রাজনৈতিক মহল তোলপাড়। সংবাদ জগতেও হুলুস্থূল। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নাগপুরে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের তৃতীয় বর্ষে প্রধান বক্তা প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়। না, এই পরিচয় নিয়ে গোলমাল বা চিন্তা নয়। আদ্যপান্ত কংগ্রেস ঘরাণার প্রণব গেরুয়া শিবিরের একেবারে অন্দরমহলে প্রবেশ করে ঠিক কী কী করতে পারেন তা নিয়েই চিন্তা।

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

এই আলোচনার আগে জেনে নেওয়া দরকার ঠিক কোন অনুষ্ঠানে প্রণব অতিথি হয়ে গিয়েছেন। 

মোহন ভাগবত ও প্রণব মুখোপাধ্যায়ের ছবিই বিজ্ঞাপন সঙ্ঘের।-- ছবি: আরএসএস

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ বা আরএসএস-এর সূচনা হয়েছিল ১৯২৫ সালের বিজয়া দশমীর দিনে। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের মারাঠি ছাত্র কেশব বলিরামরাও হেডগেওয়ার প্রতিষ্ঠা করেন এই সংগঠন। সেই নাগপুরের রেশমব‌াগে চলছে আরএসএস-এর ‘তৃতীয় বর্ষ সঙ্ঘ শিক্ষা বর্গ’।

প্রশিক্ষিত ক্যাডার ভিত্তিক সংগঠন আরএসএস-এর পদে পদে চলে প্রশিক্ষণ। বালক স্বয়ংসেবকদের জন্য বাল-প্রশিক্ষণ, শীতে পিকনিকের নামে শীতকালীন প্রশিক্ষণ এমন নানা কিছুর মধ্য দিয়ে স্বয়ংসেবক হয়ে উঠতে হয়। 

এমনই এক কুচকাওয়াজ দেখবেন প্রণব।-- ছবি: আরএসএস

এর পরে হয় প্রাথমিক শিক্ষাবর্গ। সাত দিনের সেই শিবিরেই প্রথম শারীরিক ও বৌদ্ধিক শিক্ষা শুরু হয়। আর সেখান থেকেই চলে বাছাই পর্ব। স্থানীয় অধিকারীরা বেছে নেন ভবিষ্যতে কার্যকর্তা হতে পারার সম্ভাবনা রয়েছে এমন বালকদের।

সেই বাছাই বালকদের উপরে প্রচারক (হোল টাইমার) ও অধিকারীদের নজর থাকে। ধীরে ধীরে তাদের পরিবারের সঙ্গে গড়ে তোলা হয় ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। এর পরে প্রতিটি রাজ্যে গরমের ছুটিতে হয় একাধিক ১৫ দিনের প্রথম বর্ষ সঙ্ঘ শিক্ষা বর্গ। 

রেশমবাগে স্মৃতিমন্দিরে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এপিজে আবদুল কালাম। -- ছবি: আরএসএস

শুরু হয় দ্বিতীয় পর্যায়ের নজরদারি। কার্যক্ষেত্রে সম্ভাবনাময়দের নিয়ে রাজ্যে রাজ্যে হয় দ্বিতীয় বর্ষ সঙ্ঘ শিক্ষা বর্গ। এরও আবার ভাগ রয়েছে। পড়ুয়াদের জন্য, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ীদের জন্য আবার প্রবীণদের জন্য আলাদা আলাদা জায়গায় ২০ দিনের বর্গ।

সর্বশেষ ও চূড়ান্ত প্রশিক্ষণ নাগপুরে। ফি বছর ঠিক এই সময়ে অর্থাৎ মে মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে জুনের প্রথম সপ্তাহ এক মাসের প্রশিক্ষণ। সেই প্রশিক্ষণে শারীরিক কসরত, খেলা, লাঠি চালনা, যোগাভ্যাস থেকে আদর্শগত জ্ঞানার্জন সবই চলে। 

এই প্রশিক্ষণ মানেই, সঙ্ঘের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি। পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সকলেই এই তৃতীয় বর্ষ সঙ্ঘ শিক্ষা প্রাপ্ত। সেই শিবিরেই যাচ্ছেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। এখান থেকেই নির্বাচিত ও মনোনিত হবেন আগামী দিনে সঙ্ঘ পরিবারের কর্তারা। কেউ যাবেন রাজনীতিতে, কেউ অন্যান্য সামাজিক ক্ষেত্রে আবার কেউ থাকবেন মূল আরএসএস-এ।

বুধবার প্রণবকে স্বাগত সঙ্ঘের। -- ছবি: আরএসএস

এক মাসের বর্গ শেষ হবে শুক্রবার সকালে দীক্ষান্ত ভাষণের পরে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রচারক আশিস মণ্ডলের নেতৃত্বে যাওয়া ৪০ জন স্বয়ংসেবকও ফিরবেন রাজ্যে। পাবেন নতুন দায়িত্ব। এমন করে গোটা দেশের সব রাজ্য থেকে আসা পাঁচ শতাধিক স্বয়ংসেবকের প্রশিক্ষণ শেষে প্রকাশ্য সমাবেশে বক্তব্য রাখবেন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি।

