জীবনের নাম ফুটবল, আবার কখনও কখনও মৃত্যু-বিভীষিকারও। ফুটবল বাঁচতে শেখায়, আবার ভয়াল দুঃস্বপ্নও ‘উপহার’ দেয়! জীবন-মৃত্যুর এই ফুটবল বোধ নিয়েই আপাতত ‘ট্রমা’য় রয়েছেন বেলেঘাটার ঋচিক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বেলঘরিয়া নিবাসী তাঁর বান্ধবী। মঙ্গলবারের মোহনবাগান মাঠে গিয়েই যে যত অমঙ্গলের সূত্রপাত! মোহনবাগান সমর্থকদের হাতে বেধড়ক মার খেয়ে আপাতত ক্ষণে ক্ষণে আঁতকে উঠছেন ঋচিক ও তাঁর বান্ধবী।

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

তাঁর অপরাধ? রেনবো এফসি-র হয়ে অভিজিৎ সরকার প্রথম গোল করতেই সবুজ-মেরুন সমর্থক পরিবৃত গ্যালারিতে সামান্য উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে ফেলেছিলেন! ভীষণ এই ‘অপরাধ’ করে ফেলতেই চারদিক থেকে ভেসে এল মুষ্ঠিবদ্ধ হাত। মুহুর্মূহু জুটল কিল, চড়, লাথি।

প্রথমার্ধে ভারী ভিজে মাঠে বল হোল্ড করতেই সমস্যায় পড়ছিলেন দু’দলের ফুটবলাররা। মাঝমাঠ দাপটে খেললেও ডিকাদের ফিনিশিং ঠিকমতো হচ্ছিল না। গ্যালারি থেকে অরিজিৎ, সৌরভদের উদ্দেশে ভেসে আসছিল চোখা চোখা বিশেষণ। এমন অবস্থাতেই ৩৯ মিনিটে ফ্রি কিক থেকে গোল করে যান অভিজিৎ। হতাশার রেশ মেটাতেই এর পরে গ্যালারি উত্তপ্ত! সৌজন্যে বেলেঘাটার ঋচিক।

বিরতিতে যখন ঋচিককে ধরা হল, গ্যালারির একপ্রান্তে পুলিশ পরিবেষ্টিত অবস্থায়, তখনই তিনি ঘোরে রয়েছেন বছর পঁচিশের সুদর্শন যুবক। বাঁ দিকের চোখের নীচ রক্তাক্ত, চশমার কাঁচ ভেঙে চুরমার। উসকো খুসকো চুল আর অবিন্যস্ত জামা ঠিক করতে করতে বলছিলেন, ‘‘ছোটবেলা থেকেই আমি মোহনবাগান অন্তপ্রাণ। ডার্বিতে প্রায়ই খেলা দেখি সল্টলেক স্টেডিয়ামে। তবে বহুদিন আসিনি মোহনবাগান মাঠে। বান্ধবীর জোরাজুরিতেই এদিন আসা।’’ বান্ধবী আবার রেনবো এফসি-র কোচ তড়িৎ দত্তের মেয়ে।

শুনুন ঋচিকের বক্তব্য...

তড়িৎবাবু নিজেও মোহনবাগান সমর্থক। তবে পেশাদারি তাগিদেই রেনবো এফসি-র কোচ হয়ে ঘরের মাঠে এসেছিলেন। নিজের বাবা না প্রিয় মোহনবাগান— এমন দোটানায় ভুগছিলেন ঋচিকের বান্ধবী! তড়িৎবাবুর রেনবো বনাম মোহনবাগান— দুর্ধর্ষ দ্বৈরথের আগাম আঁচ পেয়েই বন্ধু ঋচিকের কাছে আবদার করেছিলেন প্রিয় গ্যালারিতে বসেই এই ম্যাচ দেখবেন। সঙ্গী হয়েছিলেন কলেজ ফ্রেন্ড সৌতিক ঘোষ। সেই আবদার যে কালবৈশাখী ঝড়ের মতো তাঁর জীবনে আছড়ে পড়বে, তা বোধহয় দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি তিনি!

