অর্ধেক বয়সের ‘যুবকরা’ অনেকেই দেহ রাখছে। শরীরে নানা রোগ বাসা বেঁধেছে। কারও কারও নাকি আয়ুও ইতিমধ্যে ফুরিয়েছে। কিন্তু ৭৫ পেরিয়ে সে এখনও মানুষের ভরসা। ব্রিজ-আতঙ্কের বাজারেও হাওড়া ব্রিজ নিয়ে আশ্বস্ত আমজনতা। 

কিন্তু ৩৫-৪০ বছরের পুরনো সেতুকেই যেখানে মেয়াদ উত্তীর্ণ বলে ঘোষণা করা হচ্ছে, সেখানে কোন জাদুতে আজও দৈনিক লক্ষ গাড়ির ভার বইছে ‘বৃদ্ধ’ হাওড়া ব্রিজ?

বিশেষজ্ঞ এবং কলকাতা পোর্ট ট্রাস্ট কর্তারা বলছেন, এ প্রশ্নের উত্তর খুবই সহজ। নিয়মিত নজরদারি আর রক্ষণাবেক্ষণেই আজও সতেজ কলকাতার এই অনন্য স্থাপত্য। যার পোশাকি নাম রবীন্দ্র সেতু।

গ্রাফিক্স- বিশ্বজিৎ দাস

৭৫-এ পা দেওয়া হাওড়া ব্রিজও যে মানুষ এবং গাড়ির চাপ সইতে সইতে ক্লান্ত হয়নি, তা নয়। শিবপুর আইআইইএসটি-র বিভাগের অধ্যাপক এবং সেতু বিশেষজ্ঞ অরুণকুমার চক্রবর্তী জানালেন, ‘‘১৯৯৪ সালে হাওড়া ব্রিজের পঞ্চাশ বছর পূর্তির সময়েই তার আয়ু ফুরিয়ে এসেছিল। সেই সময় যুদ্ধকালীন ভিত্তিতে অভিজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ারদের পরামর্শ নিয়ে সেতুর প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হয়েছিল। যার ফলে ওই সেতুর আয়ু আরও পঞ্চাশ বছর বেড়ে গিয়েছিল।’’

আজও অক্লান্ত হাওড়া ব্রিজ, দেখুন ভিডিও

 

কলকাতা পোর্ট ট্রাস্টের কর্তারাও বলছেন, হাওড়া ব্রিজের উপরে নিরন্তর নজরদারিই সেতুর সুস্বাস্থ্যের চাবিকাঠি। শুধুমাত্র হাওড়া ব্রিজের রক্ষণাবেক্ষণের জন্যই সেতুর পাশে আলাদা অফিস রয়েছে। একজন সিনিয়র একজিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ারের নেতৃত্বে সেখান থেকেই ব্রিজের স্বাস্থ্যের উপরে খেয়াল রাখা হয়।

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাওড়া ব্রিজেও স্বভাবতই নানাবিধ সমস্যা দেখা দিয়েছে। কিন্তু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তৎক্ষণাৎ। হাওড়া ব্রিজের ভার ধরে রাখার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে সেতুর দু’পাশের ৭৮টি হ্যাঙার। সেতুর ফুটপাথের পাশেই হ্যাঙারগুলির গোড়া দিয়ে জল ঢুকে ঢুকে সেতুর নীচে লোহার ক্রস গার্ডারগুলিতে জং পড়ে যাচ্ছিল। এই সমস্যা নজরে আসতেই ২০০১ সালে জল ঢোকা বন্ধ করতে হ্যাঙারগুলির গোড়ায় ধাতব আচ্ছাদনের ব্যবস্থা করা হয়। এর সুফলও পাওয়া গিয়েছিল।

গুটখার পিকে জং ধরেছিল সেতুতে। (ডানদিকে) সেতু বাঁচাতে
ফাইবারের আচ্ছাদন। ফাইল চিত্র

পোর্ট ট্রাস্টের হিসেব বলছে, হাওড়া সেতুর উপর দিয়ে দৈনিক প্রায় ৫ লক্ষ মানুষ যাতায়াত করেন। সেই ভারও নিশ্চিন্তেই সইছে হাওড়া ব্রিজ। কিন্তু সইতে পারছে না গুটখা আর পানের পিকের অত্যাচার। জল ঢোকা আটকাতে সেতুর ফুটপাত লাগোয়া হ্যাঙারগুলির গোড়ায় যে ধাতব আচ্ছাদন লাগানো হয়, পান এবং গুটখার পিক পড়ে পড়ে সেগুলিতেও জং পড়তে শুরু করে। কারণ পাতলা স্টিলের ওই আচ্ছাদনগুলি গুটখার পিকে মিশে থাকা অ্যাসিড জাতীয় রাসায়নিকের ঝাঁজ সহ্য করতে পারেনি। বাধ্য হয়ে সেই ধাতব আচ্ছাদনগুলি সরিয়ে দিয়ে তার বদলে ফাইবার গ্লাসের আচ্ছাদন বসাতে শুরু করে পোর্ট ট্রাস্ট। এভাবেই অসুখ শরীরকে অকেজো করার আগেই ব্যবস্থা নিয়ে হাওড়া ব্রিজকে সচল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

গ্রাফিক্স- বিশ্বজিৎ দাস, ছবি- শেলি মিত্র।

হাওড়া ব্রিজের রক্ষণাবেক্ষণে শেষ আর্থিক বছরেও প্রায় তিরিশ লক্ষ টাকা খরচ করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এছাড়াও আলোর সাজ, বিদ্যুতের বিলের বিপুল খরচা রয়েছে। নিয়মিত যত্ন নেওয়ার মধ্যে অবশ্যই পড়ে রং করা। ১৫০০ ফুট লম্বা, ২৬৯ ফুট উঁচু হাওড়া সেতুর গায়ে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর নতুন রংয়ের প্রলেপ পড়ে। শেষবার রং হয়েছিল ২০১৪ সালে। পোর্ট ট্রাস্টের তথ্য অনুযায়ী, সেবারে খরচ হয়েছিল প্রায় তিন কোটি টাকা।

রাজ্য পরিবহণ দফতরের হিসেব অনুযায়ী, ২০০৭ সালে হাওড়া সেতুর উপর দিয়ে দৈনিক ১ লক্ষ ১৫ হাজার গাড়ি চলাচল করে। সপ্তাহান্তে যা কমে দাঁড়ায় ৯৫ থেকে ৯৯ হাজার। এক দশকে সংখ্যাটা বেড়েছে বই কমেনি। তবু ৭৫-এও হাওড়া ব্রিজ নট আউট। রক্ষণাবেক্ষণের অভাব নেই, আমজনতা আর একটু যত্নশীল হলেই আরও দীর্ঘায়ু হবে হাওড়া ব্রিজ।