লোকটা মারা যাওয়ার পরে পুলিশ তার রক্তে বিষ পেয়েছিল। লোকটা বেঁচে থাকার সময় সমাজ ভেবেছিল, তার রক্তে সত্যিই ‘বিষ’ আছে। লোকটা মরে যাওয়ার আগে বলেছিল, ‘ভাবছি রিটায়ারমেন্টের পরে আমেরিকা চলে যাব। ওদেশে আমাদের মতোদেরও লোকে সম্মান করে...’।

হনসল মেটার ‘আলিগড়’এ মনোজ বাজপেয়ী অভিনীত চরিত্রটি যে মুহূর্তে খুব শান্ত গলায়, খুব অমায়িকভাবে, কোনও অভিযোগ ছাড়া এই মন্তব্যটি করে, ‘দেশপ্রেম’ সংক্রান্ত সমকালীন যাবতীয় ‘ডিসকোর্স’ কেমন ভ্রান্ত মনে হয়! লোকটার নাম ছিল শ্রীনিবাস রামচন্দ্র সিরাস। বাস্তব চরিত্র। আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের মরাঠি ভাষা শিক্ষার অধ্যাপক। কবিতা লিখতেন। লতা মঙ্গেশকরের গান শুনতেন। একাই থাকতেন। আরও অনেক ভারতীয়ের মতো। ঘটনাচক্রে সমকামী ছিলেন। আরও অনেক ভারতীয়ের মতোই। কিন্তু সম্মানের খোঁজে দেশ ছা়ড়ার কথাই ভাবতে হয়েছিল তাঁকে। মরে গিয়ে অবশ্য সে দায়বদ্ধতাও পার করেছিলেন তিনি। কিন্তু দেশের আইন এবং ‘আয়রনি’র একটা দায়বদ্ধতা রয়ে গেল তাঁর কাছে। যেখানে সংবিধানের ৩৭৭ নম্বর ধারার বিরুদ্ধতা করে তাকে যখন ‘ডি-ক্রিমিনালাইজ’ করা হচ্ছে, দেশেরই এক প্রান্তে তখন একজন অধ্যাপককে সইতে হচ্ছে চরম লাঞ্ছনা! দেশ তাঁর সম্মানরক্ষা করতে পারেনি। ‘দেশ’ই কি খুন করল তাঁকে?

এই প্রশ্নগুলোই পরিচালক তুলেছেন ছবিতে। তবে প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে তিনি বলেননি সিরাসের গল্প। সমকামীদের অধিকার রক্ষার পক্ষেও সওয়াল তোলেননি। ‘আলিগড়’ অ্যাক্টিভিজ্ম ফিল্ম নয়। একজন মানুষের কিছু অনুভূতি নিয়ে সমাজে স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারার শর্তগুলোকে চিহ্নিত করতে পারার সুযোগ বরং। ছবির গল্পে তাই বোকা সেন্টিমেন্ট এবং অযথা উপদেশ দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি পরিচালক। সিরাসকে যখন আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একঘরে করে দিচ্ছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে হয়ে যাওয়া ‘স্টিং অপারেশন’এর বৈধতা যাচাই করছেন না, তখন একজন ‘মানুষ’এর অসহায়তা দেখতে পাওয়া গিয়েছে পরদায়। যে মানুষের অধিকার রক্ষার কথা বলে, সে যে দেশের নাগরিক, সেখানকার সংবিধান। তার যৌন নির্বাচনটা সেখানে প্রাথমিক বিচার্য নয়। কিন্তু সংবিধান যাঁরা বানান, শোধরান, কাটেন, ছাঁটেন— তাঁদের কাছে? কিংবা চারপাশে দেখতে পাওয়া বাড়িওয়ালা, প্রতিবেশী, সহকর্মী, ডাক্তার, উকিল, সাংবাদিকদের কাছে? মুশকিলটা হচ্ছে, তাঁরাও নাগরিক। নিজেদের মতো করে তাঁদেরও ‘অধিকার রক্ষা’র জমিন আছে বইকী! মামলায় জিতে গেলেও তাই মৃত্যুকেই প্রিয় বলে মনে করতে হয় সিরাসদের!

তা বলে মানবিকতাকে পাশ কাটিয়ে যাননি পরিচালক। মানবচরিত্রের দলিলে একপেশে মনোভাব না রাখাটাই এক্ষেত্রে হনসলের মুনশিয়ানা। তিনি সিরাসের পাশে দীপুর (রাজকুমার) মতো চরিত্রকে একটা অবলম্বনের মতো করে দেখালেন। যে দীপু ‘সেক্স স্ক্যান্ডাল’এর লেবেল সেঁটেই একটা ঘটনাকে বিচার করেনি। যে দীপু সাংবাদিক হয়েও তার ‘স্টোরি’র ক্ষেত্রে মানবিক। যে দীপু ‘স্টোরি’র বিষয়কে নিজের বন্ধু হতে দেয়। তাকে বাঁচাতে নিজের হাত বাড়িয়ে দিতে দ্বিধা করে না।

একটা ছবিকে কোনও রকম ‘এনটারটেনমেন্ট’এর মাত্রা থেকে সরিয়ে রেখে কীভাবে পরদা-জয়ী করতে হয়, তার একটা পাঠ দিল ‘আলিগড়’। মনোজ বাজপেয়ীর অভিনয় হয়তো তার বিরাট একটা অধ্যায়। এই মানুষটাই কাল্ট ছবি ‘গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর’এর নারীলোভী, খুনে চরিত্র হয়ে উঠেছিলেন, সিরাসের চরিত্রে তাঁকে দেখে বিশ্বাস করা যায় না! এতটা কোমল, নম্র, বিনয়ী, ক্ষয়াটে চেহারার অধ্যাপককে দেখে সহমর্মিতা আসতে বাধ্য। মনোজকে কুরনিশ! তিনি বিশ্বাস করাতে পেরেছেন তাঁর চরিত্রের যন্ত্রণাকে। ঠিক ঠিক সঙ্গত করে গেলেন রাজকুমার রাও’ও। আশিস বিদ্যার্থী সিরাসের চরিত্রের পক্ষে সওয়াল করা উকিলের ভূমিকায় যথাযথ। ‘আলিগড়’ সত্যিই প্রমাণ করে দিল, থিয়েটারকর্মীদের পরদার ওপারে রাখলে মিউজিক, সিনেম্যাটোগ্রাফি, টেকনিক সব ‘সেকেন্ডারি’ হয়ে যায়।

তবে ছবি দেখে বার বার মনে হচ্ছিল, কয়েকটা দৃশ্য বাদ দিতেই পারতেন পরিচালক। কেমন যেন টেনে লম্বা করা হয়েছে মনে হচ্ছিল এর দৈর্ঘ্য। গতিও বড্ড ধীর। ছবির বিষয়ের সঙ্গে তুলনা করলে যেটা ভারী নিস্তেজ মনে হতে পারে। হয়তো ছবির দু’ঘণ্টার ফিচার লেংথকে রাখার একটা দায়বদ্ধতা ছিল। দর্শকের প্রতি দায়বদ্ধতা গুরুত্ব পেলে আরও ভাল লাগত...এই যা!