ঋচিক যখন নিজেকে সামলাতেই ব্যস্ত, তখন তাঁর বান্ধবী প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ, ‘‘মোহনবাগানকে ছোটবেলা থেকে সাপোর্ট করি। এটা আমাদের ফ্যামিলির ভালবাসা। ক্লাবের প্রতি ভালবাসাটাই চলে গেল এদিনের পর থেকে।আমাদের যখন নিগ্রহ করা হচ্ছিল, তখন চারপাশে অসংখ্য মোহনবাগান সমর্থক। ওদের দেখে মনে হয়েছে মদ্যপ। সাহায্যের জন্য কেউ এগিয়ে আসেনি।’’

নিজের বাবাকেও সমর্থন করতে পারব না?’’ পালটা প্রশ্ন তাঁর। ঋচিকের বন্ধু সৌতিক জানালেন, ‘‘গ্যালারির শয়ে শয়ে সমর্থকের গণধোলাই দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিল।আমার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে ক্লাবের মেম্বারশিপ কার্ডও। ঠিক সময়ে পুলিশ না এলে কী যে হত!’’ বলেই শিউরে উঠছেন বিরাটির যুবক। সমর্থকদের অপ্রীতিকর ব্যবহারের কারণে এর আগে প্রায়ই ফিফা বিভিন্ন দেশের ফুটবল সংস্থাকে ‘শাস্তি’ দিয়েছে। ইউরোপীয় ফুটবলেও হামেশাই উয়েফা বিভিন্ন ক্লাবকে জরিমানা করে সমর্থকদের ব্যবহারের জন্য। কিন্তু কলকাতা ফুটবলে?

আইএফএ সচিব উৎপল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানিয়ে দেন, ‘‘নিঃসন্দেহে খারাপ ঘটনা। অভিযোগ জানালে তদন্ত করে দেখা হবে।’’ কড়া ভাষায় মোহনবাগানের বর্তমান ফুটবল-সচিব স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায়ও সতর্ক করেছেন সমর্থকদের, ‘‘আমি ইতিমধ্যেই রেনবো এফসির ম্যানেজারকে জানিয়েছি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ করার জন্য। তারপরে ক্লাবের পক্ষ থেকে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’

এত কাণ্ড যাঁর কোচিংকে ঘিরে সেই তড়িৎবাবু প্রতিবেদকের কাছ থেকেই নিজের মেয়ে ও বন্ধুদের নিগৃহীত হওয়ার কথা প্রথমবার শোনেন। তাঁকে আশ্বস্ত করে বলা হয়, প্রতিবেদক নিজেই অ্যাপ ক্যাব বুকিং করে নিগৃহীত তিন সমর্থককে বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। মোহনবাগান মাঠ থেকে বাড়ি ফেরার সময়ে এমন ভয়াবহ খবর পেয়ে তিনি জানিয়ে দেন, ‘‘আর কোনওদিন মেয়েকে ফুটবল মাঠে পাঠাব না।’’ 

 ঋচিক নিজে সেন্ট পলস কলেজে ইংরেজির অধ্যাপক। চুণী গোস্বামীর সম্পর্কিত আত্মীয়। ইউরোপীয় ফুটবলের বড় ভক্ত। মেজর সকার লিগে খেলতে চলে যাওয়া ইব্রা কিংবা পিএসজি-র খেলা হলেই রাত জাগেন। তবু শহরের ফুটবল প্রেম বদলায়নি। মোহনবাগান-ই তাঁর প্যাশন।  সেই প্যাশন-ই মঙ্গলবারের পর থেকে ‘মরে গেল’, অ্যাপ ক্যাবে ওঠার আগে বলে যান ঋচিক।