নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহর কাছে গুজরাতের টার্গেট ছিল ১৫০টি আসন। ২২ বছর টানা ক্ষমতায় থাকার পরে, সেই টার্গেট পূরণ করা বিজেপির পক্ষে অনেকগুলি কারণেই কঠিন হয়ে পড়েছিল। 

প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার সঙ্গে পাতিদার আন্দোলন বিজেপিকে খানিকটা বেকায়দায় ফেলে দেয়। তার উপরে যোগ হয় নোটবাতিল ও জিএসটির ফলে মধ্যবিত্ত ও ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ। সুযোগ বুঝে মাঠে নেমে পড়েন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গাঁধী। সঙ্গে নিয়ে নেন পাতিদার নেতা হার্দিক পটেল, দলিত নেতা জিগনেশ মেওয়ানি আর ওবিসি নেতা অল্পেশ ঠাকোর।

এর পরেই বিপদ বুঝে মমতার পন্থাই নেন নরেন্দ্র মোদী। ২০১৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের আগে সারদা দুর্নীতি, নারদকাণ্ড, ফ্লাইওভার ভেঙে পড়া, কংগ্রেস-সিপিএম জোটের মুখে পড়ে মমতা একটি স্ট্র্যাটেজি নেন।

সেই বিধানসভা নির্বাচনে মমতা ২৯৪টি আসনেই যেন তৃণমূল ‘প্রার্থী’ হয়ে যান। রাজ্যের মানুষের কাছে এই মর্মেই ভোট চান যে, তিনিই তৃণমূল কংগ্রেসের মুখ। কাউকে না দেখে তাঁকেই ভোট দিন সবাই। তাতে কাজও হয়। অনেক বেশি আসন নিয়ে একক শক্তিতে রাজ্যে ক্ষমতায় আসে তৃণমূল।

একই ভাবে নরেন্দ্র মোদীও গুজরাত নির্বাচনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন প্রচারের শেষ পর্যায়ে। তিনিই ১৮২টি আসনে প্রার্থী হিসেবে নিজেকেই তুলে ধরেন। 

চার বার মুখ্যমন্ত্রী থাকার পরে এই প্রথম তিনি রাজ্যের বাইরে। এখন তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু এই নির্বাচনে জেতা তাঁর পক্ষে ‘প্রেস্টিজ ইস্যু’ হয়ে যায়।

তিন ভাবে মোদী এই প্রতিকূল অবস্থার মোকাবিলা করতে নামেন। প্রথমত, তিনি গুজরাতি অস্মিতার লাইনে প্রচার চালাতে শুরু করেন। তাঁকে ‘নীচ’ বলে অপমান করা হয়েছে বলে অভিযোগ করে মোদী দাবি করেন, এই অপমান সব গুজরাতবাসীর অপমান। গুজরাতের ছেলের এই অপমানের বদলা নিতেই ভোটারদের কাছে আবেদন করেন মোদী। 

দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন ভাবে তিনি হিন্দু তাসও খেলেন প্রচারে নেমে। তা সে রাহুল গাঁধীর কংগ্রেস সভাপতি হওয়াকে ‘ঔরঙ্গজেব রাজ’ শুরু হবে বলে কটাক্ষ করা হোক বা কংগ্রেস নেতা কপিল সিবাল মুসলিমদের হয়ে অযোধ্যা মামলায় লড়ছেন বলা হোক বা পাকিস্তান মোদীকে হারাতে চাইছে বলে অভিযোগ করা হোক—এই সব ইস্যু তুলে হিন্দু মননকে ছুঁয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। 

তৃতীয়ত, জিএসটি-র ক্ষোভ সামাল দিতে বিভিন্ন পণ্যের উপরে করের হার কমিয়ে দেন। দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কত জনকল্যাণমূলক প্রকল্প চালু করেছেন, কী ভাবে দুর্নীতি আটকেছেন সেই প্রচারও সামনে আনেন মোদী।

এই জয়ে আসন সংখ্যা ১৫০-এর ধারে কাছে না গেলেও, মুখরক্ষা হয়েছে বিজেপির। ঘরে বাইরে মোদী-শাহ জুটির দাপট ধরে রাখার জন্য গুজরাতে সরকার গঠন করা জরুরি ছিল নরেন্দ্র মোদীর কাছে। 

মমতার মতো ২০১১ সালের থেকে ২০১৬ সালে বিধানসভায় আসন সংখ্যা বাড়ানোর মতো কাজটি না করতে পারলেও, গুজরাতে বিজেপিকে ক্ষমতায় রেখে দিতে পেরে বাজিমাত করলেন মোদী। মুখরক্ষা হল বিজেপির।