১৯৪৭ সালে দেশভাগের পরে পূর্ব বাংলায় রবীন্দ্রচর্চার ক্ষেত্রে কোনও প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়নি। বেসরকারিভাবে রবীন্দ্রজয়ন্তী উদ্‌যাপিত হয়েছে, সরকারি বেতারকেন্দ্র থেকে রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে আলোচনা এবং রবীন্দ্রনাথের কবিতা গান ও নাটক সম্প্রচারিত হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে প্রথম রবীন্দ্র বিরোধিতা দেখা দেয় গোপন কমিউনিস্ট পার্টি এবং তার প্রভাবাধীন প্রকাশ্য সংগঠন প্রগতি লেখক-শিল্পী সঙ্ঘের পক্ষ থেকে। অবশ্য এ বিষয়ে তাদের সদস্যদের মধ্যে কিছু মতান্তরও ছিল। পূর্ব বাংলায় তখন কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাব তেমন ব্যাপক ছিল না, যেমন ছিল মুসলিম লিগের প্রভাব। মুসলিম লিগের কোনও বক্তব্য ছিল না রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে। কিন্তু তাদের রাজনৈতিক সমর্থক বিশিষ্টজনেদের মধ্যে সৈয়দ আলী আহসান ১৯৫০ সালে লিখেছিলেন যে, জাতীয় সংহতির প্রয়োজনে তাঁরা রবীন্দ্রনাথকে ত্যাগ করতেও প্রস্তুত। রবীন্দ্রনাথ ও পাকিস্তানের জাতীয় সংহতি যে একযোগে যেতে পারে না, সেটাই ছিল তার 
প্রথম প্রকাশ।
১৯৬১ সালে যখন সারা পৃথিবীতে রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষ পালনের উদ্যোগ দেখা দেয় তখন পাকিস্তানে তার ছায়াও দেখা যাচ্ছিল না। খোঁজ নিয়ে জানা গেল যে, বাংলা একাডেমি এ বিষয়ে কোনও উদ্যোগ নিচ্ছে না। তখন এ সম্পর্কে আলোচনার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষ মুহম্মদ আবদুল হাই তাঁর অফিসকক্ষে একটি প্রাথমিক ও অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের ব্যবস্থা করেন। এতে যোগ দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা, ইংরেজি ও দর্শন বিভাগের কয়েকজন শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ও তৎকালীন কিছু ছাত্র এবং দু’একজন সংস্কৃতিকর্মী। এখানে দ্বিতীয়বারের সভা ছিল অনেকটা আনুষ্ঠানিক এবং সেখানেই ঢাকা হাইকোর্টের বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মুরশেদকে সভাপতি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক খান সারওয়ার মুরশিদকে সম্পাদক করে গঠিত হয় রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষ উদ্‌যাপন কমিটি। একই লক্ষ্যে কবি সুফিয়া কামালের সভাপতিত্বে আরেকটি কমিটি গঠিত হয়। তা পরিচিত হয় ওয়ারীর বা গোপীবাগের কমিটি বলে। তৃতীয় একটি কমিটি গড়ে উঠেছিল প্রেসক্লাবকে ঘিরে— যদিও সাংবাদিক নন, এমন অনেকেই তাতে ছিলেন। 

এসব তৎপরতায় সরকার বেশ বিব্রত হয়েছিল। সুফিয়া কামালকে এক সচিব জিজ্ঞাসা করেছিলেন, এসব কী হচ্ছে? তিনি জবাব দিয়েছিলেন, সারা পৃথিবীতে যা হচ্ছে, তাই। গোয়েন্দা বিভাগের লোক এসে বিচারপতি মুরশেদকে বলেছিল, রবীন্দ্রশতবার্ষিকীর জন্য ভারতীয় হাইকমিশন টাকা ঢালছে— হাইকোর্টের বিচারকের পক্ষে কি তেমন ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট থাকা সংগত? বিচারপতি বলেছিলেন, আমি দেখব যাতে তেমন অর্থ আমাদের হাতে না আসে। তিনি আমাদের বলেও দিলেন, আমরা কেউ যেন এই অনুষ্ঠানের জন্য অর্থ সংগ্রহ না করি। অর্থ যা লাগে, তা তিনিই দেবেন। আমরা তো অবাক! বিচারপতি টাকা চাইবেন কার কাছে? পরে জেনেছিলাম, পুলিশের ইনস্পেক্টর জেনারেলকে তিনি বলেছিলেন অর্থ সংগ্রহ করতে এবং আইজি তা করে দিয়েছিলেন।
প্রথমে স্থির হয়েছিল, তিন কমিটি মিলে একযোগে ১০ দিন অনুষ্ঠান করবে। পরে তা ৭ দিনে নামিয়ে আনা হয়। মূল অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি। দ্বিতীয় কমিটির অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেছিলেন বিজ্ঞানী মুহম্মদ কুদরাত-এ-খুদা। আলোচনায়, কবিতায়, গানে, নৃত্যে, নাটকে অনুষ্ঠানগুলি খুব আকর্ষণীয় হয়েছিল। শেষ দিন একটু উত্তেজনার ব্যাপার হয়েছিল। তবে তা সামলে নেওয়া গিয়েছিল। 

রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষের অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার অন্তত একমাস আগে থেকে একটি বাংলা দৈনিকে রোজই এর বিরোধিতা করে লেখা হয়। বলা হয়, রবীন্দ্রনাথ হিন্দু ভাবাপন্ন এবং মুসলিমবিদ্বেষী। তাই পাকিস্তানের সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তিনি অগ্রহণীয়। অন্য দু’টি বাংলা দৈনিক তার প্রতিবাদ করেছিল— তা-ও ওই মাস জুড়েই। যেদিন আমরা শতবর্ষ উদ্‌যাপনের সূচনা করি সেদিনই ঢাকায় একটি আলোচনাসভার অনুষ্ঠান হয়। রবীন্দ্রনাথের প্রতি কটুকাটব্য করাই ছিল তার উদ্দেশ্য। তবে সারা প্রদেশেই জন্মশতবর্ষ উদ্‌যাপিত হয়েছিল। ঢাকার বাইরে সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠান হয়েছিল চট্টগ্রামে— এর নেতৃত্বে ছিলেন একজন সরকারি কর্মকর্তা, এম এ বারী, পূর্ব পাকিস্তান রেলওয়ে 
বোর্ডের প্রধান।
১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের সময় পাকিস্তানে ভারতীয় পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ হয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথের বইপত্রও সেই শ্রেণিভুক্ত হয়ে যায়। তখন গ্রন্থস্বত্ব আইন লঙ্ঘন করে 
তাঁর অনেক বইয়ের পুনর্মুদ্রণ হয়েছিল ঢাকায়। 

১৯৬৭ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে কেন্দ্রীয় তথ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন যে, পাকিস্তানের ভাবাদর্শবিরোধী বিবেচিত হওয়ায় রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যম থেকে রবীন্দ্রসংগীতের প্রচার ক্রমশ হ্রাস করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর প্রতিবাদে ১৯ জন নাগরিক এক যুক্ত বিবৃতি দেন। তার স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে ছিলেন বিজ্ঞানী মুহম্মদ-এ-খুদা ও কাজী মোতাহার হোসেন, শিল্পী জয়নুল আবেদিন, অধ্যাপক মুহম্মদ আবদুল হাই ও মুনীর চৌধুরী, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা এম এ বারী। এতে রবীন্দ্রনাথকে ‘বাংলাভাষী পাকিস্তানিদের সাংস্কৃতিক সত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ’ বলে অভিহিত করা হয়। অনেকে এই মন্তব্যের বিরোধিতা করেন এবং সরকারি পদক্ষেপ সমর্থন করে বিবৃতি দেন। অনেকে তারও বিরোধিতা করেন। শেষে সরকার নির্দেশ দেয় যে, এ বিষয়ে আর কোনও বিবৃতি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হবে না। তবে সভা-সমিতি তো আর বন্ধ করা যায়নি ! আলোচনাসভার নামে সরকারি নীতির প্রতিবাদে বেশ কয়েকটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। তার একটিতে অংশ নিয়েছিলেন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ইসলামিক একাডেমির পরিচালক আবুল হাশিম, যিনি অবিভক্ত বাংলায় মুসলিম লিগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। সেবার বাইশে শ্রাবণ খুব বড় করে উদ্‌যাপিত হয়। তখন থেকে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি নানা সভায় ও অনুষ্ঠানে নিয়মিত গাওয়া হতে থাকে। মুক্তিযুদ্ধের সময় বিশেষ করে এই গানটি গাওয়া হয়। 

■বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করলে গানটির প্রথম ১০ চরণ জাতীয় সংগীতের মর্যাদা লাভ করে। 
(মতামত লেখকের নিজস্ব)