অনূর্ধ্ব ৭ বছর, নয় বছর এবং অনূর্ধ্ব ১১ পর্যায়ে সে রাজ্য চ্যাম্পিয়ন। একইসঙ্গে ছ’বছর বয়সে সে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে অনূর্ধ্ব ৭ বছর বিভাগে অষ্টম হয়েছিল। সেখানেই শেষ নয়। দু’বছর আগে কমনওয়েলথ দাবা চ্যাম্পিয়নশিপেও শেষ করেছিল আট নম্বরে।

সেই অয়ন্তিকা দাসদের খড়গপুরের বাড়ির দেওয়াল রং করতে পারেননি বাবা মিন্টু দাস! পারবেন কীভাবে? পেশায় তিনি দর্জি। একটা ছোট্ট দোকান আছে। মা সেলাইয়ের কাজ করেন। কিন্তু সেটাও অনিয়মিত। তবু সেই চুন সুড়কির দেওয়ালে রাখা আলমারিতে অয়ন্তিকা দাসের ট্রফির সংখ্যা গুনতে গেলে সময় লাগবে!

লার দাবামহলে এখনই ১২ বছরের অয়ন্তিকা’কে ভবিষ্যতের কেনেরু হাম্পি বলে ভাবা হচ্ছে! কিন্তু অয়ন্তিকার বাবা মিন্টু দাসের কথায় আক্ষেপ। বুধবার খড়গপুর থেকে ফোনে বললেন, ‘‘অয়ন্তিকা স্বপ্ন দেখে মহিলাদের গ্র্যান্ড মাস্টার হওয়ার। কিম্তু তার জন্য সারাবছর যে পরিমাণ টুর্নামেন্টে অংশ নিতে হয় সেটা তো পারে না। কীভাবে আইএম নর্ম পাবে? আইএম না হলে তো গ্র্যান্ড মাস্টারই বা কীভাবে হবে?’’ হয়তো এই কারণে, দু’বছর আগের কমনওয়েলথ দাবা টুর্নামেন্টে অষ্টম হওয়া অয়ন্তিকার দু’মাস আগে কমনওয়েলথ দাবায় খেলতে গিয়ে পারফরম্যান্সটা একটু খারাপ হয়েছিল। ১৫ নম্বর হয়ে ফিরেছিল সে।

তবু, অয়ন্তিকার পাশে দাঁড়িয়েছেন খড়গপুর আইআইটি’র ছাত্ররা। তাঁদের সঙ্গে অয়ন্তিকা’কে আর্থিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন স্থানীয় এক ডাক্তারবাবু। এঁদের জন্যই দু’বছর আগে অয়ন্তিকা বাবার সঙ্গে নয়াদিল্লিতে কমনওয়েলথ দাবা চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিতে যেতে পেরেছিল। মিন্টু দাস বললেন, ‘‘অর্থাভাবে কলকাতায় আলেখিন দাবা ক্লাবে প্র্যাক্টিসেও নিয়মিত ও যেতে পারে না। কারণ, গেলেই কলকাতায় হোটেলে থাকা, খাওয়ার খরচ আছে। বারবার আমি সেই টাকা জোগাড় করতে পারি না।’’ খড়গপুর আইআইটি’র ছাত্ররা সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং ওয়েবসাইটে অয়ন্তিকার পারফরম্যান্সের কথা প্রচার করে প্রয়োজনীয় টাকা তোলার চেষ্টা করছেন।


​প্রত্যয়ী: অয়ন্তিকার পাশে দাঁড়াল আইআইটির ছাত্ররা।— নিজস্ব চিত্র

সাউথসাইড স্কুলের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী বুধবার বলল, ‘‘অনেক ট্রফি জেতা সত্ত্বেও এখনও পর্যন্ত তার দাবার বোর্ডে সেরা মুহুর্ত ছ’বছর বয়সে টেলিগ্রাফ দাবায় বিশেষ অতিথি বিশ্বনাথন আনন্দের সঙ্গে খেলা!’’ যদিও, তার প্রিয় খেলোয়াড় ম্যাগনাস কার্লসেন। বলল, ‘‘কার্লসেনের মতোই আমি চেষ্টা করি খেলায় বৈচিত্র তৈরি করার।’’ বাড়িতে টিভি নেই বলে কার্লসেনের খেলা সে আত্মীয়ের বাড়িতে সুযোগ পেলেই দেখে।

এমাসেই আলেখিন ক্লাবে রাজ্যস্তরের একটি টুর্নামেন্টে নামবে অয়ন্তিকা। জেঠুর দেওয়া কম্পিউটারে নিয়মিত ঘণ্টা চারেক অনুশীলন ছাড়াও মনঃসংযোগ বাড়ানোর জন্য ধ্যান করে সে।

তাতেও সম্পূর্ণ হয় না মনের জোর বাড়ানোর প্রক্রিয়া। অয়ন্তিকা জানাল, মনঃসংযোগ বাড়ানো এবং চাপমুক্ত রাখতে তার বড় অস্ত্র সুকুমার রায়ের আবোলতাবোল! দাবাড়ু বলছে, ‘‘কোনও টুর্নামেন্টের আগে সুকুমার রায়ের কবিতা পড়ি। ভীষণভাবে চাপমুক্ত থাকি। একইসঙ্গে মনের জোরও বেড়ে যায়!’’