবল নিজের মতো খেলতে চাই।

বিশ্বকাপের ঠিক আগেই আপনার দেশের এক সংবাদমাধ্যমে আপনি বলেছিলেন, ডিফেন্সে যে কোনও পজিশনে আপনি খেলতে স্বচ্ছন্দ।

বেঞ্জামিন পাভ্যা: প্রথমত, আমি একজন ডিফেন্ডার। রক্ষণে বিপক্ষের আক্রমণ বাঁচানোই আমার কাছে চ্যালেঞ্জ। তবে উইথ দ্য বল খেলতেও বেশ পছন্দ করি। ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়, টেকনিক্যালি আমি বেশ নিঁখুত।

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

বিশ্বকাপ কবে শেষ হয়ে গিয়েছে। রাশিয়ার বিশ্বকাপের ‘দ্রষ্টব্য’ ধরা হচ্ছে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে আপনার করা গোলকে। ইউটিউবে এই গোলের ভিডিও তো এখনও ট্রেন্ডিং। অনুশীলনে কীভাবে নিংড়ে দেন এমন ধরনের রোমহর্ষক গোল করার জন্য?

বেঞ্জামিন পাভ্যা: সব সাংবাদিকরা এখন এই গোল নিয়েই প্রশ্ন করছেন। স্রেফ ইনস্টিংক্ট থেকে গোলটা করে গিয়েছিলাম। ট্রেনিংয়ে বেশ মজা করি। স্ট্রাইকারদের পেরিয়ে অনুশীলনে যখন গোল করি, ভাল লাগে। তবে ম্যাচে, তা-ও আবার আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে এমন গোল করব, কল্পনাতেও ভাবিনি। গ্রিজম্যান যখন সেন্টার করল তখন দেখলাম তাগলিয়াফিকো ক্লিয়ার করতে পারল না। আগে থেকেই মানসিকভাবে তৈরি হয়ে ছিলাম।

আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে গোলের পরে প্যাভা। — এএফপি

দেখুন সেই জাদু-গোলের ভিডিও...

ইউরোপে আপাতত সবথেকে দুর্মূল্য রাইট ব্যাক বলা হচ্ছে আপনাকে। চেলসি, ম্যাঞ্চেস্টার সিটি তো আপনাকে পাওয়ার জন্য প্যারিস পর্যন্ত ধাওয়া করেছিল। ‘না’ বললেন কেন?

বেঞ্জামিন পাভ্যা: ক্লাবে আমি স্টপার পজিশনে খেলি। তবে এখনও স্টুটগার্টের সঙ্গে কন্ট্র্যাক্ট রয়েছে আমার। এখানে থেকে যাওয়ার আরও একটা কারণ হল, বুন্দেশলিগাকে ভালবেসে ফেলেছি। আমার ভারতীয় বন্ধু জোসেফের সঙ্গে বসেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া। ভবিষ্যতেও নেব।

বিশ্বকাপ জিতে বৃষ্টির মধ্যেই উল্লাসের ডাইভ। — এএফপি

কেরিয়ারে অনেক বড় বড় ম্যানেজারের কোচিংয়ে খেলেছেন। এবার দেশঁ-এর কোচিংয়ে চ্যাম্পিয়ন হলেন। ফুটবলার হিসেবে পরিণতি পেয়েছেন বিশ্বকাপে। ‘গুরু’ হিসেবে মানেন কোন কোচকে?

বেঞ্জামিন পাভ্যা: স্টুটগার্টে আমার প্রথম কোচ ছিলেন হ্যানেস উলফ। অনুশীলনে উনি আমাকে একদমই স্বস্তিতে থাকতে দিতেন না। ব্যাপক ঘাম ঝরিয়েছি ওঁর কোচিংয়ে। তবে আমাকে অনেক স্নেহ-ও করতেন। কারণ উনি আমার মধ্যে প্রতিশ্রুতি দেখেছিলেন। বড় ফুটবলার হওয়ার রসদ রয়েছে, বুঝেছিলেন।
আর আমার ভারতীয় বন্ধু জোসেফও এক অর্থে আমার কোচ। প্রথম থেকে আমাকে উৎসাহ জুগিয়ে গিয়েছে। পেশাদারি ফুটবলার হওয়ার প্রাথমিক পাঠ আমাকে জোসেফ দিয়েছিল।

(বাঁ দিকে) প্রাক্তন স্টুটগার্ট বস হ্যানেস উলফ এবং (ডান দিকে) জাতীয় দলের কোচ দিদিয়ের দেশঁ-এর সঙ্গে। — গেটি ইমেজেস

বিশ্বকাপের ফাইনালে একটা ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছিল। সেই ভিডিওতেই ফাঁস হয়, ড্রেসিংরুমে কোচ দেশঁ আপনাদের সঙ্গে নিমগ্নভাবে গভীর আলোচনা সারছেন। উনি ঠিক কী টোটকা দিয়েছিলেন বিরতিতে, এটা কি বলা সম্ভব?

