কোন দেশে এমন হয়? একজন অ্যাথলিট কোনও জাতীয় মিটে ভাল দৌড়েছেন। নির্বাচকেরা তাঁকে সম্ভাবনাময় মনে করে শিবিরেও ডেকেছেন। শিবিরে ডাকার নিয়ম, যে রাজ্যের অ্যাথলিটকে পছন্দ হল, সেই রাজ্য সংস্থাকে জানিয়ে দেওয়া।

কিন্তু যদি তিনি বাংলার কোনও অ্যাথলিট হন, তাহলে তিনি সে খবর পাবেনই এমন নিশ্চয়তা নেই। অন্তত সনিয়া বৈশ্যের ক্ষেত্রে সেটাই হয়েছে।

সনিয়া রায়গঞ্জের মেয়ে। চারশো মিটার দৌড়ন। গত বছরের জুলাই মাসে গুন্টুরে নিজের ইভেন্টে পঞ্চম হন। নির্বাচকরা তাঁকে রাজ্য সংস্থার মাধ্যমে জাতীয় শিবিরে ডাকেন। অথচ আশ্চর্যের ব্যাপার সনিয়ার কাছে সে খবরই পৌঁছয়নি।

সনিয়ার শেষ পর্যন্ত খবরটা জানতে পারার গল্পও বিস্ময়কর। গত বছরই সেপ্টেম্বরে তিনি নামেন ওপেন ন্যাশনালে। এবং সবাইকে চমকে দিয়ে চারশো মিটারে সোনা জেতেন ৫৩.৯৮ সেকেন্ড সময় করে। জাতীয় অ্যাথলেটিক্সের চিফ কোচ বাহাদুর সিংহ তো সনিয়াকে দেখে বকাবকিই শুরু করেন, ‘‘কী ব্যাপার? তোমায় শিবিরে ডাকা হল, অথচ তুমি এলে না কেন?’’

বাহাদুর বিশ্বাস করতে পারেননি রাজ্য সংস্থা তাঁকে কিছুই জানায়নি। জানায়নি বলেই উত্তরবঙ্গের মেয়েটি পড়েছিলেন রায়গঞ্জেই। সনিয়ার বাবা বরেন্দ্রবাবু এত কিছু জানানোর পরে বলেই ফেললেন, ‘‘তাহলে ভেবে দেখুন রাজ্যে অ্যাথলেটিক্সের কী অবস্থা।’’ 

ঠিকই বললেন। সদিচ্ছা যেমন নেই, নেই প্রচার। প্রচার নেই বলেই কেউই জানেন না আগামী মাসে জাকার্তায় হতে যাওয়া আন্তর্জাতিক মিটের জন্য জাতীয় দলেও জায়গা পেয়েছেন সনিয়া। আপাতত এই মেয়ে রাশিয়ার অলিম্পিক্স পদকজয়ী গালিনা বুখারিনার কাছে ত্রিবান্দ্রমে গভীর অনুশীলনে ডুবে আছেন। 
ত্রিবান্দ্রম থেকে সনিয়া বলছিলেন, ‘‘এখন আর পুরনো কথা ভাবতে চাই না। জাকার্তায় সুযোগ পেয়েছি বলে বিরাট কিছু উত্তেজিত আমি তাও বলছি না। আমার লক্ষ্য অলিম্পিক্সে দৌড়নো। যেদিন সে সুযোগ পাব সেদিন বুঝব কিছু করেছি।’’

বরেন্দ্রবাবু আবার এক পা এগিয়ে যান, ‘‘অলিম্পিক্সে নামা না। চাই অলিম্পিক্সে পদক।’’ যা শুনে হেসে ফেলেন সনিয়াও। যিনি রুশ কোচের অধীনে এখন ৫৩.৯৮ সেকেন্ডের কাছাকাছি দৌড়চ্ছেন।  পিটি ঊষাও চারশো মিটার দৌড়েছেন। জাতীয় রেকর্ড সেই দু’হাজার চার সালে মনজিৎ কউরের করা। ৫১.০৫ সেকেন্ড। সেখানে বিশ্বরেকর্ড বা অলিম্পিক্স রেকর্ড ৪৭-৪৮ সেকেন্ডের ঘরে। সনিয়া বলছিলেন, ‘‘আসলে বাবা আমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেন। বাবার জন্যই আজ এখানে এসেছি।’’
ভুল বলেননি সনিয়া। ছোট থেকে মেয়েকে নিয়ে ওঁর বাবা ঘুরছেন। এমনও হয়েছে, জাতীয় আসরে পৌঁছে দেখেছেন মেয়ের নামটাই পাঠানো হয়নি। সনিয়া একসময় লংজাম্পেও নামতেন। ‘‘লক্ষ্য করলাম কোনও সমস্যার জন্য পিটের এক ফুট দূর থেকেই মেয়েটা লাফাচ্ছে। রেজাল্টও খারাপ হচ্ছিল। তাই অনেক ভেবে ওকে চারশোয় নিয়ে এলাম।’’ 

প্রাক্তন ফুটবলার বাবাই ওর প্রথম কোচ। রায়গঞ্জের নেতাজিপল্লির মেয়ে সনিয়া পড়াশুনোতেও ভাল। ডাক্তারি পড়তে চেয়েছিলেন। কিন্তু খেলার চাপে জয়েন্টের প্রস্তুতি হয়নি। এখন পদার্থবিদ্যায় অনার্স নিয়ে বিজ্ঞান পড়ছেন। ‘‘মনে হচ্ছে অনার্সও রাখতে পারব না। পড়ার সময়ই তো পাচ্ছি না,’’ খানিক বিষণ্ণই শোনাল সনিয়ার গলা। অবশ্য অ্যালিসন ফেলিক্সের আপাদমস্তক ভক্তের জীবনের মোক্ষ পাল্টে গিয়েছে। এই বাংলা হয়তো সেদিন তাঁকে চিনবে যেদিন অলিম্পিক্সের ট্র্যাকে স্টার্টিংব্লকে তিনি দাঁড়াবেন। কে জানে ক’বে সে স্বপ্ন সত্যি হবে। ফোকাস নামক বস্তুটিতে বুঁদ থাকতে এই মেয়ে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটের থেকেও দূরে থাকেন। অবলীলায় বলে দেন, ‘‘আমার ছবি পাঠাব কী করে? আমি তো নিজের খেলার ক্ষতি হবে ভেবে হোয়াটসঅ্যাপও করি না।’’