টেলিপর্দায় তাঁর চরিত্রগুলি খুব আবেগপ্রবণ। বিশেষ করে এই মুহূর্তে জি বাংলা-র ধারাবাহিক ‘জয়ী’-তে তাঁর চরিত্রটি যেমন, সেই ইরাবতী খুব স্পর্শকাতর একজন মানুষ। সঞ্চারী যে খুব সংবেদনশীলতার সঙ্গে ইরাবতীকে তুলে ধরেছেন, সেটা দর্শক জানেন। ব্যক্তিগত জীবনেও ঠিক  একই রকম    সংবেদনশীল তিনি। বিশেষ করে ইরাবতী-কে এখন যেভাবে দেখেন দর্শক, সঞ্চারী ব্য়ক্তিগত জীবনেও তেমন। ভীষণভাবে পরিবারকে আঁকড়ে থাকা একজন মানুষ। 

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

ছবি সৌজন্য: সঞ্চারী মণ্ডল

বাবা-মায়ের সঙ্গে তাঁর খুব নিবিড় যোগাযোগ ছিল ছোটবেলা থেকেই। নিউক্লিয়ার ফ্যামিলিতে মানুষ হলেও যৌথ পরিবারের মূল্যবোধ নিয়েই মানুষ হয়েছেন তিনি এবং সেই মূল্যবোধটা সঞ্চারীর মধ্যে তৈরি করেছেন তাঁর অভিভাবকেরাই। শুধু তাই নয়, সাংস্কৃতিক বোধটাও তৈরি হয়েছিল তাঁর মায়ের হাতেই। ‘‘আমরা তখন যে বাড়িটাতে থাকতাম, সেখানে লোডশেডিং হলে বা ঝড় উঠলে আমরা তিনজনে একসঙ্গে শুয়ে শুয়ে ঝড় দেখতাম জানলা দিয়ে। ওই সময়গুলোতে আমার মা খুব গান গাইত, বিশেষ করে রবীন্দ্রসঙ্গীত,’’ স্মৃতিচারণা করেন সঞ্চারী, ‘‘আমার প্রথম স্টেজে ওঠা, আমার নাচ শেখা, পড়ানো সব কিছুতেই সব সময় জড়িয়ে থেকেছে মা। টেপরেকর্ডারে ব্ল্যাঙ্ক ক্যাসেট ঢুকিয়ে আবৃত্তি রেকর্ড করা বা শ্রুতিনাটক রেকর্ড করা খুব প্রিয় খেলা ছিল মায়ের আর আমার।’’  

ছবি সৌজন্য: সঞ্চারী মণ্ডল

কিন্তু তিনি মনে করেন সন্তান হিসেবে তিনি খুব খারাপ— ‘‘আমি সন্তান হিসেবে খুব খারাপ। আমি ভাবতাম আমার বাবা খুব স্ট্রং মানুষ। কিন্তু গত পাঁচ বছর ধরে বাবা হার্টের পেশেন্ট। অজান্তে অনেক কষ্ট দিয়েছি। আমি যখন ইন্ডাস্ট্রিতে আসি, আমার মা অনেক বড় বড় ব্যাগ বয়ে নিয়ে আসত। এসি মেকআপ রুম সব সময় পেতাম না। দেখতাম মায়ের খুব কষ্ট হচ্ছে, বার বার রুমাল ভিজিয়ে মুখে দিচ্ছে। এই করে করে মায়ের হাই প্রেশার হয়ে যায়’’, বলে চলেন সঞ্চারী, ‘‘কিন্তু আজ পর্যন্ত আমার মায়ের কাছে কখনও না শুনিনি। যে কোনও পরিস্থতিতে মা একটাই কথা বলে— ঈশ্বরে বিশ্বাস রাখ, পেয়ে যাবি বা হয়ে যাবে। আমার আজকাল খুব ভয় হয় বাবা-মাকে হারানোর। এমন এক একটা দিন গিয়েছে, আমি ঘুম ভেঙে উঠে দেখেছি আমার বাবা-মা নিঃশ্বাস নিচ্ছে কি না।’’

ছবি সৌজন্য: সঞ্চারী মণ্ডল

গত এক বছরে অনেকটা পরিবর্তন এসেছে সঞ্চারীর জীবনে। কাজের প্রয়োজনে এখন টালিগঞ্জ এলাকায় একা থাকতে হয়। এই একা থাকার সময়টাই তাঁকে আরও বেশি করে ভাবিয়েছে বাবা-মায়ের কথা। সন্তানকে নিয়ে তাঁদের ছোট ছোট নানা সুখ-দুঃখ-আশা-আকাঙক্ষার কথা। ‘‘জীবনের এই মুহূর্তে, জীবনে সম্পর্ক থাকা না থাকা, অনেক ভাঙাগড়ার মধ্যে দিয়ে যখন যাচ্ছি, তখন অনেক সময়েই নিজেকে সামলাতে পারছি না। মা এখন অনেকটা সময় আমার কাছে থাকে। সন্তানের ক্ষেত্রে মায়ের চোখ একটা বড় জিনিস। কোনও কিছু দেখে বা কোনও মানুষকে দেখে মা যেটা বলবে সেটা অনেকটা মিলে যায়। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে’’, বললেন সঞ্চারী। 

ছবি সৌজন্য: সঞ্চারী মণ্ডল

আসলে সন্তানকে তো আর চিরদিন আগলে রাখা যায় না। একটা সময় পরে তাকে ছেড়ে দিতে হয়। কিছু কিছু ভুল সে করবে তা জেনেও। কিন্তু পড়ে গিয়ে আবারও উঠে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা যদি বাবা-মায়ের থেকে পাওয়া যায় তবে সন্তান অনেকটা শক্তি পায়। আর এভাবেই একটা সময় পরে সন্তানই হয়ে ওঠে বাবা-মায়ের শক্তির উৎস। ‘‘মা বলে, তোমার এই যন্ত্রণাটা বেশি প্রকাশ কোরো না। আগুনটাকে ভিতরে রাখলে সেই আগুনের তাপে জীবনটা অনেক তাড়াতাড়ি এগোবে। ১৯ বছর বয়সে মায়ের বিয়ে হয়, তার পরে সংসার জীবন শুরু হয়ে যায়। মায়ের অনেক পাওয়া-না পাওয়া, চাওয়া-না চাওয়ার মধ্যে আমি এসে যাই। সেখান থেকে মা তার জীবনের সবটা ভুলে গিয়ে, আমার মধ্যে দিয়ে মায়ের জীবনটা দেখতে চেয়েছিল’’, সঞ্চারী বলেন, ‘‘আজ যখন বাবা আমার মা-কে বলে যে সন্ধ্যাবেলা ‘জয়ী’-র এপিসোড দেখাটা তাঁর অক্সিজেন, খুব গর্ব হয়। ছোটবেলা থেকে বাবাকে কখনও বিশ্রাম করতে দেখেনি। আমার মনে হয় যে এমন একটা দিন আসুক, বাবা যেদিন ঘুম থেকে উঠে কোনও টেনশন থাকবে না। বাবা নিশ্চিন্তে খবরের কাগজ পড়বে। এমন একটা দিন আমি আনতে পারব কি না জানি না।’’