বেঞ্জামিন পাভ্যা: শুধু এটুকুই বলা যেতে পারে, উনি মানসিক ও শারীরিক সক্ষমতা ধরে রাখার পেপ-টক দিয়েছিলেন। ফুটবলার হিসেবে উনি চ্যাম্পিয়ন। মাঠ ও মাঠের বাইরে বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টের ফাইনালে ফুটবলারদের মনে কী চলে, তা ওঁর থেকে কে ভাল জানবেন! নিজের অভিজ্ঞতা দিয়েই চ্যাম্পিয়ন হয়ে ওঠার মন্ত্র দিয়েছিলেন প্রত্যেককে।

উত্তর ফ্রান্সের জেমুঁতে প্যাভার বাড়ির সামনে সমর্থকদের ঢেউ। — এএফপি

ফরাসি দলকে বলা হচ্ছে আফ্রিকান ও অভিবাসী ফুটবলারদের নিয়ে গড়া দল। বিশ্বকাপের শুরু থেকেই বিতর্ক চলছে। এই বিষয়ে আপনার ব্যক্তিগত অবস্থান কী?

বেঞ্জামিন পাভ্যা: যাঁরা এসব বলছেন, তাঁরা আসলে নিজেদের মনে ঘৃণা প্রতিপালন করেন। আমরা এসব নিয়ে একদম ভাবি না, বিশ্বাস করুন। দলের প্রত্যেকেই নিজেদের ফরাসি পরিচয় নিয়ে গর্বিত। আমি স্রেফ একটাই কথা বলব, রাশিয়া বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন দলের নাম ফ্রান্স।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্র এবং দলের সতীর্থদের সঙ্গে ট্রফি নিয়ে প্যাভা। — এএফপি

বিশ্বকাপ চলাকালীন এমন কিছু অভিজ্ঞতা শেয়ার করুন, যেটা অনেকেই জানেন না।

বেঞ্জামিন পাভ্যা: সেরকম কিছু নেই বন্ধু। সরি।

আপনি মাত্র ২২। আগামী ১০ বছরে নিজেকে কোন উচ্চতায় দেখতে চাইবেন?

বেঞ্জামিন পাভ্যা: ইতিমধ্যেই আমি বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন। কেরিয়ারে যত পারব ট্রফি জিততে চাই। আমার আপাতত লক্ষ্য, সামনের দশ বছরে আরও একটা বিশ্বকাপ এবং একটা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ট্রফি যেন আমার ক্যাবিনেটে ঢোকে।

নিজের শহর জেমুঁ-র মেয়র বেঞ্জামিন সাঁ হুইল-এর সঙ্গে প্যাভা। — এএফপি

আপনি হয়তো জানেন না গোটা টুর্নামেন্ট চলাকালীন বহু ভারতীয় আপনার দেশ ফ্রান্সকে সমর্থন করেছে। ১৯৯৮ সাল থেকেই অনেক ভারতীয় ফরাসিদের জন্য গলা ফাটায়। ভারতীয় ফুটবল নিয়ে কিছু শুনেছেন?

বেঞ্জামিন পাভ্যা: আমার সবথেকে কাছের বন্ধু জোসেফ ভারতীয়। ওঁর কাছ থেকে ভারতের অনেক খবর পাই। প্রায়ই রাতে ভারতীয় ফুটবল ও ফুটবলার আমাদের আড্ডার বিষয় হয়েছে। ওঁর কাছেই শুনেছি বেশ কিছু ভারতীয় ফুটবলার খুব দ্রুত বিশ্ব ফুটবলে নজর কাড়ছেন।

ভারতীয় বন্ধু জোসেফ মোহনের সঙ্গে বেঞ্জামিন পাভ্যা। — সংগৃহীত

আর একটা মজার ঘটনা শোনাই, জোসেফ একবার আমাকে ভারতীয় রেস্তোরাঁয় নিয়ে গিয়েছিল। তবে সরি,ভারতীয় ডিশ চেখে দেখতে পারিনি। কারণ হাত দিয়ে খেতে আমি অভ্যস্ত নই। হাহা!