মানুষের জীবন যেন পদ্মপাতায় জল! এই আছে, এই নেই। 

শুক্র সন্ধেয় অনূর্ধ্ব ১৬ ফাইভ এ সাইড ফুটবল প্রতিযোগিতার অতিথি হিসেবে যখন বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন কুলু, তখন কি ঘুণাক্ষরেও টের পেয়েছিলেন এই তাঁর শেষ যাত্রা? আর বাড়ি ফেরা হবে না তাঁর। 

এই বিষয়ে অন্যান্য খবর

নৈশালোকে ফুটবল প্রতিযোগিতা। অনুষ্ঠানস্থল ছাড়তে অনেক রাত হয়ে যায় কুলুর। এক বন্ধুকে নামিয়ে বাড়ি যাওয়ার রাস্তা ধরেন তিনি। শেষমেশ আর বাড়ি ফেরা হয়নি কুলুর। রাত চারটে নাগাদ কুলুর স্ত্রী তাঁর বন্ধুদের কাছে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। তখনই ছড়িয়ে পড়ে খবরটা— মাঝমাঠের ফুটবলার আর নেই! তাঁর শান্ত নিথর দেহ পড়ে রয়েছে ন্যাশনাল হাইওয়েতে। খবর ছড়িয়ে পড়তেই শোকের চাদর ছড়িয়ে পড়ে দেশের ফুটবলে। 

কুলুথঙ্গনের একসময়ের সতীর্থ সন্দীপ নন্দী খবরটা শুনে প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। একাধিকবার ভারতসেরা হওয়া গোলকিপারকে যখন দূরভাষে ধরা হল, তখন নিজেকে কোনওরকমে সামলে এবেলা.ইন-কে সন্দীপ বলেন, ‘‘কত বড় ফুটবলার হতে পারত কুলু। ওর বল ধরা, বল ছাড়ার স্টাইল দারুণ ছিল। ওই স্টাইলের জন্যই কুলুকে সবাই মনে রাখত। একবার দেখলেই ভাল লেগে যেত ওর খেলা। দারুণ এক প্রতিভা ছিল।’’ 

সব প্রতিভা ফুলের মতো বিকশিত হয় না। কুলুথঙ্গনও নিজের প্রতিভার প্রতি সুবিচার করতে পারেননি। ইস্টবেঙ্গলের টিডি সুভাষ ভৌমিক তাঁর প্রিয় শিষ্যের মৃত্যুর খবর শুনে বলছিলেন, ‘‘আমার কোচিং জীবনের সেরা সাব (সাবস্টিটিউট) ছিল কুলুথঙ্গন।’’ মাঠে নেমে সবাইকে বিস্মিত করার মতো ঠিকানা লেখা পাস বাড়াতে পারতেন। তেমনই সবাইকে অবাক করে দিয়ে তারাদের দেশে হারিয়ে গেলেন সবার প্রিয় ‘কুলু’। মুখে লেগে থাকত হালকা হাসি।  

সন্দীপ নন্দী। 

বছর দুয়েক আগে সি লাইসেন্স করার জন্য ইম্ফলে গিয়েছিলেন সন্দীপ। সেখানে আশিয়ান জয়ী ইস্টবেঙ্গল দলের সদস্য কুলুর সঙ্গে শেষবার সাক্ষাৎ হয়েছিল বর্ধমানের ছেলেটির। 

ইস্টবেঙ্গল ও মাহিন্দ্রায় সতীর্থ হিসেবে তাঁকে পেয়েছিলেন ভারতসেরা গোলকিপার। স্মৃতির পাতা উলটে সন্দীপ বলছিলেন, ‘‘সি লাইসেন্স করতে গিয়েই কুলুর সঙ্গে আমার দেখা হয়। আমি বললাম, কত বড় ফুটবলার হতে পারতিস তুই। সেভাবে খেললি কোথায়? এখন কোচিং ডিগ্রি করছিস?’’ 

এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো শেষ করে তার ব্যাখ্যা দিলেন গোলকিপার, ‘‘আমার আক্ষেপ একটা জায়গাতেই। কুলুথঙ্গন অনেক বড় মাপের ফুটবলার হতে পারত। ওর থেকে আরও অনেক কিছু পেতেই পারত দেশ। সেই কারণেই কোচিং ডিগ্রি করার সময়ে ওকে দেখেই বলে ফেলেছিলাম, তুই তো নিজেকে ভাল করে চিনতেই পারলি না। কত বড় মাপের ফুটবলার হতে পারতিস!’’ 

ফুটবলার জীবন আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। কোচ হওয়ার জন্য এএফসি-র বি লাইসেন্স করার ইচ্ছা ছিল তাঁর। থাঞ্জাভুরে একটি ফুটবল অ্যাকাডেমি তৈরির ইচ্ছাও ছিল কুলুর। কৃত্রিম টার্ফ বসানোর খরচ কত, তা নিয়ে চিন্তাভাবনাও শুরু করেছিলেন। 

সেই সব ইচ্ছা আর শাখাপ্রশাখা মেলল না। শুক্র-রাত এক স্বপ্নের সলিলসমাধি দেখল।