ফি বছর রাজ্যে রাজ্যে প্রতিটি প্রশিক্ষণ বর্গে এমন বক্তব্য রাখতে নিয়ে আসা হয় বিভিন্ন ক্ষেত্রের প্রতিষ্ঠিতদের। সাধারণত শিক্ষাবিদদের দিকেই নজর থাকে আরএসএস-এর।  

গত ২৬ মে এমনই এক বর্গ (প্রথম বর্ষ) শেষ হয়েছে হাওড়া জেলার তাঁতিবেড়িয়ায়। সেখানে মুখ্য অতিথি ছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য অভিজিৎ চক্রবর্তী। সারা বছর ধরেই চলে এমন অতিথি নির্বাচনের প্রক্রিয়া।

সেই নির্বাচন-প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এই বার তৃতীয় বর্ষের সমাপ্তিতে সত্যিই বড় লক্ষ্যভেদ। ভারতীয় রাজনীতির ছয় দশকের সদস্য, কংগ্রেস রাজনীতি‌র বহু লড়াইয়ের হোতা, প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়। আরএসএস-এর দিকে থেকে দেখতে গেলে এটা সত্যিই বড় সাফল্য।

কিন্তু প্রণববাবু কি ফাঁদে পা দিলেন! এমন প্রশ্ন ওঠা খুবই স্বাভাবিক।
বৃহস্পতিবার যে পরিবেশের মুখোমুখি হবেন প্রণব, সে অভিজ্ঞতা তাঁর সত্যিই নেই। 

নাগপুর মানে আরএসএস-এর কাছে তীর্থস্থান। আবার তার মধ্যেও রেশমবাগ হল—পবিত্র তীর্থভূমি। এমনিতেই রেশমবাগে প্রতিষ্ঠাতা হেডগেওয়ারের স্মৃতিমন্দির ঘিরে আবেগ কাজ করে সঙ্ঘ অনুগামীদের। ফলে এক সম্মোহক পরিবেশ তৈরি হবে। দেশপ্রেমের আবহে চলবে গোটা অনুষ্ঠান। মাঠে কুচকাওয়াজে প্রণব দেখবেন প্রশিক্ষিত সেরা স্বয়ংসেবকদের প্রদর্শন, এমন কী নকল যুদ্ধও। শুনবেন গান, গৈরিক ধ্বজের প্রতি হিন্দুরাষ্ট্র গড়ার প্রার্থনা।

সব শেষে বক্তব্য রাখবেন সঙ্ঘ প্রধান মোহন ভাগবত। আর তার ঠিক আগেই প্রণবের ভাষণ। আর তারও আগে পরিবেশিত হবে একটি একক সঙ্গীত। যে সঙ্গীত তৈরি করে দেবে এক অন্য রকম আবহ। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সেই পরিবেশ পোড় খাওয়া রাজনীতিক প্রণব মুখোপাধ্যায়কে কতটা প্রভাবিত করবে সেটা দেখার অপেক্ষাতেই গোটা দেশ।

তবে সেই অপেক্ষা, নানা জল্পনার মধ্যেই আরএসএস-এর পক্ষে জানানো হয়েছে কী উদ্দেশ্যে প্রণব মুখোপাধ্যায়কে নিশানা করেছে তারা। 

রাষ্ট্রপতি পদ থেকে প্রণব অবসর ন‌েওয়ার সময়ে প্রধানমন্ত্রী যে সুরে চিঠি লিখে প্রণব বন্দনা করেছিলেন সেই সুরেই কার্যত বক্তব্য পেশ করেছেন সঙ্ঘের প্রচার বিভাগের অখিল ভারতীয় প্রমুখ তথা সহ সরকার্যবাহ মনমোহন বৈদ্য। 

তিনি বলেছেন, ''প্রণববাবু একজন অভিজ্ঞ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। রাজনৈতিক বিবিধস্তরীয় বিষয়ে তাঁর নিরঙ্কুশ পাণ্ডিত্য। সঙ্ঘ পরিবার তাঁর পাণ্ডিত্যকে নজরে রেখেই তাঁর বিচার উপস্থাপনের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এখানে সঙ্ঘ পরিবার এবং বিদ্যার্থী, সবার সঙ্গেই তাঁর আলাপচারিতা হবে স্বাভাবিক ভাবেই। এর সরল ফলস্বরূপ, তিনি সঙ্ঘকে প্রত্যক্ষ ভাবে জানবেন। এমন ভাবে ভাবের আদান-প্রদান, পরস্পরকে জানা তো আমাদের, ভারতের, প্রাচীন পরম্পরা। তবে এতে এত বিরোধিতা কোন যুক্তিতে?''